images

সারাদেশ

হাতিয়ার প্রকৃত জেলেরা সুবিধাবঞ্চিত, বৈষম্যের শিকার 

২৪ মার্চ ২০২৪, ০৯:০৩ পিএম

জেলেদের সুরক্ষা ও তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা পরিকল্পনা ও পশিক্ষণের পাশাপাশি সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এতে জেলেদের আর্থসামাজিক অবস্থার তেমন একটা পরিবর্তন আসে না। কারণ  সরকার থেকে জেলেদের যে সহযোগিতা দেওয়া হয় তা প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছে না। নোয়াখালীল দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় এই  বৈষম্য চোখে পড়ে সবচেয়ে বেশি। 

মৎস অধিদফতর ও বিদেশি সংস্থা জেলেদের সহায়তার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। তার সুবিধা পায় না প্রকৃত জেলেরা। এই সুবিধার জন্য সরকারি তালিকায় জেলেদের নিবন্ধন থাকতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকৃত জেলেরা এই নিবন্ধনই করতে পারেনা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। লোক মারফত যে কজন নিবন্ধিত হয় তাদেরও আবার অধিকাংশ সহায়তা পায় না। 

অথচ জীবনে কখনো মাছ শিকার করেননি, নদীপাড়েও যাননি কখনো; প্রধান পেশা ব্যবসা, মুদি দোকানি, পল্লি ডাক্তার বা অন্য কিছু । কিন্ত তারা নিবন্ধিত জেলে। আছে জেলে কার্ডও। প্রতি বছর জেলে হিসেবে পান খাদ্য সহায়তাও। চাল বিতরণের দিন তাদের লাইনেও দাঁড়াতে হয় না। অন্য লোকের মাধ্যমে চাল চলে আসে বাড়িতে। এমন দুর্বিষহ ও বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকা হাতিয়ার বিভিন্ন জেলেপাড়া থেকে। 

দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বুড়িরচর, চরচেঙ্গা, ও জাহাজমারা মৎস্য ঘাট এবং জেলে পল্লি ঘুরে স্থানীয় জেলেদের সাথে কথা বললে তারা জানায় এসব তথ্য। 

চরচেঙ্গা মৎস্য ঘাট এলাকার ফিশিং বোট মালিক গিয়াসউদ্দিন জানায়, বৃহস্পতিবার (২১ মার্চ) জেলেদের জন্য যে চাল দেওয়া হয় তা প্রকৃত জেলেরা পায়নি। কার চাল কে রিক্সা ভরে নিয়ে যায় তাও বুঝা যায়নি। অধিকাংশই ভুয়া জেলে পরিচয়ে নিবন্ধিত হয়েছে বলে জানান এই ফিশিং বোট মালিক। 

বুড়িরচর ইউনিয়নের মধ্য রেহানিয়া গ্রামের জেলে আব্দুল গণি (নিবন্ধিত ফরম নং ৫০৬৪৭৬৯) জানায়—কারা আমার স্বাক্ষর দিয়ে চাল নিয়ে যায় তা আমি জানি না। আমি গত ২-৩ বছর পর্যন্ত খাদ্য সহায়তা পায়নি। 

দক্ষিণ রেহানিয়া গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দিন ( জেলে নিবন্ধন ফরম নং ৪৯৮৭৫০৬)। এই মৃত ব্যক্তির নামেও অন্যরা চাল উত্তোলন করে নিয়ে যায় । 

একই ইউনিয়নের বড় দেইল এলাকার পল্লি চিকিৎসক মো. আরিপ উদ্দিন ভূয়া জেলে পরিচয়ে নিবন্ধিত হয়। তার নিবন্ধন ফরম নং ৫০৬৪৮২২ এবং সে চালও পায়।

বেলাল মাঝি নামের এক সমুদ্রগামী জেলে জানায় নিবন্ধন এবং জেলে কার্ড থাকার পরও তিনি কোনো সহায়তা পাননি। এখানকার বেড়িবাঁধের তীরে বাস করা—পিয়রা, মমতা, জোসনা, জাহেদাসহ অসংখ্য নারী অভিযোগ করে বলেন, তাদের স্বামীরা জন্মলগ্ন থেকে জেলে। অথচ তাদের নিবন্ধন হচ্ছে না । তারা আরো জানান গত ৫ মাস আগে ইউএনডিপির প্রতিনিধিরা এসেও তাদের খোঁজ খবর নিয়ে গেছে। তবুও তারা আশানুরূপ কিছু দেখছে না বলে আক্ষেপ করেন জেলেপাড়ার এসব নারী। স্থানীয় জেলে আব্দুল কাদেরও একই অভিযোগ করেন। 

জাহাজমারা কাটাখালি মৎস্য ঘাট এলাকার সমুদ্রগামী জেলে অলি উদ্দিন জানায়, তার জেলে কার্ড আছে তবুও খাদ্যসহায়তা পায় না গত ৩ বছর। গতকালও নদীতে মাছ শিকারে গিয়েছিলাম কিন্তু মাছ পায়নি, কষ্টে দিন কাটে। মেম্বারদের আত্মীয়রা পায় সব সুবিধা। তাছাড়া প্রকৃত জেলে ৫ জনও নেই নিবন্ধনের আওতায়, সব মুদি দোকানি এবং অন্যান্যরা পায় এসব সুবিধা।

এ বিষয়ে বুড়িরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম জানান ভূয়া জেলে নামধারীদের সনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

সুবিধাবঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার এসব জেলেদের বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাজু চৌধুরী জানান, ভুয়া জেলেদের নাম নিবন্ধিত হওয়ার বিষয়টি আগে ঘটেছে। তার সময়ে এমন ঘটনা ঘটেনি বলে উল্লেখ করেন এই মৎস্য কর্মকর্তা। 

hatia-ss

এছাড়াও বেড়িবাঁধ এবং জেলেপাড়ার আশপাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকার পরও  জেলেদের সন্তানরা শিক্ষালয়মুখী না হওয়ার চিত্রটিও উঠে এসেছে একই সাথে। সমুদ্রগামী জেলে কিংবা মৎস্যজীবীদের সামগ্রিক জীবনমানের টেকসই উন্নয়নের বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার লাকী বলেন, এসব বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ পরিকল্পনার দরকার। এবং যেসব জেলেরা এখন বিভিন্ন সহায়তা পাচ্ছে তাদের সন্তানরা পড়াশোনা করে কিনা এই মর্মে প্রত্যয়নও আবশ্যক করা দরকার সংশ্লিষ্ট দফতরকে। 

প্রতিনিধি/একেবি