আব্দুল হাকিম
০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম
নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণ নিশ্চিত করা, বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের রানওয়ে উন্নয়নে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
প্রকল্পের মাধ্যমে রানওয়ের শক্তিমত্তা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক আলোকসজ্জা স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) মানদণ্ড পূরণের লক্ষ্য ছিল। তবে প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে কিছু অর্জনের কথা থাকলেও একাধিক সীমাবদ্ধতা, কারিগরি ঘাটতি, সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তিনটি বিমানবন্দরের রানওয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৬৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। সেই বর্ধিত মেয়াদও শেষের পথে থাকলেও প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো সন্তোষজনক নয়। আবারও মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাদের ভাষ্য, আগামী জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব নয়। তাই মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তবে ব্যয় বাড়বে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ বরাদ্দের অর্ধেকের কিছু বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৭৩ দশমিক ০৯ শতাংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
আরও পড়ুন: ঠিকাদারদের কাজ পর্যবেক্ষণে সতর্কতার তাগিদ বিমানমন্ত্রীর
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকল্পটি মূলত অন্তত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও এসব ঝুঁকির সবগুলো কতটা কার্যকরভাবে দূর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। ফলে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পর উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানবন্দরটির রানওয়েতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত সমস্যা ছিল। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল রানওয়ে স্ট্রিপের অপর্যাপ্ত প্রস্থ এবং রানওয়ে এন্ড সেফটি এরিয়া (রেসা) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী না থাকা। বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো উড়োজাহাজ দুর্ঘটনাবশত রানওয়ে অতিক্রম করলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে রেসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রকল্প শুরুর আগে এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।
এ ছাড়া রানওয়ের কিছু অংশে দীর্ঘদিন ধরে আংশিক ওভারলে বা খণ্ড খণ্ড সংস্কার কাজ চালানো হয়েছিল। ফলে রানওয়ের বিভিন্ন অংশে শক্তিমত্তার তারতম্য সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অসম শক্তিমত্তা ভবিষ্যতে পেভমেন্ট ব্যর্থতা কিংবা পরিচালন ঝুঁকির কারণ হতে পারে। প্রকল্পের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সতর্কতা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্প গ্রহণের আরেকটি বড় কারণ ছিল রানওয়েতে পানি জমে থাকার ঝুঁকি। বর্ষাকালে বা ভারী বৃষ্টিপাতের সময় রানওয়ের ওপর পানি জমে থাকলে উড়োজাহাজের চাকা ও রানওয়ের মধ্যে ঘর্ষণ কমে যায়, যা অবতরণ ও উড্ডয়নের সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আইএমইডি বলছে, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হলেও ভবিষ্যতে এর কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
মূল্যায়নে রানওয়ে এজ লাইট এবং থ্রেশহোল্ড লাইটিংয়ের ঘাটতিকেও বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলা অথবা কুয়াশা, বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ায় নিরাপদ বিমান চলাচলের জন্য এসব আলোকসজ্জা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং (এজিএল) ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। আইএমইডি এটিকে প্রকল্পের অন্যতম ইতিবাচক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করলেও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রানওয়ের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ ছিল। ক্রমবর্ধমান বিমান চলাচল এবং ভারী উড়োজাহাজ পরিচালনার ফলে বিদ্যমান রানওয়ের পেভমেন্ট সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এ কারণে প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রানওয়ের পেভমেন্ট ক্লাসিফিকেশন নম্বর (পিসিএন) বৃদ্ধি করা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এখন বোয়িং-৭৩৭ এবং এয়ারবাস-৩২০ শ্রেণির উড়োজাহাজ আরও নিরাপদভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে রানওয়ের সারফেস বা পৃষ্ঠের মান নিয়ে কিছু প্রশ্নও তোলা হয়েছে। পরিদর্শনের সময় রানওয়ের কয়েকটি অংশে অসমতলতা এবং বাম্পিংয়ের বিষয়টি নজরে আসে। যদিও পরে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে আন্তর্জাতিক মানের রানওয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের ত্রুটি উদ্বেগজনক। কারণ সামান্য ত্রুটিও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন: বিমানবন্দরের পাশাপাশি বগুড়ায় হবে ফ্লাইং একাডেমি: বিমান প্রতিমন্ত্রী
রানওয়ের কাঠামোগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও প্রকল্প গ্রহণের অন্যতম কারণ ছিল। বিদ্যমান অবকাঠামো অধিক ওজনের আধুনিক উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য পুরোপুরি উপযোগী ছিল না। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় রানওয়ের শক্তিমত্তা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন কারিগরি উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া ছিল নানা জটিলতায় ভরা। আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনিক জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, নকশা সংশোধন, বিদেশি সরঞ্জাম আমদানিতে সমস্যা এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। যদিও মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সরাসরি কোনো অনিয়মের অভিযোগ করা হয়নি, তবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হলেও এটি প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে আসে।

