Dhaka Mail Logo

শিল্প ও সাহিত্য

কবি নজরুল পুত্র বুলবুলের মৃত্যু নিয়ে সাড়া জাগানো ভুল তথ্য

৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৯ এএম

চতুর্দশ পর্ব
সত্যিই সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এতো এতো ভুল তথ্য আপলোড হচ্ছে, ভাবতেও লজ্জা লাগে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হতে হতে এক সময় সত্য তথ্য উদ্ঘাটন একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ গুগল বা এআই মানুষের আপলোডকৃত তথ্য থেকেই তথ্য প্রদান করে থাকে। তাই আমাদের লেখালেখিতে যত ভুল থাকে, আধুনিক প্রযুক্তির এই সব মাধ্যম ভবিষ্যতে মানুষকে ততই ভুল তথ্য দেবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবেও অন্তত সঠিক তথ্যের প্রচার প্রসার প্রয়োজন। যাক। এবার মূল কথায় ফেরা যাক। কাজী নজরুলের জীবন বা মৃত্যু দিবস এলেই বুলবুলের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিম্নবর্ণিত পোস্টটির সাংঘাতিক সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এসব দেখে অনেকে হয়তো আবেগে কেঁদে ফেলেন। অনেকে সন্তানদের চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, দ্যাখ। এতো বড় কবির কতো বড় দুঃখ!! 

‘সবচেয়ে বড় অভাগা হলেন 
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।’

‘কবির চার বছরের শিশু ‘বুলবুল’যেই রাতে মা/রা গিয়েছিল সেই রাতে কবির পকেটে একটা কানাকড়িও ছিল না। 
‘অথচ কাফন, দাফন,
গাড়িতে করে দেহ নেওয়া ও গোরস্থানে জমি কেনার জন্য দরকার ১৫০ টাকা, সেই সময়ের ১৫০ টাকা মানে অনেক টাকা। 
এত টাকা কোথায় পাবে। বিভিন্ন লাইব্রেরীতে লোক পাঠানো হল। 
‘না’ টাকার তেমন ব্যবস্থা হয়নি। শুধুমাত্র ডি.এম লাইব্রেরি দিয়েছিল ৩৫ টাকা। আরো অনেক টাকা বাকি। টাকা আবশ্যক।
‘ঘরে দেহ রেখে কবি গেলেন এক প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক শর্ত দিল- এই মুহূর্তে কবিতা লিখে দিতে হবে। তারপর টাকা......
‘কবির মনের নীরব কান্না, যাতনা লিখে দিলেন এই কবিতার মাধ্যমে 

‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে
আমার গানের বুলবুলি।
করুণ চোখে চেয়ে আছে
সাঝের ঝরা ফুলগুলি।।

‘ফুল ফুটিয়ে ভোর বেলা কে গান গেয়ে
নীরব হ’ল কোন নিষাদের বান খেয়ে,
বনের কোলে বিলাপ করে সন্ধ্যারাণী চুল খুলি।।
‘কাল হতে আর ফুটবে না হায়, 
লতার বুকে মঞ্জরী,
উঠছে পাতায় পাতায় কাহার করুণ নিশাস মর্মরী।
‘গানের পাখি গেছে উড়ে শূণ্য নীড়,
কন্ঠে আমার,
নেই যে আগের কথার ভিড়,
আলেয়ার এই আলোতে
 আর, আসবে না কেউ কুল ভুলি।।
‘একজন সন্তানহারা পিতার কি নিদারুণ কষ্ট। যদিও এই মানুষটাই বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়েছেন....।
‘দেশের জন্য অনেক কিছু করেছেন, জেল খেটেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়িয়েছে...। 
কিন্তু হঠাৎ করে সেই মানুষটার পিছন থেকে সবাই সরে যায়..., 
একেবারে ভুলে যায়....., 
যাদের জন্য তিনি সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে গেছেন....সবচেয়ে বড় অভাগা হলেন 
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।’
 বিনম্র শ্রদ্ধা।

