ঢাকা মেইল ডেস্ক
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০১:০৮ পিএম
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলার মতো এখন ঠাকুরগাঁওয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে ছাদ বাগান। সাধারণত নিজেদের বাড়ির ছাদে শখের এই বাগান তৈরি করে মানুষ। এবার দেখা গেল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের ছাদে শোভা পেয়েছে বিভিন্ন প্রকার ফলজ ও ভেষজের শতাধিক গাছ। আর এসব গাছ সম্পর্কে জানতে ও দেখতে ভিড় করছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা। এতে ঔষধি গাছ সম্পর্কে জেনে উপকৃত হচ্ছেন তারা।
দেখা যায়, হাসপাতালটির পুরাতন ভবনে আনুমানিক আড়াই হাজার ফিটের ছাদ জুড়ে অ্যালোভেরা, পাথরকুচি, উলটকম্বল, অন্তমূল, মিল্কবুশ, নিশিন্দা সহ প্রায় ৪০ প্রজাতির ভেষজ লাগানো হয়েছে। এছাড়া আপেল, কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, আম, জাম, আমরাসহ ফলজ মিলে মোট শতাধিক গাছ লাগানো হয়েছে। ফলের গাছগুলো রোপনের বছর না যেতেই কিছু কিছু গাছে ফলও ধরেছে।
হাসপাতালের বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা জানান, এই প্রদর্শনী বাগান থেকে ঔষধি গাছ সম্পর্কে জেনে পরে তা সংগ্রহ করে চিকিৎসা নিয়ে অনেকে সুস্থও হয়েছেন। এতে ফলজ ও ভেষজ বাগান করতে উদ্বুদ্ধও হচ্ছেন তারা।
রিয়া নামে ত্বকের চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার মুখের ত্বকে অনেক দাগ ও ব্রণ ছিল। তাই ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে আসলে এখানকার চিকিৎসক আমাকে ছাদে করা প্রদর্শনী বাগানটি দেখান ও অ্যালোভেরা গাছের রস ব্যবহার করতে বলেন। অ্যালোভেরার রস ব্যবহার করার ফলে এখন আমার মুখের ত্বকের দাগ চলে গেছে।

পীরগঞ্জ উপজেলার কালিগঞ্জ বাজার এলাকার যুবক দীলিপ কুমার রায় বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রস্রাবের জ্বালাপোড়ার সমস্যায় ভুগছি। তাই হাসপাতালে এলাম। এখানকার চিকিৎসক আমাকে ঔষধ দিয়েছেন। পাশাপাশি ছাদ বাগানে পরিদর্শন করিয়ে পাথরকুচি গাছ দেখিয়ে দেয় ও ওই গাছের রস খেতে বলেন।
একই উপজেলার রাহুল রায় চিকিৎসা নিতে এসে ও বাগান দেখে বলেন, আমার প্রচুর সর্দিকাশি ছিল। এখানকার চিকিৎসক আমাকে ঔষধ দিয়েছিলেন। পাশাপাশি বাশকপাতার রস খেতে বলেছিল। এই গাছের রস ও ঔষুধ খেয়ে আমি এখন সুস্থ। তবে এই বাগানটি দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। সম্ভব হলে আমিও বাড়িতে এমন ঔষধের গাছ রোপন করব।
শহরের পুলিশ লাইনস এলাকার শরিফুল ইসলামের মেয়ে সন্তান প্রসব করেছে, তাই মেয়েকে দেখতে তিনি হাসপাতালে এসেছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের ছাদে দেখলাম বিভিন্ন ঔষধের ও ফলের গাছ। বাগানটি দেখে খুব ভালো লাগল। আমার মতো অনেক রোগীর স্বজনদেরও দেখলাম এই বাগান পরিদর্শন করতে। এখানে যে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপন করা হয়েছে। এগুলোর ঔষধিগুণ সম্পর্কে জানতে পারছে অনেকে। এভাবে অন্যান্যরাও যদি বাগান করে তাহলে গাছ থেকে একদিকে ঔষধ পাওয়া যাবে অন্যদিকে ফলের গাছ রোপনের করলে ভিটামিনের চাহিদাও পূরণ হবে।

সদর উপজেলার রুহিয়ার অরুপ কুমার সেন বলেন, হাসপাতালের ছাদে এমন বাগান করায় আমি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ ঔষধি গাছ সম্পর্কে আমাদের সকলের জানা উচিত। ভবিষ্যতে আমিও বাড়িতে ফলজ ও ভেষজ গাছ রোপন করার চেষ্টা করব।
হাসপাতালের ন্যাচারাল মেডিসিন বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. জি.পি সাহা ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকারের নিদের্শনায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের বরাদ্ধকৃত অর্থায়নে করা হয়েছে এই বাগান। সরকার যদি অন্যান্য জায়গায়ও বড় পরিসরে এমন ঔষধি বাগান করে তাহলে একদিকে ঔষুধের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানুষও উপকৃত হবেন বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাগানটি মূলত প্রদর্শনীর জন্য করা হয়েছে। যাতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা এখান থেকে কোন রোগের জন্য কোন গাছের উপকরণ ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করবেন ও খেতে পারেন তা যেন জানতে পারেন। এছাড়া তারাও যেন নিজ নিজ বাড়িতে ফলজ ভেষজের গাছ রোপণ করেন। এজন্য আমরা এখানে বাগান মালি রেখেছি। তিনি ঔষুধি গাছ গুলো চিহ্নিত ও গুণাগুন সম্পর্কে রোগী এবং স্বজনদের জানান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ছাদ বাগানের সংখ্যা ও চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাসা বাড়িতে তো বাগান করা হচ্ছেই তার পরেও এখন হাসপাতালসহ বিভিন্ন দফতরের ভবনের ছাদে বাগান করা হচ্ছে। যারা ছাদ বাগান করছেন তাদের তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। তারা মূলত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, ইউটিউব ফেসবুকে ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। যখন তাদের বাগানের কোন সমস্যা হয় তখন তারা আমাদের কাছে আসেন ও আমরা তাদের সঠিক পরামর্শ প্রদান করি।
তবে তিনি ছাদ বাগান করার আগে ছাদের ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে জেনে বুঝে বাগান করার পরামর্শ দেন। কারণ ছাদে অতিরিক্ত ওজন বা ভারির কারণে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এছাড়াও ছাদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখারও পরামর্শ দেন জেলা কৃষি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, মূলত ছাদে বিভিন্ন ড্রাম টবে গাছ লাগানো হয়। এসব গাছের পাতা ও ড্রামের বা টবের মাটি পরে ছাদ অপরিষ্কার হয়ে যায় ও বৃষ্টি হলে সেগুলো ভিজে ছাদের ক্ষতি করে। এই দিক ও গাছের প্রজাতি নির্বাচনের দিকও খেয়াল রাখতে হবে। যে গুলো গাছ খুব উঁচু হয় ও খুব সহজেই ঝড় বাতাসে ঝরে পড়ে সেই ধরণের গাছ ছাদে রোপন না করাই উত্তম। ছাদে লাগানো গাছের দৈর্ঘ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এই বিষয়গুলো যদি বাগানিদের সুনির্দিষ্টভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় তাহলে ছাদ বাগান আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, আগে ছাদ বাগান করার উপকরণগুলো সহজলভ্য না হলেও এখন চাহিদার প্রেক্ষিতে এগুলো সহজলভ্য হচ্ছে। আশা করি খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ থেকে প্রকল্প প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন শুরু হবে। সেটি হলে আমরা আরও বেশি করে বাগানিদের সহায়তা করতে পারব।
প্রতিনিধি/এএস