০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ পিএম
একজন ম্যাজিস্ট্রেট আমার জীবন এলোমেলো করে দিয়েছিলেন। তাঁর নাম নীলুফার ইয়াসমিন।
আজ থেকে আট বছর আগে এসএসসি পরীক্ষায় নকল করার অপরাধে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
দিনটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমার সিট পড়েছিল ঘাটাইল জি.বি.জি. কলেজে। পুকুরের কাছে পূর্ব পাশের নিচতলার বিল্ডিংয়ে। আমাদের সঙ্গে সিট পড়েছিল সাধুটি নজীব উদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।
আমি তখন সরকারি গণ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিচ্ছি। ক্লাসের সেকেন্ড বয় আমি। হয়তো প্রথমই হতাম। নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার আগে আমার ডেঙ্গু ধরা পড়ল। আকাশ-পাতাল জ্বর। মা কেঁদে কেঁদে বললেন, পরীক্ষার দরকার নাই। তুমি বেঁচে থাকো আগে।
আমি লাল চোখ আর একশো দুই ডিগ্রি জ্বর নিয়ে বার্ষিক পরীক্ষা দিলাম। বই একটাও খুলে দেখতে পারিনি, কিন্তু সবকিছুই ছিল আমার নখদর্পণে। বিগত কয়েক বছরে আমাকে কেউ সেকেন্ড করতে পারেনি। যাই হোক, তা নিয়ে আফসোস ছিল না। এসএসসিতে আমি ভালো ফলাফল নিয়েই বের হব, সেই আত্মবিশ্বাস আমার ছিল।
সেদিন ছিল জীববিজ্ঞান পরীক্ষা। জীবপ্রযুক্তি এবং কোষ বিভাজন থেকে দুটো সৃজনশীলের উত্তর লিখেছি। তখন আমি টেলোফেজ ধাপের চিত্র আঁকছিলাম। একটা আয়তাকার গঠন এঁকে দুটো নিউক্লিয়াস দুই প্রান্তে। ভেতরে ক্রোমোজোম।
চিত্র আঁকাও শেষ করিনি। এরই মাঝে পেছনের দরজা দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ঢুকলেন।
তখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন নীলুফার ইয়াসমিন। পরিপাটি করে হালকা বেগুনি রঙের শাড়ি পরা। বাম হাতে ঘড়ি।
টুকটুকে ফর্সা। চুল খোঁপা করা। দেখে কম বয়সী মনে হয়। উনাকে আরও দুবার দেখেছি স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। ভীষণ গুরুগম্ভীর। বৃষ্টি নামার আগে আকাশ যেমন থমথমে থাকে, ঠিক অমন। ভ্রূ কুঁচকে থাকে সব সময়। মানুষের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায় কেবল এই কুঁচকানো ভ্রূতেই।
নীলুফার ইয়াসমিন সেদিন ক্লাসরুমে ঢুকলেন ঝড়ের বেগে। ডিউটিরত স্যার সালাম দিলেন তাঁকে। তিনি সালামের উত্তরও দিলেন না। চারদিকে দেখছিলেন। বাম পাশের ভাঙা জানালা, পেছনের নড়বড়ে বেঞ্চ, ক্যাঁচক্যাঁচ করা ফ্যান।
এক মিনিটের মাথায় তিনি ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে আঙুল তুলে কর্কশ গলায় বলে উঠলেন, এই ছেলে, তুমি দাঁড়াও তো। আমি উঠে দাঁড়িয়ে কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম।
তিনি দ্রুতবেগে আমার পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা কাগজ কুড়িয়ে নিলেন। কাগজের ভাঁজ খুলে দেখলেন, ওয়াটসন অ্যান্ড ক্রিকের চিত্রসহ ডিএনএর ডাবল হেলিক্স মডেলের বৈশিষ্ট্য লেখা।
ততক্ষণে সবাই লেখা বাদ দিয়ে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
ডিএনএর এই মডেল পাঁচ নম্বর সৃজনশীলে এসেছে। আমার ভেতরটা তখন ভূমিকম্পের শহরের মতো কাঁপছিল।
আমি কিছু বলার আগেই তিনি হুংকার দিলেন, এইসব নকলবাজি করে পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছিল?
