জেলা প্রতিনিধি
২৭ জুন ২০২৩, ০৫:২২ পিএম
এক দশক আগে মাদারীপুর পুরান বাজার কামারপট্টি এলাকায় কামারের দোকানের সংখ্যা ছিল ১২টি। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪টিতে। দিন দিন কয়লাসহ লৌহজাত কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ধরনের ধাতব দ্রব্যের তৈরি আধুনিক পণ্য বাজার দখল করায় বিলুপ্ত প্রায় হয়ে এসেছে এই শিল্পটির। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে এ শিল্পটি। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলার কামার সম্প্রদায়ের মানুষেরা।
আগে প্রতিবারই কোরবানির ঈদের প্রাক্কালে জেলার কামারপট্টিতে দাঁড়ানোর জায়গা মিলতো না। এখন সেখানকার কামাররা সময় পার করছেন চা খেয়ে, আড্ডা দিয়ে! কেউ কেউ কাজ করলেও পরিষ্কার বোঝা যায়, অনেকটা নেতিয়ে পড়েছে এ ঐতিহ্য। কেউ কেউ বলছেন, আর কয়েক বছর পর এখানে কামারপাড়াই থাকবে না।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, প্রাচীন কাল থেকে মাদারীপুর জেলার কামার শিল্পের সুখ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। একসময় লোহার উপকরণ তৈরিতে দিনরাত ব্যস্ত থাকতো এ সম্প্রদায়ের শিল্পীরা। এখানকার তৈরি দা-বটি, কাস্তে, লাঙ্গলের ফলা, কোদাল, সাবল, খুন্তি জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি হয়ে থাকত। জেলার সদর, রাজৈর, শিবচর, কালকিনির প্রায় ১ হাজার পরিবার এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বংশ পরম্পরায় চলে আসা এক সময়ের ঐতিহ্য এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। নানা কারণে কামারদের অনেকেই পূর্ব-পুরুষদের পেশা পরিবর্তন করেছেন। বর্তমানে শুধুমাত্র হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এর মধ্যে শহরের পুরান বাজার কামারপট্টি এলাকার ননী কর্মকার, শুনীল কর্মকার, রাসু কর্মকার ও অতুল সরকার তাদের পূর্বপুরুষদের পেশা ধরে রেখেছেন।
সরেজমিনে পুরানবাজার কামারপট্টি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কোরবানির ঈদ ঘিরে তেমন কোনো ক্রেতার ভিড় নেই দোকানগুলোতে। দোকানের একপাশে হাঁপড় টেনে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন লোহার জিনিসপত্র। সামনের একটি অংশে তৈরি করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের বটি, চাপাতি, চামড়া ছোলার ছুরি ও জবাই ছুড়ি। প্রকারভেদে কেজি প্রতি ৫শ টাকা করে এসব পণ্যের দাম হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা। কয়েকজন ক্রেতা এসে বিভিন্ন দা, বটি, চাপাতি নেড়েচেড়ে দেখে দামদর করেছেন।
পুরান বাজার কামারপট্টির ষাটোর্ধ বয়সী কামার ননী গোপাল কর্মকার। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গে আছেন তিনি। এক সময় তার দোকানে ১২ জন কর্মচারী থাকলেও বর্তমানে তার দোকানে কর্মচারীর সংখ্যা ৬ জন। দিন দিন বেচাবিক্রি কমে যাওয়ার অনেকটাই হতাশা প্রকাশ করলেন তিনি।
ননী গোপাল কর্মকার বলেন, এক সময় কাজ কইরা কুল পাইতাম না, কোরবানি আইলে তো দুই মাস আগের থিকা দিন রাইত কাজ করা লাগতো। এহন আমাদের তৈরি লোহার জিনিসপত্রের চাহিদা কমে গেছে। বেচাবিক্রি কমে যাওয়ায় আমাগো অনেকেই এ পেশা ছাইড়া দিছে। বাপ দাদার পেশা তাই কষ্ট হইলেও কোনমতে ধইরা রাখছি।
দোকানের কর্মচারী সাগর কর্মকার (৩৫) বলেন, কোরবানির মৌসুমে একটু বেচাবিক্রি ভালো হলেও বছরের অন্য সময় তেমন কাজ থাকে না। বাজারে কারখানায় তৈরি নানারকম জিনিসপত্র চলে আসায় আমাদের হাতে তৈরি জিনিসের কদর কমে গেছে। তাছাড়া লোহার আর কয়লার দাম বাড়ায় আমাদের এসব তৈরি জিনিসের খরচও বেশি হচ্ছে। লোকজন তাই আগের মতো এসব জিনিস কিনে না।
পূর্বপুরুষদের একই পেশা ধরে রেখেছেন আরেক কামার শিল্পী অতুল সরকার (৫০)। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে তার পরিবার। বেচাবিক্রি কমে আসায় ছেলেদের আর এই পেশায় আনেননি তিনি।
অতুল সরকার বলেন, পুঁজির অভাব আবার মালপত্রের দাম বাড়ায় আমাগো জিনিসের চাহিদা কমে গেছে। এই অবস্থায় আমাদের লোকজন সব অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। আমার দুই ছেলের দুজনেই এখন অন্য কাজ করছে। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য পেলে আমরা কামাররা স্বচ্ছল জীবনযাপন করতে পারব। তাছাড়া কামার শিল্পও তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। নয়তো একটা সময় এই শিল্প আর টিকে থাকবে না।
এদিকে জেলার কামার শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে জেলা প্রশাসন থেকে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মারুফুর রশিদ খান।
জেলা প্রশাসক বলেন, কামার শিল্প আমাদের হাজারও বছরের প্রাচীনতম শিল্পের মধ্যে একটি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এ শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। আমরা দ্রুত জেলার কামার সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যবস্থা নেব। প্রয়োজনে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধাতব পণ্য তৈরিতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
প্রতিনিধি/এইচই