কাজী নজরুলের জীবন বা মৃত্যু দিবস এলেই বুলবুলের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে উপরে বর্ণিত পোস্টটি ঘুরে বেড়ায়। যার অধিকাংশই অসত্য আবেগী তথ্য। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীগণ তা শেয়ার দিতে থাকে। তখন কবি নজরুল সম্পর্কে নিরেট মুর্খ-ও লেখেন, ভাবগম্ভীর বেদনাসিক্ত নজরুল-মূল্যায়ন। এটি কবি নজরুলকে কল্পিত ও পরিকল্পিতভাবে অবমূল্যায়ন করার নামান্তর। তবে অভাবের কথাটি কিছুটা সত্য। সেটি শুধু ‘বুলবুলের’ মৃত্যুর সময় নয়, কাজী নজরুলের গোটা জীবনই ছিলো দারিদ্রের কষাঘাতে নিদারুণ জর্জরিত। বুলবুলের মৃত্যুর ঘটনার সুস্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায়, কাজী নজরুলের ঘনিষ্ট বন্ধু খান মুহম্মদ মুঈনুদ্দীন রচিত ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে শুধু ‘বুলবুলের মৃত্যু’ নিয়ে একটি পুরো অধ্যায় রয়েছে। বুলবুলের গুটি বসন্ত হলে ‘একজন বহুদর্শী চিকিৎসকের অধীনে তাকে রাখা হয়’। সূত্র: যুগস্রষ্টা নজরুল, পৃ. ১২৩। বুলবুলের চিকিৎসার জন্য সাধু ডেকে আনার জন্য যুগস্রষ্টা নজরুল গ্রন্থের গ্রন্থকার খান মুহাম্মদ মুঈনুদ্দীনকে অনুরোধ করেন। অর্থাৎ, বুলবুলের পুরো ঘটনার সাথে খান মুহাম্মদ মুঈনুদ্দীনের প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিলো। তিনি বুলবুলের জন্য ‘ধন্বতরী সাধু’ ডেকে আনতে গিয়ে রাত সাড়ে আট বা নয়টায় নজরুলের বাড়িতে ফেরত আসেন। এই সময় নজরুল ওপর থেকে দ্রুত নেমে এসে খান মুহাম্মদ মুঈনুদ্দীনকে জড়িয়ে ধরে বলেন-
আমাদের ফিরবার বাস প্রায় গতিশীল হয়ে উঠেছিল। আমরা তাড়াতাড়ি এসে বাসে উঠে পড়লাম। এ বাস ছেড়ে গেলে প্রায় দু’মাইল দূরে দমদম ষ্টেশন। সেখান থেকে শেয়ালদা তারপর ট্রাম, তারপর কবির বাড়ী। সে অনেক হ্যাংগাম।
কবির বাড়ীতে যখন ফিরে এলাম, তখন বেশ রাত হয়েছে। রাত তখন সাড়ে আট কি নয়টা হবে। আমাদের সাড়া পেয়ে কবি ওপর থেকে ছুটে নিচে নেমে এলেন। আর বুকে জড়িয়ে ধরেই হু হু করে কেঁদে ফেললেন। বল্লেনঃ “ওরে, সাধু কি এলেন না? কি বল্লেন তিনি। আচ্ছা বলতে পারিস, সাধু মরাদেহে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারেন কি না? বল - বল তিনি কি মরাদেহে প্রাণ দিতে পারেন?”
তিনি আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন।
হঠাৎ তাঁর এমন অতর্কিত আক্রমণে, আর এই এলোমেলো কথায় হকচকিয়ে গেলাম।
সূত্র: যুগস্রষ্টা নজরুল, পৃ. ১২৪।
উক্ত ফেসবুক পোস্টের ‘ঘরে দেহ রেখে কবি গেলেন এক প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক শর্ত দিল- এই মুহূর্তে কবিতা লিখে দিতে হবে। তারপর টাকা......। এই কথাটি পরিপূর্ণ মিথ্যা ও অপপ্রচার। কারণ, বুলবুলের মৃত্যু পরবর্তী সময়ে কবি বাড়ির বাইরে যাননি। কবিবন্ধুরা টাকা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন প্রকাশক ও ডি. এম লাইব্রেরিতে গিয়েছিলেন। সেই বিষয়টিও ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ গ্রন্থে খান মুহাম্মদ মুঈনুদ্দীনের মন্তব্য এমন-
বহু চেষ্টার পর একজন শিখ ড্রাইভারের গাড়ী পাওয়া গেলো। তবে তাঁকে পাঁচটাকা দিতে হবে। তখনকার বাজারদরের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশী।
কিছু টাকা? আর্য পাবলিশিং হাউস, ডি.এম. লাইব্রেরী অনেক জায়গায়ই লোক পাঠানো হয়েছিল টাকার জন্য। শুধু ট্যাকসী ভাড়াইতো নয়। কাফন আছে, গোর-খোদাই আছে, তারপর জমি কিনে কবরের স্থান রিজার্ভ করার ব্যবস্থা আছে, প্রায় দেড়শো টাকার দরকার। সে যুগে দেড়শো টাকাতো অনেক। এতো টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? এই মহুর্তে?
যে লোক টাকার জন্য গিয়েছিল, ফিরে এসে খবর দিলো, কোথাও টাকা পাওয়া গেলো না। আবার ডি.এম. লাইব্রেরীতে তাকে পাঠানো হলো।
এরপর সম্ভবতঃ ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ টাকা নিয়ে ডি.এম. লাইব্রেরীর স্বত্বাধিকারী গোপাল দাস মজুমদার মহাশয় নিজেই এসে উপস্থিত হলেন। তবু অনেক টাকা বাকী রয়ে গেলো। জনাব হামিদ বাদবাকী টাকার ব্যবস্থা করেছিলেন।
সূত্র: যুগস্রষ্টা নজরুল, পৃ. ১২৫।
উক্ত পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, প্রকাশক শর্ত দিল- এই মুহূর্তে কবিতা লিখে দিতে হবে। তারপর টাকা......
‘কবির মনের নীরব কান্না, যাতনা লিখে দিলেন এই কবিতার মাধ্যমে’।  

‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে
আমার গানের বুলবুলি।
করুণ চোখে চেয়ে আছে
সাঝের ঝরা ফুলগুলি।।

‘ফুল ফুটিয়ে ভোর বেলা কে গান গেয়ে
নীরব হ’ল কোন নিষাদের বান খেয়ে,
বনের কোলে বিলাপ করে সন্ধ্যারাণী চুল খুলি।।
‘কাল হতে আর ফুটবে না হায়, 
লতার বুকে মঞ্জরী,
উঠছে পাতায় পাতায় কাহার করুণ নিশাস মর্মরী।
‘গানের পাখি গেছে উড়ে শূণ্য নীড়,
কন্ঠে আমার,
নেই যে আগের কথার ভিড়,
আলেয়ার এই আলোতে
আর, আসবে না কেউ কুল ভুলি।।

প্রথমত এটি কোন কবিতা নয়। এটি নজরুল রচিত কাব্যসংগীত। গানটি ‘গানের মালা’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এবং এটির সঠিক রচনাকাল খুঁজতে গিয়ে দেখা গেলো যে, বুলবুল মারা যায়, ১৯৩০ সালে। আর গানটি রচিত ১৯৩২ সালের পরে। হতে পারে সন্তানের মৃত্যুশোকই এই গান রচনার মূল প্রেরণা। তবে তা মৃত্যুর পরপরই সন্তানের দাফন খরচা যোগাড়ের জন্য প্রকাশকের নিকট গেলে, তাৎক্ষণিক গান রচনার শর্তে আটকে যাওয়া এবং তাৎক্ষণিক গানটি লেখার মাধ্যমে টাকা অর্জিত হয়, এটি সম্পূর্ণ অলীক কল্পনা। এসব অপকল্পনার কোন ভিত্তি নেই। ‘নজরুল সঙ্গীত ও সাহিত্যকোষ’ গ্রন্থে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন- 
ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের: গ্রন্থ-‘গানের মালা’। ইমন-ভূপালী-দাদরা (সুরটি বর্তমানে লুপ্ত)। পত্রিকা-১) ‘বুলবুল’, মাঘ, ১৩৪৪। ২) সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা, মাঘ, ১৩৪৬ (স্বরলিপি সহ)। স্বরলিপিকার-অণিমা চক্রবর্তী। সুর-শৈলেশ দত্তগুপ্ত। রেকর্ড-এইচ.এম.ভি.; ডিসেম্বর, ১৯৩৯। রেকর্ড নং-এন ১৭৪০২। শিল্পী-সন্তোষ সেনগুপ্ত। সুর-শৈলেশ দত্তগুপ্ত। 