আইএমইডি আরও বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর যন্ত্রপাতি সংগ্রহে বিলম্বের কারণে ব্যয় বেড়েছে। তবে মূল্যায়নকারী সংস্থার মতে, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও পূর্বপ্রস্তুতি আরও কার্যকর হলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব ছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকল্পটি সামগ্রিকভাবে সফল হয়েছে। রানওয়ের শক্তিমত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা উন্নত হয়েছে, আধুনিক আলোকসজ্জা স্থাপন করা হয়েছে এবং বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন কারিগরি উন্নয়ন সম্পন্ন হওয়ায় বিমানবন্দরের সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে।
তবে আইএমইডির পর্যবেক্ষণ অনেকটাই সতর্কতামূলক। সংস্থাটি বলছে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে সেই অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতার ওপর। বিশেষ করে রানওয়ের স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা অঞ্চল, নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং কারিগরি তদারকির বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পর্যটন, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি বারবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়, তাহলে উন্নয়নের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোতে বাস্তবসম্মত সময়সূচি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, শক্তিশালী প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আইএমইডির মূল্যায়ন বলছে, রানওয়ে উন্নয়ন প্রকল্পটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত অগ্রগতি এনে দিলেও সাতটি বড় ঝুঁকি মোকাবিলার লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফলে শত কোটি টাকা ব্যয়ের পর উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার পূর্ণ সুফল আদৌ মিলেছে কি না, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে রানওয়ের মসৃণতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে, যা উড়োজাহাজ চলাচলের ঝুঁকি কমাবে এবং স্কিড রেজিস্ট্যান্স উন্নত করবে। বর্ষাকালে পানি জমে থাকার সমস্যা হ্রাস পাওয়ায় অপারেশনাল নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের অপারেশনাল অ্যাভেইলেবিলিটি বাড়বে, অর্থাৎ অধিক সময় বিমানবন্দর সচল রাখা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: বগুড়ায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও নতুন বিমানঘাঁটির ঘোষণা
রানওয়ের উন্নয়নের কারণে ফ্লাইট টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম কমবে, ফলে উড্ডয়ন ও অবতরণ দ্রুত সম্পন্ন হবে। এতে ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের হার কমবে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে, কারণ নিয়মিত বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজন কম হবে।
প্রকল্পটি দেশের আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে এবং নতুন এয়ারলাইন্স আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা তৈরি করবে। যাত্রী ও কার্গো পরিবহন বৃদ্ধি পাবে, ফলে বিমানবন্দরের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। একই সঙ্গে প্রকৌশলী ও টেকনিক্যাল জনবল আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। সঠিক গুণগত মান, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ বিমান পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও টেকসই করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই হবে না, ভবিষ্যতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ এবং কারিগরি তদারকি জোরদার করা না হলে শত কোটি টাকার এ বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, বিমানবন্দরের নকশা ও পরিচালনায় আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নির্ধারিত মান বা নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হয়। রানওয়ের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং দুই পাশের শোল্ডার বা নিরাপত্তা অঞ্চল সবই নির্ভর করে কোন ধরনের উড়োজাহাজ ওঠানামা করবে তার ওপর। এসব মান ঠিকভাবে অনুসরণ না করলে শুধু কাঠামোগত ত্রুটি নয়, অপারেশনাল ঝুঁকিও তৈরি হয় এবং পাইলটদের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজশাহী, সৈয়দপুরসহ বেশ কিছু বিমানবন্দরে নিয়মিত ডোমেস্টিক ফ্লাইট চলাচল করে এবং যশোর বিমানবন্দর মূলত প্রশিক্ষণ ও সামরিক ব্যবহারে সীমিতভাবে ব্যবহৃত হয়। এসব বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে কোন ধরনের এয়ারক্রাফট ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে রানওয়ের প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়। বড় বা আধুনিক উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য রানওয়ের যথাযথ প্রস্থ, লেন্থ এবং উইং ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যথায় নিরাপদ টেকঅফ ও ল্যান্ডিং ব্যাহত হতে পারে।
ড. হাদিউজ্জামান বিশেষভাবে রানওয়ের জলাবদ্ধতাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকলে রানওয়েতে পানি জমে যায়, যা উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত স্টাডি করে দেখতে হবে কোথায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েছে এবং কীভাবে তা উন্নত করা যায়। রানওয়ে পানির নিচে চলে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া সময়মতো প্রকল্প শেষ না হলে বিনিয়োগ অলস পড়ে থাকে এবং পুরো অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্য ব্যাহত হয়।
তিনি বলেন, বিমানবন্দর উন্নয়ন বা সম্প্রসারণ যাই হোক না কেন, তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হতে হবে। রানওয়ের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণ থেকে শুরু করে ড্রেনেজ, নিরাপত্তা এবং অপারেশনাল সুবিধা সব ক্ষেত্রেই আইকাও নির্দেশনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের জন্য অবকাঠামো নিয়মিত আপগ্রেড করা ছাড়া বিকল্প নেই।
এএইচ/এআর