জেলা প্রতিনিধি
২৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:৪৬ এএম
ঘূর্ণিঝড় হামুনের তাণ্ডবে কক্সবাজারে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া, রামু, মহেশখালী, উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ৫০ হাজার কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। ফলে কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমন ধান, পান বরজ, সবজি ক্ষেত ও ফল বাগানের।
চকরিয়ার কৃষক আবুল কাশেম বলেন, আমার সবজি বাগান ও ফলের বাগান মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কয়েক ঘণ্টার বাতাসে আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেল। আমার পাঁচ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।
মহেশখালীর পান চাষি মোহাম্মদ হোসেন বলেন, বরজের চিহ্নসহ মুছে গেছে। অতিরিক্ত বাতাসে পান বরজের কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার তিনটি পান বরজের একটিরও অস্তিত্ব নেই।

কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কবির হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় হামুননের তাণ্ডবে কক্সবাজার জেলায় ৫০ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমন ধান, পান বরজ, সবজি ও ফল বাগানের। ঠিক কত টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে সেটি এখন বলা যাচ্ছে না।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় হামুনের তাণ্ডবের তিনদিন পার হলেও কক্সবাজার শহরসহ জেলার অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। ফলে পানির জন্য হাহাকার চলছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক না হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। দুর্গত এলাকা ভেঙে যাওয়ায় গাছ এখনও সরানো শেষ হয়নি। বসতঘর সংস্কারের চেষ্টারত মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভোগান্তি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড় হামুনের আঘাতে কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ লাখ মানুষ। ভেঙে গেছে ৩৮ হাজারের বেশি বসতঘর। গাছের উপর ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব চলেছে সবচেয়ে বেশি। হাজার হাজার গাছ ভেঙে চলাচল যেমন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে তেমনি জটিল করে দিয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়াও। এই তাণ্ডবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন ৩৩ কে.ভি লাইনের ১৭৪টি, ১১ কে.ভি লাইনের ১৮০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে। ২৩টি ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়েছে। ৪৯৬টি স্পটে তার ছিঁড়ে গেছে। ১ হাজার ৮৩৮টি মিটার তার নষ্ট হয়েছে। ৮০০টি স্পটে গাছ পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে কক্সবাজার শহরজুড়ে এখন পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার শহরের লালদিঘীর পাড়, পেশকারপাড়া, নুরপাড়া, বদরমোকাম, টেকপাড়া, পাহাড়তলী, মোহাজের পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পানির জন্য চলছে হাহাকার।
শহরের নুর পাড়ার বাসিন্দা মজিদুল হক জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিজস্ব পানির লাইনটি লবণাক্ত হওয়ায় পৌরসভার সরবরাহকৃত পানির উপর নির্ভর করতে হয়। বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে এই এলাকা বিদ্যুৎ চালু হয়েছে। কিন্তু পৌরসভার পানি সরবরাহ শুরু না করায় পানি নিয়ে ভোগান্তিতে রয়েছে। খাবার পানি বাজারে বোতলজাত পানি কেনা হচ্ছে। কিন্তু ব্যবহারের পানি নেই বুধবার রাত থেকে।
টেকপাড়া এলাকার হাসেম জানান, বুধবার রাত থেকে পানি সংকটে রয়েছে। এই এলাকায় বৃহস্পতিবার দুপুরে একটু বিদ্যুৎ এলেও পরে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মোটর না থাকায় পানি উঠানো যাচ্ছে না

কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল কাদের গণি বলেন, ‘বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের অর্ধেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু এতেও নানা প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতা দেখা দিচ্ছে। সরবরাহ শুরু হওয়ার পরও কিছু কিছু এলাকায় গাছ ভেঙে থাকা এবং তার ছিঁড়ে থাকার কারণে সরবরাহ বন্ধ করতে হচ্ছে। পুরোদমে বিদ্যুৎ কর্মীরা কাজ করছেন। হয়তো আগামীকাল শুক্রবার সকালের মধ্যে কক্সবাজার শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। কিন্তু উপজেলাগুলো আরও জটিল, কাজ চলছে। সেখানে আরও একদিন সময় লাগতে পারে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। এরপর বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সুশীল সমাজের সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় হামুন পরবর্তী মতবিনিময় সভা করেন মন্ত্রী।
ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, ঘূর্ণিঝড় হামুন কক্সবাজারের প্রকৃতির ওপর সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালিয়েছে। কক্সবাজারের ৪০ হাজার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষে যা যা করার প্রয়োজন তাই করা হবে। জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে যে চাহিদা পাঠিয়েছেন তা বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
প্রতিনিধি/এসএস