সূত্র: পৃ. ১৮৪। প্রথম প্রকাশ ২৫ মে ২০১৭। প্রকাশক: মুনীর বিন আবদুল আযীয। হরফ প্রকাশনী। এ-১২৬, ১২৭ কলেজ স্ট্রীট মার্কেট ।। (দ্বিতল)। বর্ণপরিচয় বুক মল। কলকাতা ৭০০ ০০৭।

এখানে লক্ষ্য করা যায় গানটি রেকর্ড হয়েছে ১৯৩৯ সালে। তবে এখানে তথ্য পাওয়া গেলো যে, এই গানটি -‘গানের মালা’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এই গ্রন্থটি কতো সালে প্রকাশিত হয়, তার প্রমাণ মেলে রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নজরুল নির্দেশিকা’ গ্রন্থ হতে। উল্লেখিত এই গ্রন্থে রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, 
গানের মালা, কার্তিক/অক্টোবর-নভেম্বর। গানের সংকলন: প্রথম প্রকাশ: কার্তিক ১৩৪১, অক্টোবর ১৯৩৪।
সূচিপত্র: আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি, আধো আধো বোল, না-ই বা পরিলে নোটন খোঁপায় ঝুমকো জবার ফুল, অয়ি চঞ্চল লীলায়িত দেহা, ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি, ঝরা ফুল বিছানো পথে, প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথাই, আজ নিশীতে অভিসার, কার মঞ্জীর রিনি ঝিনি বাজে, নিরুদ্দেশের পথে আমি হারিয়ে যদি যাই, বলরে তোরা বল ওরে আকাশ-ভরা তারা, বল সখি বল ওরে সরে যেতে বল, নিশি না পোহাতে যেয়ো না যেয়ো না, চম্পা পারুল যুথী টগর চামেলী, দূর দ্বীপ বাসিনী, মোমের পুতুল মমির দেশের মেয়ে, বকুল বনের পাখী, মনের রঙ লেগেছে, আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে, যবে সন্ধ্যা বেলায় প্রিয় তুলসী তলায়, আঁখি তোলো দানো করুণা, মদির স্বপনে মম্, বন-ভবনে, মুঠি মুঠি আবির ওকে কাননে ছড়ায়, বল্লরী-ভুজ-বন্ধন খোলো, তব যাবার বেলা বলে যাও, তরুণ অশান্ত কে বিরহী, বরষা ঐ এল বরষা, ঝরে বারি গগনে ঝুরু ঝুরু, আমি ময়নামতীর শাড়ী দেবো, স্নিগ্ধ শ্যাম-বেণী বর্ণা, মেঘ মেদুর গগন কাঁদে হুতাশ পবন, আমি অলস উদাস আনমনা, কোয়েলা কুহু কুহু ডাকে, তোমার হাতের সোনার রাখী, এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী, দূর প্রবাসে প্রাণ কাঁদে, শুভ্র সমুজ্জল হে চির নির্মল, দোলে প্রাণের কোলে প্রভুর নামের মালা, শঙ্কা শূন্য লক্ষ কণ্ঠে বাজিয়ে শঙ্খ ঐ, চলরে চপল তরুণ দল বাঁধন হারা, বীরদল আগে চল, জননী মোর জন্মভূমি, কে পরালে মুক্তমালা, নারেরে মোর কালো মেয়ে, মাতল গগন অঙ্গনে ঐ, দেখে যা-রে রুদ্রানী মা, মহাকালের কোলে এসে, শ্মশান-কালির নাম-শুনে রে, জাগো জাগো শঙ্খ-চক্র গদাপদ্ধধারী, লুকোচুরি খেলতে হরি হার মেনেছে, খর রৌদ্রের হোমানল জ্বালি, সানাই, উত্তরীয় লুটায় আমার, ওরে ও স্রোতের ফুল, বুনো শ্যামা তন্ত্রী আমি মেঘ বরণা, মম আগমনে বাজে আগমনীর ঝড়, ঘুমাও ঘুমাও দেখিতে এসেছি, কলঙ্ক আর জ্যোৎস্নায় মেশা, ফুলের সুবাস ঘুরে, এল শ্যামল কিশোর, এল এলরে বৈশাখী শেষের যাত্রী আমি, ফুলের মত ফুল্ল-মুখে, ফিরে ফিরে কেন, শূন্য এ বুকে, তুমি ভোরের শিশির রাতের নয়ন-পাতে, রাত্রি তারি স্মৃতি, আঁধার রাতের তিমির দুলে আমার মনে, দশ হাতে ঐ দশদিকে মা, মা এসেছে মা এসেছে, ঐ কাজল কালো চোখ, ও কালো বউ যেয়ো না আর, আগের মত আমের ডালে, তোর রূপে সই গহন করে, ঝড় ঝঞ্চায় ওড়ে নিশান, আমার প্রাণের দ্বারে ডাক দিয়ে কে যায়, এল ঐ বনান্তে পাগল বসন্ত, সহসা কি গোল বাধাল পাপিয়া আর পিকে, এস কল্যানী চির আয়ুষ্মতী, দাও শৌর্য্য দাও ধৈর্য্য, চাঁদের দেশের পথ-ভোলো ফুল চন্দ্র মল্লিকা, রঙ্গীলা আপনি রাধা, কুক্কুম আবীর ফাগের, এল ফুল-দোল ওরে এল ফুল-দোল, যাবার বেলায় ফেলে যেয়ো, জাগো দুস্তর পথের নব-যাত্রী, ডেকো না আর দূরের পিয়া, ভেঙোনা ভেঙোনা ধ্যান, যাহা কিছু আছে মম প্রিয়তম, মোর বুক-ভরা ছিল আশা, বনে মোর ফুল ঝরার বেলা, মিলন-রাতের মালা হব তোমার অলকে, যায় ঝিলমিল ঝিলমিল ঢেউ তুলে, কাজরী গাহিয়া চল-গোপ ললনা, তরুণ-তমাল বরণ এস শ্যামল আমার, যৌবনে যোগিনী সাজিয়া লো সজনী, খুলেছে আজ রঙের দোকান, একেলা চুলিয়া চুলিয়া কে যায়, অম্বরে মেঘ-মৃদং বাজে জলদ তালে, সোনার হিন্দোল কিশোর-কিশোরী দোলে, তৃষিত আকাশ কাঁপে রে, ওকে দূর উদাসী হায়, দোলা লাগিল দখিনার বনে বস, তুমি আমার সকাল বেলার সুর, আর্শিতে তুই নিজের রূপই দেখিস চেয়ে চেয়ে, যোগী শিব-শঙ্কর ভোলা দিগম্বর, যুগ যুগ ধরি লোকে লোকে মোর, আনাদরে স্বামী পড়ে আছি আমি, ভোরে স্বপনে কে তুমি দিয়ে দেখা, ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে, আমার গানের বুলবুলি, আমার গানের মালা আমি করব কারে দান। নজরুল নির্দেশিকা পৃ. ৭৯-৮০।

