জেলা প্রতিনিধি
২৮ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:২০ পিএম
পাহাড়কন্যা খ্যাত বান্দরবানে বাড়ছে পর্যটন কেন্দ্র। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা। একই সঙ্গে বাড়ছে বান্দরবানের জনসংখ্যার পরিমাণ। অন্যদিকে, কমে যাচ্ছে আবাদি জমি ও জুমচাষের পাহাড়ি জমি। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে লাভের কারণে জুমচাষের পরিবর্তে মিশ্র ফল বাগান চাষের দিকে ঝুঁকছেন পাহাড়ের জুমচাষিরা।
বান্দরবানে চিম্বুক পাহাড়ের আশপাশের ত্রিশ থেকে চল্লিশটি পাড়ার বিভিন্ন এলাকার জুমচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একই পাহাড়ে প্রতিবছর জুমচাষ করতে পারেন না। তাই জুমচাষ করতে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যেতে হয় তাদের। ফলে জমির পরিমাণও প্রয়োজন হয় বেশি। নানানভাবে পাহাড়ি জমি সংকটের কারণে বর্তমানে একই পাহাড়ে প্রতি বছর জুমচাষ করায় জুমের ফলনও তেমন ভালো হয় না।
অন্যদিকে, পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়া এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পাহাড়ে জুমচাষের আবাদি জমিও কমে গেছে। এছাড়া পাহাড়ে জুমচাষের তুলনায় ফলদ বাগান করলে অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া সুযোগ থাকে। এসব কারণে পাহাড়ে জুমচাষের পরিবর্তে নানান জাতের ফলদ বাগান চাষে বেশি ঝুঁকছেন পাহাড়ের জুমচাষিরা।
![]()
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ৪ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জায়গায় ফলদ বাগানের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছর ফলদ বাগানের চাষ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
বান্দরবান জেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশে সুয়ালক ইউনিয়নের বসন্ত পাড়া। এ পাড়ায় ‘ম্রো’ সম্প্রদায়ের ৩০ পরিবারের বসবাস। তাদের দাবি, পাড়াটির বয়স প্রায় ৩শ বছর। এ পাড়ার বাসিন্দাদের অধিকাংশ পরিবার দশ-পনেরো বছর আগেও জুমচাষ করতেন। বর্তমানে এ পাড়ার সবাই মিশ্র ফল বাগান চাষ করছেন।
এই বসন্ত পাড়ার বাসিন্দা তোয়ো ম্রো (৫৫) জুমচাষ ছেড়ে মিশ্র ফলের বাগান করছেন প্রায় বিশ বছর ধরে। প্রায় বিশ একর জায়গাজুড়ে তার বিভিন্ন ফলজ বাগান। বাগানে রয়েছে ড্রাগন ফলের গাছ, দেশি-বিদেশি আমের মধ্যে আম্রপালি, বারি ১১ আম, নারিকেল আম, ডক মাই আম, ব্রুনাই আম, ব্যানানা আম, রেড কইন আম, চেৎমাই আম, ব্ল্যাক স্টোর আম, বরই মধ্যে বল সুন্দরী, কাশ্মীরী বরই, আপেল কুল, সিড লেজ কুল, মাল্টার মধ্যে উন্নত জাতের মাল্টা, মোড়া মাল্টা, বাম্বুটান, ভেড়া কাটা মাল্টা, ভিয়েতনাম মাল্টা। এছাড়া পেঁপে, সজিনা, লিচুসহ তার বাগানে ৮০ প্রকার বিভিন্ন ফলের গাছ রয়েছে। এ বাগান থেকে তিনি বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেন বলে জানান।
![]()
