জেলা প্রতিনিধি
১৪ এপ্রিল ২০২২, ০৭:৩৫ পিএম
নিঘুম রাত কাটাচ্ছেন এলাকাবাসীরা। কারণ, গ্রামে ঢুকে পড়েছে বুনো হাতির দল। খাবারের সন্ধানে ভারতীয় সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়া এই হাতির দলটি বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাণ্ডব চালাচ্ছে। এতে হাতির আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নজুড়ে।
এরই মধ্যে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ফসলি জমি ও ধানক্ষেতে তাণ্ডব চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে ভারতীয় এই বুনো হাতির দল। ফলে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরাও।
গত ৬ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে হাতির এই পালটি দিনে ও রাতে ধ্বংস করছে কৃষকের ক্ষেতের ফসল, পুকুরের মাছ ও বসতবাড়ি। রাত জেগে পাহারা দিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে আর ডাক ঢোল পিটিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না হাতির আক্রমণ। এতে কাঁচা-আধাপাকা ধানসহ বিভিন্ন ফসল নিয়ে শঙ্কিত পাহাড়ি এলাকার মানুষ। হাতির এমন আতঙ্ক বিরাজ করছে সীমান্তবর্তী ১০ গ্রামের মানুষের মাঝে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড় থেকে প্রতি বছর খাদ্যের সন্ধানে বন্য হাতির পাল নেমে আসে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার গারো পাহাড়ের পাদদেশে। বছরে ধানের মৌসুমে হাতির পাল এই উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামে খাদ্যের জন্য তাণ্ডব চালায়। বাড়িঘর ভাঙচুর, ক্ষেতের ফসল ও গাছপালা ধ্বংস ছাড়াও হাতির আক্রমণে এই অঞ্চলে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
এ বছরও গত ৬ এপ্রিল ভারত থেকে প্রায় ২৫-৩০টি বন্যহাতির একটি দল উপজেলার সীমান্তবর্তী ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের গারো পাহাড়ের লোকালয়ে প্রবেশ করে। ওইদিন রাতভর পাহাড়ের অশেনাকোণা এলাকায় গাছপালা, সবজি ক্ষেতসহ বোরো ধান খেয়ে বিনষ্ট করে হাতির দলটি। পরদিন সকালে উঁচু পাহাড়ের টিলায় অবস্থান নেয় হাতির দলটি। এতে করে চারদিকে হাতির আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, দিনের বেলায় হাতির পালটি পাহাড়ের টিলায় অবস্থান করলেও রাতে দলবেঁধে লোকালয়ে নেমে আসে। এরপর রাতভর চালায় তাণ্ডব, ক্ষতি করে ফসলের।
বুনো হাতির দলকে তাড়াতে গেলেই বাড়িঘরে হামলা চালায় হাতিগুলো। ফলে অশেণাকোনা, সাতানীপাড়া, শোমনাথপাড়া, বালুরচর, টিলাপাড়া, পাগল গোছা, দিঘলাকোণা, সোমনাথপাড়া ও হাতিবারকোণাসহ সীমান্তবর্তী প্রায় ১০ গ্রামের মানুষের মধ্যে এখন হাতির আতঙ্ক বিরাজ করছে। এসব এলাকার মানুষের দিন কাটছে শঙ্কায়, রাত কাটছে নির্ঘুম। তবে জমির ফসল ও হাতির তাণ্ডব ঠেকাতে স্থানীয় গ্রামবাসীরা রাতে মশাল, টর্চলাইট, জেনারেটর ও লাঠিসোটা নিয়ে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
অশেনাকোণা এলাকার কৃষক আশরাফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গত কয়েকদিন যাবত হাতির পাল পাহাড়ের টিলায় অবস্থান করছে। রাতে নেমে এসে লোকালয়ে হানা দেয়। ফসল বাঁচাতে রাত জেগে পাহারা দিতে হচ্ছে। আগুন জ্বালিয়ে ও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও থামানো যাচ্ছে না হাতির তাণ্ডব।
এ ব্যাপারে ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের সংগঠন ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হোসিও মুরং ঢাকা মেইলকে বলেন, কোনোভাবেই ঠেকানো যায় না বুনো হাতির দলকে। এসব হাতির স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। হাতি একবার যে ক্ষেত লক্ষ্য করে, তা বিনষ্ট করবেই। হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক গোষ্ঠীর এই নেতা।
এদিকে, কামালপুর ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান লাখপতি জানান, এই ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সীমান্ত এলাকায় হাতির আক্রমণ। হাতির তাণ্ডবে দিশেহারা এই অঞ্চলের মানুষ। প্রতি বছর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে এসব বুনো হাতির পাল। দিনের বেলায় টিলায় থাকলেও রাত হলেই লোকালয়ে নেমে আসে।
সীমান্তে হাতি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য গারো পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ছাড়াও সাধারণ মানুষ ও হাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসন করে হাতি ও মানুষের স্ব-অবস্থানের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন কামালপুরের এই ইউপি চেয়ারম্যান।
সার্বিক বিষয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন মুন জাহান লিজা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হাতির আক্রমণ বন্ধে বন বিভাগের সঙ্গে কথা হয়েছে। হাতির জন্য অভয়ারণ্য তৈরির কার্যক্রম অব্যাহত আছে। এতে করে হাতি স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও খাবার খেতে পারবে। লোকালয়ে এসে তাণ্ডব চালাবে না।’
/আইএইচ