এই গ্রন্থ থেকে দেখা যায় যে, কবি ১৯৩৪ সালের সেপ্টম্বর মাসে ‘সুরলিপি’ নামক গানের বই প্রকাশ করেন। সুতরাং, ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে, আমার গানের বুলবুলি, এই গানটি যদি সেপ্টম্বর ১৯৩৪ এর আগে লেখা হতো, তাহলে তা ‘সুরলিপি’তে স্থান পেত। কিন্তু গানটি স্থান পেলো ১৯৩৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত ‘গানের মালা’ গ্রন্থে। তাই গানটি ১৯৩৪ সালের অক্টোবর অথবা ১৯৩৪ সালের কোন সময়ে লিখিত। আর যদি মনে করা হয় পুরাতন গান কবি ১৯৩৪ এ এসে গ্রন্থভুক্ত করেছেন, তাহলেও তা বুলবুলের মৃত্যুর সময় টাকা আনতে গিয়ে প্রকাশকের শর্তে লেখা হয়েছে এমনটি ভাবার কোন অবকাশ নেই। এমন একটি অপপ্রচার বাজারে বেশ প্রচলিত তা হলো-বুলবুলের মৃত্যুর পরপরই নজরুল গান লেখেন, কোলকাতা বেতারে সাথে সাথে বাণী বদ্ধ হয় ও একই সাথে প্রচারিত হয়। সেই গানটি হলো- ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয়’। এমন বিষয়কে নজরুল গবেষক- ড. করুণাময় গোস্বামী গুজব বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতামত এমন-
এ গানটি রচনার একটি বিশেষ প্রসঙ্গ আছে। স্বনামধন্য গায়ক জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী রবীন্দ্রনাথের 'অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়/কণাটুকু যদি হারায় তা লয়ে প্রাণ করে হায় হায়' গানটি রেকর্ডে গাইতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর গায়নভঙ্গিতে গানের রাবীন্দ্রিক মেজাজ না এসে প্রবল রাগসাংগীতিক মেজাজ এসে যাচ্ছিল বলে তিনি সে গান রেকর্ড করার অনুমতি পাননি। জ্ঞান গোস্বামী সে ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং ওই সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি গান লিখে দিতে বলেন নজরুলকে। নজরুল তখন ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়’ গানটি রচনা করেন। জ্ঞান গোস্বামী খেয়ালোপম ভঙ্গিতে গেয়ে গানটিকে অসাধারণ জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, এই গানটি কবিপুত্র বুলবুলের মৃত্যুস্মৃতি-বিজড়িত। কিন্তু আসলে যে তা নয়, সে কথা জানিয়েছেন শান্তিপদ সিংহ। তিনি বলেছেন: ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়’ গানটি ১৯৩৩ সালে রচিত। বুলবুল মারা গেছে ১৯৩০ সালে। বুলবুলের মৃত্যুসম্পর্কে জড়িয়ে এ গানটি সম্পর্কে গুজব অজ্ঞাতসারে আমিই ছড়িয়েছিলাম। এক ছুটির বারে একজন নজরুলভক্ত এসে আমাকে সকাল থেকে বিরক্ত করতে আরম্ভ করেন নজরুল সম্পর্কে খুঁটিনাটি নিয়ে। শেষের দিকে গানটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন যে, বুলবুল মারা যাবার পরেই কি গানটি রচিত হয়েছিল? আমি তাঁকে বলেছিলাম-হ্যাঁ। তিনি একথাটা বিশ্বাস করে ছড়িয়ে দেন। এর জন্য আমাকে দু-চার জনে প্রশ্ন করেছিলেন, আমি তাঁদের সত্য কথাটা বলেছিলাম। 
নজরুল গীতি প্রসংগ-পৃ. ৩৪৬।

তবে এ কথা সত্য যে, কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ছিলো দারিদ্র্য, সংগ্রাম, বেদনা ও সৃষ্টিশীলতার অনন্য সমন্বয়। পুত্র বুলবুলের অকালমৃত্যু নিঃসন্দেহে তার জীবনের এক গভীর শোকাবহ অধ্যায়। কিন্তু সেই শোককে কেন্দ্র করে অসত্য, অতিরঞ্জিত ও কাল্পনিক কাহিনি প্রচার করে কবির জীবনকে মূল্যায়ন করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। ইতিহাসের সত্যকে আবেগের রঙে বিকৃত করলে তা একসময় প্রকৃত ইতিহাসকেই আড়াল করে দেয়। বিশেষত নজরুলের মতো একজন কালজয়ী সাহিত্যিকের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে কোনো বক্তব্য প্রচারের আগে তথ্যসূত্র যাচাই করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো লেখা আবেগস্পর্শী হলেই তা সত্য হয়ে যায় না। বরং আবেগের পাশাপাশি যুক্তি, গবেষণা ও প্রামাণ্য তথ্যের সমন্বয় জরুরি। মনে রাখতে হবে, নজরুলকে ভালোবাসার অর্থ তার সম্পর্কে প্রচলিত প্রতিটি গল্প বিশ্বাস করা নয়; বরং প্রকৃত নজরুলকে জানা, তার জীবন ও সৃষ্টিকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নির্ভুল ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া। সত্যের প্রতি এই দায়বদ্ধতাই হোক কবির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি। [চলবে]

লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক।