images

সারাদেশ

লামায় হাতি দিয়ে বনের গাছ পাচার, হুমকিতে পরিবেশ  

জেলা প্রতিনিধি

১৯ মার্চ ২০২৪, ১০:৩৬ এএম

বান্দরবানের লামায় লেমুপালং মৌজার ১৩টি পাড়ার আশপাশের পাহাড়ের বিপন্ন প্রজাতির বনজ, ওষুধি গাছসহ সব ধরনের গাছ কেটে বন উজাড় করছেন যুবলীগ নেতা মোরশেদ আলম চৌধুরী। গত তিন মাস ধরে বাগানের গাছ কাটার কথা বলে প্রাকৃতিক বনের বড় বড় গাছ কেটে হাতি দিয়ে পাচার করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মোরশেদ আলম চৌধুরী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তার ভাই খোরশেদ আলম চৌধুরী লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায় প্রভাব খাঁটিয়ে লামা উপজেলার লেমুপালং মৌজাবাসীকে জিম্মি করে গত তিন মাস ধরে বনের গাছ কাটছেন বলে জানিয়েছেন এলাকার এক জনপ্রতিনিধি।

রোববার (১৭ মার্চ) সরেজমিনে ৫ নম্বর সরই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড লেমুপালং মৌজার পূর্বে কালা পাহাড়া (বান্দরবান-থানচি রোড), পশ্চিমে পালং খাল ও দক্ষিণে ছাইংগ্যা ঝিরিতে দেখা যায়, লেমুপালং খালের শিল ঝিরি ও আশপাশের ঝিরির সামনে প্রায় ১৫০টির অধিক বড় বড় গাছ কেটে রাখা হয়েছে। লম্বায় এক একটি গাছ ৩০-৫০ ফুট, প্রায় গাছের গোল বেড় ৪০-৫০ ইঞ্চি আবার কোনটি বিশাল বড় মাদার ট্রি। এইসব গাছের মধ্যে রয়েছে— চাম্পা ফুল, কড়ই, বানরখোলা, জারুল, গামারি, লালী, বাড়ানা, সিভিট, লাথিম, গোদা, গুটগুটিয়া, জলপাই, চাপালিশ, গর্জন, অর্জুন ও বিপন্ন প্রজাতির ওষুধি গাছসহ নানান প্রজাতির গাছ। তিন-চারটি ঝিরিতে দেখা গেছে, হাতির মল পানির সঙ্গে মিশে আছে। আবার এইসব গাছ পরিবহনের জন্য প্রায় ১৫ কিলোমিটার পাহাড় কেটে করা হয়েছে গাড়ির রাস্তা।

বাক্কা পাড়ার কারবারি (পাড়া প্রধান) বাক্কা ম্রো বলেন, গত ২০১৫ সালে মোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে গাছ কাটা বিষয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। হাতিসহ মোরশেদ আলম চৌধুরীর গাছ কাটার শ্রমিকদেরকে একবার এলাকাবাসী সবাই মিলে বিতাড়িত করার কারণে মোরশেদ আলম চৌধুরী তার কর্মচারী মো. আজমকে দিয়ে এলাকার তিনজনের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা চেষ্টার মামলা করেছিলেন। এ মামলায় পাঁচ বছর পর তথ্য প্রমাণ না পেয়ে ২০২০ সালে তিনি বেকসুর খালাস পেয়েছেন বলে জানান।

thumbnail_20240317_123710

এছাড়া অন্য সওদাগরেরা পাড়ার লোকজনের বাগান ক্রয় করতে আসলেও তার ব্যক্তিগতভাবে পাহাড় কেটে ১৫ কিলোমিটার করা রাস্তায় কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে পাড়ার মানুষ অন্য কোনো ব্যবসায়ীর কাছে গাছ বিক্রি করতে পারেন না।