গলা তখন গ্রীষ্মের পোড়া মাঠের মতো চৌচির। তবুও কাঁপা গলায় বললাম, না ম্যাডাম, এই কাগজ আমি আনিনি। আমার পায়ের নিচে কীভাবে এলো, আমি জানি না।
তিনি এক ঝলক আমার খাতার দিকে তাকালেন, তারপর আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ফাজলামি করো? পড়ে থাকা কাগজ তোমার হাতের লেখার সঙ্গে হুবহু মিলে।
তিনি আমার খাতা টান দিয়ে নিয়ে গেলেন টেবিলের কাছে। আমি পেছন পেছন দৌড়ে গেলাম। আমার কণ্ঠ তখন ভারী হয়ে গেছে। চোখে শ্রাবণের জল। ম্যাডাম, কসম করে বলছি, এটা আমি আনিনি।
না, তিনি কোনো কথাই শুনলেন না। খাতা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন, তারপর ব্যাগ থেকে লাল কলম বের করে খাতার ওপর বড় করে লিখলেন, "Expelled"। আরও কীসব লিখলেন। কালো ডায়েরি বের করলেন।
আমি কেবল সবকিছু ভেঙে যাওয়া দেখছিলাম। ধরুন, জীবনের সবটুকু সম্বল দিয়ে একটা বাড়ি করেছেন, কিন্তু নদীভাঙনে সব ভেসে গেল। আপনি দূর থেকে দাঁড়িয়ে ঠিক যেমন দেখতেন, আমিও অমন দেখলাম।
খবর পেয়ে ডিউটিরত আমাদের স্কুলের স্যাররা রুম থেকে দৌড়ে এলেন। ম্যাডাম, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। মুনতাসির আনাস আমাদের ক্লাসের সেকেন্ড বয়। ও এমন করতেই পারে না।
নীলুফার ইয়াসমিন দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, আপনারা কি আমাকে জ্ঞান দিতে এসেছেন? আমার যথেষ্ট জ্ঞান আছে। এসব নকলবাজদের পক্ষ নিয়ে সাফাই গাওয়া বন্ধ করুন।
আমার পায়ের কাছে থাকা সেই ডিএনএর চিত্রসম্বলিত লেখাটিতে তিনি আমার রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখলেন। তারপর সেটা একটা রঙিন খামে রাখলেন।
আমার সব বিষয়ের পরীক্ষাই বাতিল ঘোষণা করে সেই বছরের জন্য পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করা হলো। আমি পরীক্ষা দিতে পারব আগামী বছর।
আমার সেই মুহূর্তে কী করা উচিত বুঝতে না পেরে আমি নীলুফার ইয়াসমিনের পা চেপে ধরলাম। হাউমাউ করে কেঁদে বললাম, আল্লাহর কসম, ম্যাডাম, এটা আমার লেখা না।
এই ছেলে, পা ছাড়ো। এসব নাটক এখানে চলবে না—বলে তিনি আমার খাতা নিয়ে হনহন করে চলে গেলেন। সেদিনের মতো অন্য কোনো পরীক্ষার হল তিনি পরিদর্শন করেননি।
আমি তখন যুদ্ধফেরত আহত সৈনিকের মতো অথবা ঝড়ের মাঝে ডানাভাঙা পাখির মতো অথবা মাড়িয়ে যাওয়া শিউলি ফুলের মতো।
হেডস্যার আমার অবস্থা দেখে নিজেই কেঁদে ফেললেন। দাঁড়া, আমি দেখছি কী করা যায়। তুই ভেঙে পড়িস না।
না, স্যার কোনো ব্যবস্থা করতে পারলেন না, বরং আমার জন্য হেডস্যার চরম অপমানিত হয়ে ফিরে এলেন।
আমি গেট দিয়ে বের হয়ে এলাম। আমার কী করা উচিত বুঝতে পারছি না। একবার ভাবলাম ট্রাকের নিচে মাথা দিই। বাড়ি গিয়ে মা-বাবা যখন জিজ্ঞেস করবে, পরীক্ষা কেমন দিলি, বাজান?
কী উত্তর দেওয়া উচিত? ভালোই দিলাম বলব, নাকি বলব, এক বছরের জন্য বহিষ্কার করেছে আমাকে?
