০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৬ এএম
পঞ্চদশ পর্ব
কবি এই পত্রখানি তার চাচা কাজী কায়েম হোসেন সাহেবকে ইংরেজিতে লিখেছিলেন।
39 Sitanath Road,
Calcutta
27.8.35
My Dear uncle,
Taslim. It is after a 'Yuga' that I venture to write to you. I have heard from my brother of your kindness and help to them. Unfortunate as I am, I have not been able to help them in any way except that I have given them innumerable troubles. I have acquired everything except wealth. So, I am helpless to help even my ownself. I have sacrificed everything for my country or else I could be a rich man easily. From our childhood we have been taken care of by your kind family. In every drop of my blood flows your heavenly kindness and grace. It is only for these sympathy to the poor and oppressed that Allah has given you wealth, fame and peace. I do not know when Allah will take me to my native village to kiss the dust of your sacred feet. Wherever I live I remember you with deepest regards.
My elder brother is suffering from some sort of disease which you are the best judge of. Would you be kind enough to take charge of him earnestly as one of your patients? Please send me the bill for medicine ete. direct or through my brother to me and I shall promptly pay the amount to you, poor though I am. Hope you will do the needful about him. Moreover, I heard from my two brothers that some of my village brethren or rather relatives are against them and giving them much trouble. I with my brother seek shelter under you. You will kindly look after them and take necessary steps so that they may not be tortured by anybody. I appeal to you not only as Magistrate and President of Union Board but as our ever kind patron and 'Ashraya Data'. With lakh salam.
Affectionately yours
Nazrul Islam
এই চিঠিটি সাহিত্যিক সৌন্দর্য, গভীর মানবিকতা, বিনয় এবং আত্মত্যাগের অসাধারণ প্রেরণার উৎস। ভাষা সরল হলেও আবেগ, কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিকতায় সমৃদ্ধ। লেখক নিজের দারিদ্র্য, দেশপ্রেম, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং আত্মীয়ের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শীভাবে তুলে ধরেছেন। চিঠিটির সাহিত্য-শিল্পরূপের দিক দিয়ে অত্যন্ত উচ্চমানের। এর প্রধান দিক হলো-আন্তরিকতা ও আবেগ। প্রতিটি বাক্যে হৃদয়ের গভীর অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। আত্মীয়ের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার ভাষাকে জীবন্ত করেছে। এই পত্রে ব্যবহৃত ভাষাতে বিনয় ও আত্মসমালোচনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখক নিজেকে দুর্ভাগা ও অসহায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি পরিবারকে সাহায্য করার বদলে কেবল কষ্টই দিয়েছেন। এই আত্মসমালোচনা চিঠিটিকে আরও মানবিক করেছে। আরও দায়িত্ববোধসম্পন্ন করেছে।
চিঠির আরকেটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশপ্রেমের মহিমা। কবি লিখেছেন, "I have sacrificed everything for my country" এই বাক্যে দেশের জন্য সর্বস্ব ত্যাগের বিষয়টি স্বদেশ প্রেমের মহিমাকে অসাধারণভাবে প্রকাশ করে। এখানে ব্যক্তিগত সুখ-সমৃদ্ধির চেয়ে দেশের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আদর্শ ফুটে উঠেছে। দেশের জন্য আত্মোৎসর্গের এমন অকুণ্ঠ বাণী খুব কম কবির লেখাতেই পাওয়া যায়। কাজী নজরুল ইসলাম প্রকৃতই দারুণভাবে অনুভব করতেন, দেশপ্রেম ঈমানের অংগ। দেশের জন্য শহীদ হওয়া এক পবিত্রততম কর্তব্য বলেই তিনি মনে করতেন। এই কারণে তিনি লিখতে পেরেছেন, "I have sacrificed everything for my country".