সরই ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মেনওয়াই ম্রো বলেন, তিন মাস আগে মোরশেদ আলম তার বাগানের গাছ কাটবে বলে তার লোকজন নিয়ে গেছে। পরে জেনেছি, বনের বিভিন্ন গাছ কেটে হাতি দিয়ে পাচার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মৌজার হেডম্যানকে বলা হলেও কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, পাহাড়ি অঞ্চলের একমাত্র পানির উৎস ঝিরি। এইসব ঝিরির ওপর হাতি দিয়ে গাছ টানাছেন গত তিন মাস ধরে। হাতির মলমূত্রও ঝিরিতেই ফেলছে। দূষিত হচ্ছে ঝিরির পানি।

লাংগি পাড়ার মেনচং ম্রো বলেন, পালং খালের সঙ্গে সংযুক্ত শীল ঝিরি, লেমু ঝিরিসহ ছোট বড় ছয়টি ঝিরি রয়েছে। এইসব ঝিরির পানি দিয়েই আশপাশের ১৩টি পাড়ার লোকজন বেঁচে আছে। অথচ হাতি দিয়ে গাছ টানার কারণে হাতির মলমূত্র ঝিরির পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এ পানি ব্যবহার করায় গত সপ্তাহে পাড়ার কয়েকজন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। ঝিরিতে গোসল করলেও শরীর চুলকায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে পাড়ায় পানি বাহিত রোগ মহামারি আকারে ধারণ করবে।

লেমু পালং মৌজার হেডম্যান কাইং ওয়াই ম্রো জানান, মোরশেদ আলম চৌধুরী হুমকি দিয়ে বলেছেন, তিনি নাকি তার মৃত হেডম্যান পিতার কাছে মৌজার বন ক্রয় করেছিলেন। সেজন্য আগামী ত্রিশ বছর গাছ কাটবেন, দালিলিখ প্রমাণ দেখাতে বললেও দেখাতে পারেন না বলে জানান তিনি।

মোরশেদ আলম চৌধুরীর কাছে এব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে  বলেন, যে গাছগুলো আপনারা দেখেছেন সেগুলো তার নয়, তার হাতিও নেই। তিনি অসুস্থ। তার বিরুদ্ধে জায়গা জিম্মি করে গাছ কাটার অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বৈধভাবে জোতপারমিট করে ব্যবসা করছেন। প্রতিপক্ষরা তার ক্ষতি করার জন্য তার নামে বদনাম করছে।

thumbnail_20240317_123719

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফখর উদ্দিন চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, এলাকাটি দুর্গমও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা আসলে কঠিন। তারপরও এবছরের শুরুতে ১৮ জানুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশনা অমান্য করে পাহাড় কর্তন, পাহাড়ের ঝিড়ি ঝর্না জলাধার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও মাটি ভরাট করে প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করার অপরাধে বান্দরবান জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক মো. আব্দুর শুক্কুর, শুক্কুর মিয়া, আব্দুর রহিম, কালু মিয়াসহ অজ্ঞাত নামা ২ থেকে ৩ জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। লেমুপালং মৌজা এলাকায়ও যদি পরিবেশ ধংস করার প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধেও নিয়মিত মামলা করা হবে বলে জানান তিনি।

এই ব্যাপারে লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আরিফুল হক বেলাল ঢাকা মেইলকে জানান, বন উজার করে হাতি দিয়ে গাছ পাচার করা সম্পর্কে জানেন না এবং এই প্রতিবেদকের কাছে এই প্রথম শুনেছেন। লেমু পালং মৌজা এলাকায় বনবিভাগ থেকে বনের গাছ কাটার জন্য কোনো জোতপারমিট দেওয়া হয়নি। গত বছর অভিযান পরিচালনা করে বনের গাছ জব্দ করে মামলা করা হয়েছে। লামা বনবিভাগ থেকে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করার জন্য ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশ দেবেন এবং নিজেই খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।

প্রতিনিধি/টিবি