পরীক্ষার বাকি আরও এক ঘণ্টা। আমি ফতেরপাড়া ব্রিজের নিচে বসলাম। নদীর ঢেউ দেখলাম। তাকিয়ে আকাশটা দেখলাম। আকাশে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হবে নাকি? বৃষ্টি হলে হোক।
মা এখনও বাড়ি ফেরেনি। অন্যের বাসায় কাজ করছে। প্রতি মাসে কাজের জন্য তাকে পনেরোশ টাকা দেওয়া হয়। বাবা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে পঙ্গু অবস্থায় পড়ে আছেন আজ পাঁচ বছর ধরে। একসময় অটো চালাতেন। মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে আজ তাঁর চলাচলের ক্ষমতা নেই।
দুপুর একটা পনেরো মিনিটে আমি বাড়ি ফিরলাম। ভাঙাচোরা একটা টিনের ঘর। দুটো ছাগল কাঁঠালতলায় বাঁধা। মুরগিগুলো বারান্দায় যাচ্ছে বারবার খাবারের জন্য।
দরজা খোলার শব্দ পেয়েই বাবা গলা বাড়িয়ে বললেন, আনাস, আইছোস? পরীক্ষা কেমন হইলো?
আমি বাড়ি আসতে না আসতেই বাবা প্রতিদিন আমার পরীক্ষার খবর নিতেন। আমি প্রতিদিন শুয়ে থাকা মানুষটার পাশে এসে বসতাম। এই তো, দুদিন আগেই বললাম, ভালোই দিছি আব্বা। ফিজিক্স পরীক্ষা একটু কঠিন হইছে, কিন্তু আমি এ প্লাস পাবই।
আজ কী বলব বুঝে উঠতে পারছি না। বাবা আমার মুখ দেখেই বলে উঠলেন, কী রে বাজান, আইজ পরীক্ষা ভালো হয় নাই?
আমি কান্না গিলে ফেলে কাঁপা গলায় বললাম, হুম, ভালোই হইছে।
এতটুকু বলে আমি আমার রুমে চলে গেলাম। জানালার কাছে একটা ছোট্ট কাঠের টেবিল। তাতে আমার সবগুলো বই গুছিয়ে রাখা। আমার নোটখাতা, গাইড, ফাইল সব। টিনের বেড়ায় লাগানো একটা ক্যালেন্ডার।
আমি ফ্যানটা ছেড়ে দিলাম। স্কুল ড্রেস না খুলেই বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আমার ভেতরটা মনে হয় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমি আর কাঁদতেও পারছিলাম না।
ঘর থেকেই বাবা ডাকছিলেন, আনাস, ভাত খাইলি না?
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। মা এলেন তিনটার দিকে।
আমার ঘরে এসে মা কপালে হাত রাখলেন। জ্বর আইছে নাকি তোমার? ভাত তো পাতিলেই আছে দেখলাম। পরীক্ষা কি খারাপ হইছে?
আমি তখন মৃদু স্বরে বললাম, একটু পরে খাব।
সেই রাতটা কেমন কেটেছে, আমি বলতে পারব না। দুটো কালো কুকুর একটানা ডেকে যাচ্ছে। কণ্ঠে কেমন গভীর বিষাদ! বাদুড় পাখা ঝাপটাচ্ছে। বাবার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। রাতের সুনসান নীরবতা। উহু, এই জীবন আর নয়। সমস্ত দেনা-পাওনা শোধ হয়ে যাক।
রাত দুইটার দিকে ফ্যানের সঙ্গে দড়ি ঝুলিয়ে দিলাম। চেয়ারটা রাখলাম খাটের ওপর। দড়িটা ধরে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম, খেয়াল নেই। তারপর কী ভেবে সেই দড়ি খুলে হাউমাউ করে কাঁদলাম।
এত কষ্ট করে এতদূর এসে পরাজিত সৈনিকের মতো হার মানতে ইচ্ছে করছিল না।
মা-বাবার একমাত্র সম্বল আমিই। কত স্বপ্ন ছিল জীবনে ভালো কিছু করে মা-বাবাকে গৌরবের একটা জীবন দেব। টিনের ঘর ভেঙে দালান উঠবে, মায়ের নতুন শাড়ি, বাবার চিকিৎসা। ইস!
পরদিন সকালে আমি স্কুল ড্রেস পরে পরীক্ষার হলে রওনা দিলাম। মা-বাবাকে কিছুই জানানোর সাহস আমার হলো না। ড্রেস পরে ফাইল, কলম নিয়ে আমি বসে রইলাম ব্রিজের নিচে।
সেই সময়টুকু আমার কাছে মনে হয়েছিল পৃথিবীর দীর্ঘতম দিন। দীর্ঘতম দিন ২১ জুন, কিন্তু কষ্টে যেদিন যার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, সেটাই তার দীর্ঘতম দিন।
আমাকে নদীর পাড়ে বসে থাকতে দেখেছিলেন হাসেম মামা। হাসেম মামা প্রাইমারি স্কুলের সামনে ফুচকা বিক্রি করেন, আমার বাবাকেও চেনেন। হাসেম মামা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আইজ তো তোমাগো পরীক্ষা। তুমি এইখানে ক্যান?
আমি সত্যিটা তাঁকে বলে ফেললাম। হাসেম মামা ভীষণ আফসোস করলেন আমার জন্য। তারপর বলে উঠলেন, শোনো মামা, তুমি যদি অন্যায় না কইরা থাকো, তুমি এই বিচার মানবা ক্যান? তুমি পুলিশরে জানাও।
অতটুকু বুদ্ধি আমার ছিল। পুলিশকে জানিয়ে কিছু হবে না, কারণ পুলিশের চেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট তো আরও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নিজেই আইনের লোক।
আমি বাড়ি ফিরলাম দুপুর দেড়টায়। বাড়ি গিয়ে দেখি মা বারান্দায় বসে আছেন। আজ আর জিজ্ঞেস করলেন না পরীক্ষা কেমন দিলাম। কাছে যেতেই মা হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। এই ঘটনা ঘটছে, কিছুই বললা ক্যান?
পরে জানলাম, আমার খোঁজ নিতে হেডস্যার মাকে ফোন দিয়েছিলেন। তখনই সবকিছু জেনে গেছেন।
সেই দুপুরটা আমাদের কাটল এক অস্থির নীরবতায়। যেন আমাদের সমস্ত কথা, পেটের ক্ষুধা—সব কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেছে।
বাবা শুধু মাথায় হাত রেখে বললেন, আমি জানি তুমি কোনোদিন এই কাজ করো নাই। মা কেঁদে কেঁদে এইটুকু বললেন, যারা আমার পোলার সাথে এই কাজ করছে, তাদের বিচার হইবো।
বিকেলের দিকে কী মনে করে আমি ঘাটাইল থানায় গিয়েছিলাম। ডুবে যাওয়া মানুষও খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়। যখন থানায় গেলাম, তখন তাঁরা চায়ে ডুবিয়ে বিস্কুট খাচ্ছিলেন। আমার কথা শুনে হেসেই কুটিকুটি। শুধু এইটুকু বললেন, আগামী বছরের জন্য ভালো করে প্রস্তুতি নাও।
আমি বিরস মুখে থানা থেকে বেরিয়ে এলাম। গেটের কাছে আসতেই একজন কনস্টেবল শুধু এইটুকু বললেন, যদি তুমি আসলেই নকল করে না থাকো, তবে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার তোমার আছে।
গুণগ্রামের একজন উকিল আছেন, আমার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। উনার ফোন নম্বর নিয়ে যাও। তুমি কথা বলো।
এক টুকরো কাগজ ছিঁড়ে নম্বরটা আমি লিখে আনলাম। সেদিন রাতেই ফোন দিলাম তাঁকে। কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে যাচ্ছিল আমার।
তিনি অভয় দিলেন, আমার পাশে থাকবেন। আমার ভেতরে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল, ঠিক যেন অন্ধকার রাস্তায় হঠাৎ ঠিকরে পড়া আলো।
সকালবেলায় আমি তাঁর বাড়ি গেলাম। ছিমছাম গোছানো বাড়ি। ভদ্রলোকের বয়স বেশি না। তেত্রিশ বা চৌত্রিশ, এমন হয়তো। তাঁর নাম মাহিন সরকার।
তিনি আমাকে ভেতরে বসতে বললেন। আমার চোখেমুখে তখন গভীর বিষাদ। তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। আমার বুক ফেটে তখন কান্না আসছিল।
এই পৃথিবীতে সেই মানুষটাকে আপনার ভীষণ আপন মনে হবে, প্রচণ্ড দুঃসময়ে যে আপনার মাথায় হাত রেখেছিল।
তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, যদি তুমি আসলেই অন্যায় না করো, তবে তোমার হয়ে আমি লড়ব। এটা প্রমাণ করা কঠিন, তবে অসম্ভব না।
যে লেখাটা তোমার পায়ের কাছে পাওয়া গিয়েছিল, ওটা লাগবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে একটা লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে আগে।
সবকিছুই মাহিন সাহেব একা করলেন। রিট পিটিশন, লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো—সব। লাল খামে ভরা সেই অভিশপ্ত লেখাটি শিক্ষা বোর্ড থেকে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী মালিবাগের সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হলো।
ফরেনসিক হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্টদের প্রধান ছিলেন ড. ইশতিয়াক আহমেদ। ল্যাব সহকারী রাশেদ হাসান। আইনজীবী মাহিন সরকার, ডিবি পুলিশ রাফিন।
জাল দলিল, ব্যাংক চেকের স্বাক্ষর নকল, বানোয়াট সুইসাইড নোট, দলিলে ভুয়া স্বাক্ষর—এমন হাজারটা কেস সমাধান হয় এই ল্যাবে।
একটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি। ঘরের মাঝখানে একটি বড় ল্যাব টেবিল। তার ওপর রাখা একটি ডিসেক্টিং মাইক্রোস্কোপ, একটি স্পেকট্রাল কম্পারেটর মেশিন এবং তীব্র আলোর কিছু ল্যাম্প।
আদালত থেকে আসা সিলগালা করা লেখাটি বের করে ভিডিও স্পেকট্রাল কম্পারেটরের নিচে রাখা হলো।
ড. ইশতিয়াক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন সবকিছু। বুঝিয়ে বলছিলেন ডিবি পুলিশ রাফিনকে। নকল করা কাগজের লেখায় যেখানে যেখানে বাংলা 'ব' এবং 'র' আছে, সেখানে শব্দের শুরুতে এবং শেষে একটা অদ্ভুত লুপ বা মোচড় আছে। এটাকে বলে ইনিশিয়াল অ্যান্ড টার্মিনাল স্ট্রোকস।
এমনকি লেখার সময় তাঁর হাত সামান্য কেঁপেছেও। এবার আনাসের স্যাম্পলটা দেখুন। বোর্ড পরীক্ষার খাতা বের করলেন ড. ইশতিয়াক। আনাসের লেখার গতি অত্যন্ত মসৃণ, স্ট্রেট-লাইন এবং ডিরেক্ট। কোথাও কোনো লুপ নেই।
বোঝাই যাচ্ছে, লেখাটি আনাসকে ফাঁসানোর জন্য ওর লেখার সঙ্গে মিল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।
রাশেদ কম্পিউটারের রিডিং দেখে বলল,
স্যার, পেন প্রেসার অ্যানালাইসিসটাও কিন্তু ম্যাচ করছে না।
ড. ইশতিয়াক সায় দিলেন,
রাইট। নকল করা কাগজের লেখক যখন লিখেছে, তখন কাগজের ওপর কলমের চাপ ছিল ৩.৫ নিউটন গ্রাফের সমান, যার কারণে কাগজের ফাইবারগুলো গভীরে দেবে গেছে। হেভি পেন প্রেসার।
আর আনাসের লেখার গ্রাফ বলছে, তার লেখার চাপ সবসময়ই অত্যন্ত হালকা।
দাঁড়ান, এখনই শেষ নয়। ড. ইশতিয়াক হাসলেন। সবচেয়ে বড় ধোঁকাটা দেওয়া হয়েছে কলমের কালিতে। ইশতিয়াক সাহেব রাশেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আলট্রাভায়োলেট লাইট অ্যানালাইসিসটা রান করো।
রাশেদ ল্যাবের লাইট নিভিয়ে দিল। পুরো ল্যাবে এখন শুধু নীলচে ইউভি লাইটের আলো। মনিটরে দুটি লেখার কালির ফ্লুরোসেন্স দেখা যাচ্ছে। নকল করা কালির রং স্ক্রিনে উজ্জ্বল সবুজ দেখাচ্ছে, কিন্তু আনাসের খাতার কালির রং দেখাচ্ছে গাঢ় নীল।
আপাতদৃষ্টিতে দুটোই সাধারণ কালো কালির বলপেন মনে হলেও কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস বলছে, নকল করা লেখার কালিতে ডেলি বলপয়েন্ট কলম ব্যবহার করা হয়েছে।
আর আনাস যে কলম ব্যবহার করে অভ্যস্ত, তার আগের লেখা এবং পরীক্ষার মূল খাতার কালি হচ্ছে ম্যাটাডোর পিন পয়েন্টের।
শিক্ষা বোর্ডে একটি বিশেষ হিয়ারিং চলছে। শিক্ষাবোর্ডের ডিসিপ্লিনারি কমিটির প্রধান ড. আরিফ হোসেন গম্ভীর মুখে বসে আছেন।
আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করেই তিনি বলে উঠলেন, অন-ডিউটি ম্যাজিস্ট্রেট নকল জব্দ করেছেন। আপনারা ভেবেছেন, এই ডিসিশন এক নিমিষে বদলে যাবে? সেটা অসম্ভব।
