জেলা প্রতিনিধি
১১ আগস্ট ২০২৫, ০৬:৪৪ পিএম
ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এতে বলা হয়, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গলার ডান পাশের সব ধমনী কেটে গেছে। চাপাতির কোপে ঝাঁজরা হয়ে গেছে বুকের বাঁ পাশের পাঁজর। অন্য আরেকটি কোপ পিঠ দিয়ে ঢুকে ফুসফুস বিচ্ছিন্ন হয়ে পাঁজর ভেদ করে বেরিয়ে গেছে বুক দিয়ে। তুহিনকে হত্যার এমন নির্মমতাই উঠে এসেছে শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে করা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে।
এদিকে গ্রেফতার ৭ আসামির দুই দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হলে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন হত্যাকাণ্ডে জড়িত শাহজালাল। পরে বিচারক শুনানি শেষে আসামিদের জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন।
![]()
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ এন এম আল মামুন বলেন, সাংবাদিক তুহিনের গলা, ঘাড়, বুক, পিঠ ও হাতে গুরুতর ৯টি গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। একটির চেয়ে আরেকটি আঘাত কোনোভাবেই ছোট নয়। সব আঘাতই সমান গুরুতর, সব আঘাতই গভীর। একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য এর যে কোনো একটি আঘাতই যথেষ্ট বলে জানান মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মাজহারুল হক। তিনি বলেন, ৯টি আঘাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গভীর হয়েছে বুকের বাঁ পাশে। টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে বাঁ হাতের হাড়। ময়না তদন্তের এ প্রতিবেদন ইতোমধ্যে গাজীপুর মহানগর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান বিভাগীয় প্রধান।
সাংবাদিক তুহিনের মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়ার কথা জানিয়েছেন গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ড. মো. নাজমুল করিম খান। সাংবাদিক তুহিন হত্যাকাণ্ড নিয়ে শনিবার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার বলেছেন, সংঘবদ্ধ চক্রের অপরাধের ভিডিও চিত্র ধারণ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন সাংবাদিক। এ ঘটনায় আমাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ আছে, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আছে। সমস্ত তথ্য প্রমাণ রয়েছে। তুহিনের মরদেহের ময়না তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তি সাপেক্ষে আমরা আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দিতে পারব। আমরা আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সাজার সংস্কৃতি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ দমন করা যাবে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (অপরাধ-উত্তর) মো. রবিউল হাসান জানান, গতকাল ময়না তদন্তের প্রতিবেদন আমরা হাতে পেয়েছি। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ৭ আসামিকে শনিবার রাতেই ২ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রোববার থেকে তাদের রিমান্ড শুরু হয়। এর আগে শনিবার তাদের প্রত্যেকের ১০দিন করে রিমান্ড আদালতে আবেদন করা হলে বিচারক দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সোমবার আদালতে হাজির আসামিরা, শাহজালালের দোষ স্বীকার:
বহুল আলোচিত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যা মামলায় গ্রেফতার সাত আসামিদের মধ্যে একজন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাসন থানায় দুই দিনের রিমান্ড শেষে সাত আসামিকে সোমবার দুপুরে গাজীপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এ হাজির করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে কুমিল্লার হোমনা থানার অনন্তপুর এলাকার হানিফ ভুঁইয়ার ছেলে মো. শাহজালাল (৩২) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জাবান বন্দি প্রদান করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক দুলাল চন্দ্র দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, দুই দিনের রিমান্ড শেষে সোমবার দুপুরে কড়া পুলিশি প্রহরায় সাত আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এদের মধ্যে আসামি মো. শাহজালালকে আদালতের বিচারক ওমর হায়দারের কাছে হাজির করা হলে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। পরে আদালত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও বলেন, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় ওই সাত আসামিকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসময় তারা তুহিন হত্যা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য সমূহ যাচাই-বাছাই করা হবে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা।
পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে শাহ জালাল জানায়- সে ইয়াবা ব্যাবসা করে এবং ঠেক দিয়ে ছিনতাই করে। গত ৭ আগস্ট তারিখে সে মিজান, স্বাধীন, সুমন, আরমান, ফয়সাল এবং আলামিন একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করছিল। এসময় মিজানের স্ত্রী গোলাপি ফোন দিয়ে মিজানকে জানায়, শাপলা ম্যানশনের কাছে একটা লোক পাওয়া গেছে। তার থেকে ফিটিং দিয়ে টাকা পয়সা পাওয়া যাবে। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা চাপাতি, দা সুইচ গিয়ার চাকু নিয়ে শাপলা ম্যানশনের দিকে গিয়ে গোলাপীকে ওই লোকের সঙ্গে হাতাহাতি করতে দেখে দৌড়িয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। কোপ খেয়ে ওই লোক একটা মুদি দোকানে ঢুকে । এসময় গোলাপি চিৎকার করে বলতে থাকে, তুহিন সাংবাদিক ভিডিও করছে। সাথে সাথে ওই লোককে কোপানো বাদ দিয়ে তুহিন সাংবাদিককে ধাওয়া করে চায়ের দোকানের সামনে নিয়ে প্রথমে মিজান দা দিয়ে কোপ মারে, কোপ খেয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকলে স্বাধীন, সুমন, আরমান, আলামিন, ফয়সাল সবাই এলোপাতাড়ি কোপায় এবং মিজান সুযোগ বুঝে সাংবাদিকের মোবাইল পকেটে নিয়ে নেয়। এই সময় গোলাপি পুলিশ আসতেছে বলে চিৎকার করলে ওরা সবাই পালিয়ে যায়।
প্রসঙ্গত: গত বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় একটি হ্যানিট্র্যাপ ঘটনায় মোবাইল ফোন দিয়ে ভিডিও চিত্র ধারণ করতে গেলে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে হত্যা করে লাশ ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মো. সেলিম বাদী হয়ে বাসন থানায় মামলা দায়ের করেন। তুহিনকে নির্মমভাবে হত্যার পর পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের পর গত তিন দিনই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। সোমবার থেকে স্বাভাবিক হয়ে আসছে চৌরাস্তা এলাকার জনজীবন।
প্রতিনিধি/এসএস