তিনি জানান, তাদের পূর্বপুরুষ সবাই জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বর্তমানে পাহাড়ি জমির পরিমাণও দিন দিন কমে যাচ্ছে যার কারণে বিকল্প চাষাবাদ হিসেবে এই ফলদ বাগান শুরু করেছিলেন। পরে বুঝতে পারেন জুমচাষের তুলনায় বেশি লাভজনক। বছরজুড়ে থাকে কর্ম ব্যস্ততা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। তাকে দেখে তার পাড়ার সবাই বর্তমানে ফলদ বাগান করছেন বলে জানান তিনি।
এ বসন্ত পাড়ার মত চিম্বুক এলাকার নোয়া পাড়া, বাগান পাড়া, ম্রোলং পাড়া, ক্রামাদি পাড়া, সাতং পাড়া, দেওয়াই হেডম্যান পাড়া, রাংলাই চেয়ারম্যান পাড়া, রামরি পাড়ার বাসিন্দারা সবাই এখন ফলদ বাগান চাষে ঝুঁকছেন।
দেওয়াই হেডম্যান পাড়ার তংচং ম্রো গতবছর আপেল কুল বরই বিক্রি করে নয় লাখ টাকা আয় করেছেন। এবছর তেমনই আয় করবেন তিনি বলেন, পাহাড়ের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে পাহাড়ি মাটিতে কোন ফলজ গাছ বেশি উপযোগী সেটা বুঝে ফলদ বাগান করলে জুমচাষের চেয়ে বেশি লাভবান হওয়া যায় বলে জানিয়েছেন।
![]()
বান্দরবান-থানচি রাস্তার চিম্বুক পাহাড় এলাকার রামরি পাড়ার ইয়াংঙান ম্রো। ‘ম্রো’ ভাষা গবেষক ও লেখক তিনি। প্রথম ‘ম্রো’ ভাষার অভিধান লেখকও তিনি। লেখালেখির পাশাপাশি আট বছর ধরে ছয় একর পাহাড়ি জায়গায় ড্রাগন ফল, আম, বরই, জাম্বুরা ও লেবুর বাগান করছেন। গতবছর এ বাগান থেকে ২ লাখ টাকার মত আয় করেছেন। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, পাহাড়িরা শত বছর ধরে জুমচাষ করে আসছে। আগে একেক বছর একেক পাহাড়ে জুমচাষ করতেন। বর্তমানে পাহাড়ি জমি পর্যাপ্ত না থাকায় প্রতি বছর একই পাহাড়ে জুমচাষ করতে হচ্ছে। ফলে ফলনও ভালো পাওয়া যায় না। জুমচাষে পরিশ্রমও তুলনামূলক বেশি শ্রম দিতে হয়। অন্যদিকে, ফলজ বাগানে প্রথম বছর যথাযথ পরিচর্যা করলে পরবর্তী বছর থেকে ফলন দিতে শুরু করে। বছর বছর ফলন বাড়তে থাকে। জুমচাষের চেয়ে ফলদ বাগান লাভজনক বলে জানান তিনি।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ এমএম শাহ্ নেয়াজ ঢাকা মেইলকে বলেন, পাহাড়ে জুমচাষ করতে জুমে আগুন দেওয়া লাগে। আগুন দেওয়ার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হয়, মাটির অনেক অর্গানিক উপাদান নষ্ট হয়ে যায় ফলে মাটির উর্বরতাও কমে যায়। জুমচাষ যেহেতু ‘স্থান পরিবর্তনশীল কৃষিকার্য’ তিন-চার বছর পরপর এক একটা পাহাড়ে জুমচাষ করা হয়। বর্তমানে জনসংখ্যার বৃদ্ধির চাপে, খাদ্যের চাহিদার চাপে কৃষকরা তিন-চার বছর অপেক্ষা করতে পারছে না। দেখা যায় একই পাহাড়ে প্রতিবছর জুমচাষ করায় ফলন তেমন ভালো হয় না।
তিনি আরও বলেন, বান্দরবানে চিম্বুক পাহাড় রেঞ্জ, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি দূর্গম পাহাড়ি এলাকার কৃষকরা ধিরে ধিরে জুমচাষ কমিয়ে দিয়ে ফল বাগান চাষে ঝুঁকছেন। কৃষি বিভাগ এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে, বিভিন্নভাবে তাদের সহযোগিতাও করা হচ্ছে।
টিবি