মাহিন জানতেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বোর্ড কখনো পড়তে চায় না।
আপনি ফরেনসিক ল্যাবের রিপোর্ট খুলে দেখুন, স্যার। বেশ বিনীত ভঙ্গিতেই মাহিন সাহেব বললেন।
একে একে সব রিপোর্ট পড়লেন তিনি। পেন প্রেসার, কালির কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস, ইনিশিয়াল স্ট্রোকস—কোনো কিছুই মিলছে না।
প্রমাণিত হলো, এই নকল করা কাগজটি আনাসের ছিলই না। কার ছিল, সেটা বের করতে ডিবি পুলিশের বেশিক্ষণ লাগলও না। ওর ক্লাসের আর কার সঙ্গে ওর হাতের লেখার মিল আছে, তার একটা লিস্ট করা হলো। ওর সঙ্গে হাতের লেখার মিল ছিল পাঁচজনের।
সেই পাঁচজন একই কিন্ডারগার্টেন উইজডম ভ্যালিতে পড়ত। সেখানে একজনই শিক্ষক ওদের লেখা শেখাতেন, যার জন্য ওদের লেখার মিল ছিল অনেকটা। তবে অভ্যাসগত কারণে অক্ষরগুলোতে পার্থক্য থাকে, যেটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়।
যেমন, i লেখায় কেউ ফোঁটা দিয়েছে মাঝখানে, কেউ ডানদিকে, কেউ বামদিকে। জীববিজ্ঞান লেখায় জ্ঞ লিখেছে একেকজন একেকভাবে।
পরীক্ষার হলে ওদের রুমে নিহান নামের একটা ছেলে ছিল। ওর দুই বেঞ্চ পরেই সিট পড়েছিল। আনাসের সঙ্গে উইজডম ভ্যালিতে একসঙ্গে পড়ত।
এই ছেলেটা ওকে হিংসা করত আগে থেকেই। পাঁচজনের মধ্যে এই ছেলেটাই ওর হলে ছিল। তার খাতাও বোর্ড থেকে আদালতের নির্দেশে আনা হলো এবং সমস্ত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নকল করা লেখার সঙ্গে হুবহু মিলে গেল।
অবশেষে বোর্ডের নির্দেশে আনাসের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। অন্যদিকে নিহানকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হলো।
নীলুফার ইয়াসমিনকে রাঙামাটিতে বদলি করা হয়েছে। বদলি করার আগে বোর্ড চেয়ারম্যান এবং হাইকোর্ট থেকে তাঁকে এইটুকু হজম করতে হয়েছে—কারও হাতে পাওয়ার মানেই সেটার অপব্যবহার নয়। তাড়াহুড়োতে হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়।
আইনজীবী মাহিন সরকার এইটুকু তাঁকে বললেন,
এমনও হতে পারত যে অপরাধ সে করেইনি, সেই অপরাধ মাথা পেতে না নিয়ে সে নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। হতে পারত, তার পড়াশোনার প্রতি বিতৃষ্ণা এনে পড়ালেখা এখানেই শেষ করে দিয়েছে। একজন সম্ভাবনাময়ী বাচ্চার ভবিষ্যৎ শুধু ভুল বিচারের জন্য থেমে যেত।
যদি কখনও কিছু সন্দেহ হয়, তবে সেটা গভীর পর্যবেক্ষণ কিংবা এক্সপার্টদের সাহায্য নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
যে ছেলেটা নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করার জন্য সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত এসেছে, তার প্রশংসা না করে পারা যায় না।
তীব্র গরম পড়েছে। চারদিকে সুনসান নীরবতা। মাথার ওপর ক্যাঁচক্যাঁচ করে ফ্যান ঘুরছে। দরদর করে ঘামছে আনাস। গভীর মনোযোগ দিয়ে লিখছে সে। একজন স্যার ডিউটি করছেন। বোর্ড তাকে একাই পরীক্ষা নিতে বাধ্য হয়েছে।
পুরো পরীক্ষার হলে কেবল জয়ী এক ছেলের রাজত্ব।
মিথ্যা দায় মাথায় নিয়ে নিজেকে প্রমাণ না করে কখনো ডুবিয়ে দিতে নেই।
ক্ষমতার চেয়ে এই পৃথিবীতে সত্যের জয়—সবখানে।