এই পত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দিক হলো- চিত্রকল্প ও অলংকার ব্যবহার। In every drop of my blood flows your heavenly kindness and grace কিংবা kiss the dust of your sacred feet, এই ধরনের রূপক ও অতিশয়োক্তি ভাষাকে কাব্যিক মর্যাদা দিয়েছে। বক্তব্যকে আরও গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
এই পত্রে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও নৈতিক আবেদনেরও একটি প্রমাণ মেলে। কবি তার চাচাকে কেবল আত্মীয় হিসেবেই নয়, একজন সমাজনেতা, ম্যাজিস্ট্রেট এবং ইউনিয়ন বোর্ডের সভাপতির নৈতিক দায়িত্বের প্রতিও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।
তবে চিঠির মূলকথা হলো কৃতজ্ঞতা, আত্মত্যাগ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। লেখক দীর্ঘদিন পর তার প্রিয় চাচাকে চিঠি লিখে প্রথমেই তার পরিবারের প্রতি চাচার দীর্ঘদিনের স্নেহ, সাহায্য ও আশ্রয়ের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি নিজের আর্থিক অসহায়ত্বের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, দেশের স্বাধীনতা ও কল্যাণের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করায় তিনি সম্পদ অর্জন করতে পারেননি। তবুও এই আত্মত্যাগের জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।
এরপর তিনি তার বড় ভাইয়ের অসুস্থতার কথা জানিয়ে চাচাকে একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেন এবং ওষুধের সমস্ত খরচ নিজে বহনের অঙ্গীকার করেন। চিঠির শেষাংশে তিনি জানান যে, গ্রামের কিছু আত্মীয় তার দুই ভাইকে অন্যায়ভাবে হয়রানি করছে। তাই তিনি চাচার কাছে অনুরোধ করেন, যেন তিনি কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে নয়, পরিবারের অভিভাবক ও আশ্রয়দাতা হিসেবে তাদের রক্ষা করেন। সবশেষে চিঠি লেখার রীতি অনুযায়ী, অসংখ্য সালাম ও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি চিঠির সমাপ্তি টানেন।
তবে চিঠিটি পর্যালোচনান্তে বলা যায়, এই পত্রটি একজন দেশপ্রেমিক, বিনয়ী ও আদর্শবাদী মানুষের হৃদয়ের ভাষা। এতে একদিকে যেমন দেশ ও আদর্শের জন্য সর্বস্ব ত্যাগের গৌরব প্রকাশিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ, আত্মীয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাও অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে ফুটে উঠেছে। সাহিত্যিক দৃষ্টিতে এটি ব্যক্তিগত পত্রের সীমা অতিক্রম করে মানবিক মূল্যবোধ, আত্মত্যাগ এবং পারিবারিক বন্ধনের এক অনবদ্য মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পুত্র কাজী অনিরুদ্ধকে লিখিত চিঠি। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এই চিঠিটির সুনির্দিষ্ট কোনো সাল-তারিখ পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়, কবি ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর বা কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারানোর পূর্বে অথবা তার কাছাকাছি কোন সময়ে কবি যখন পরিবার ও সন্তানদের কাছ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন, তখন এই স্নেহভরা আবেগ-আকুতি নিয়ে পত্রটি লেখেন বলে ধারণা করা হয়।
বাবা নিনামণি,
তোমারও চিঠি পেয়েছি-চমৎকার লেখা তোমার। তোমাকে এইবার মায়ের বাড়িতে চাকরি করে দেব। তোমার ফুল পেয়েছি। চমৎকার ফুল-সুন্দর গন্ধ। ভগবানকে দিয়েছি তোমার ফুল। তিনি তোমার ফুল পেয়ে খুব খুশি হয়েছেন। তোমাকে চুমু দিয়েছেন তিনি। কালি ফুরিয়ে গেল তাই পেন্সিলে লিখছি, তোমরা বীর ছেলে হয়ে উঠবে, দুষ্টুমি করো না, কেঁদো না, জল ঘেঁটোনা। আমি রোজ তোমাদের দেখে আসি, চুমু খাই, তোমরা যখন ঘুমোও। চণ্ডীর সঙ্গে খেলা করবে। ঘুমোলে আমায় দেখতে পাবে। তখন আমি কোলে নেব। আরো ফুল পাঠিয়ো, তোমাদের ভগবানকে দেবো। এতগুলো চুমু নাও। ইতি-
তোমার বাবা
এই চিঠিটি লেখার কোন সাল তারিখ পওয়া যায় না। ফলে, এর প্রেক্ষাপট না জানলে আসলে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কেউ কেউ মনে করেন, কাজী অনিরুদ্ধের ছোট বয়সেই তাকে লিখিত পত্র এটি। চিঠির ভাষা থেকে এমন কিছু ধারণা করা যায়। তবে এই চিঠি থেকে প্রমাণ মেলে যে, নজরুল পারিবারিকভাবে ভালোই হিন্দু ধর্মীয় কালচার অনুসরণ করতেন। ‘ভগবানকে দিয়েছি তোমার ফুল।’ ‘আরো ফুল পাঠিয়ো, তোমাদের ভগবানকে দেবো।’ তবে নজরুলের আজন্ম প্রত্যাশা হলো, বীর হওয়া। বিদ্রোহী হওয়া। এবং দেশের জন্য লড়াই করা। সেই বিষয়টিও এখানে বেশ জোরেশোরেই তিনি লিখেছেন। ‘তোমরা বীর ছেলে হয়ে উঠবে’ এই বাক্যই তেমনি একটি শক্তিশালী উচ্চারণ।
প্রথম পত্রে দেশপ্রেমের গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে। লেখক বলেছেন, দেশের জন্য তিনি নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন। সহজেই ধনী হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশসেবার আদর্শে তিনি সম্পদ অর্জন করতে পারেননি। তার বক্তব্য দেশের জন্য ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও আর্থিক সমৃদ্ধি ত্যাগ করাই প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচয়। এখানে দেশপ্রেম কেবল আবেগ নয়; এটি ত্যাগ, সংগ্রাম ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক মহৎ আদর্শ।
দ্বিতীয় পত্রে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে স্নেহ, মমতা ও মানবিক অনুভূতির মধ্য দিয়ে। শিশুদের উদ্দেশে লেখকের উপদেশ, ‘তোমরা বীর ছেলে হয়ে উঠবে’ এই বাক্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাহসী, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। শিশুদের প্রতি তার ভালোবাসার আড়ালে রয়েছে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ ও মানবিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন। সুতরাং, প্রথম পত্রে দেশপ্রেমের প্রকাশ আত্মত্যাগে, আর দ্বিতীয় পত্রে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বীরত্ব ও আদর্শের বীজ বপনে। উভয় পত্রেই দেশপ্রেম ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর কল্যাণের এক মহৎ দর্শনে পরিণত হয়েছে।
লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক।