Dhaka Mail Logo

শিল্প ও সাহিত্য / প্রবাস

উগো, রদ্যাঁ, পিকাসোর প্রেমের নগরে

২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২০ পিএম

ঘোড়া-চেস্টনাটের গাছগুলো হঠাৎই যেন ধাক্কা খেল খুব। কুকড়ে গেছে। বলা নেই কওয়া নেই ঝাপটে ধরল এসে হিম। সবুজপাতাদের কী আর সয় এমন তর! ফ্যাকাশে রঙ ধরল বুকে। ঝরে যাওয়ার কাল এসেছে দুয়ারে।

বুনো পায়রাগুলো? ছাঁইরঙা ওই পালকই যার উষ্ণতার ভরসা, তার কথাটাই ভাবুন একবার? নাওয়া-খাওয়া ভুলে রীতিমতো হিমের সঙ্গে লড়ছে গোল হয়ে বসে। ঘুঘু পাখির মতো দেখতে, কাকের মতো বড় কয়েকগুণ, নাম তার কাঠঘুঘু। ফরাসিরা বলে, পিজোঁ রামিয়ে। আর আছে, তুর্কি ঘুঘু। ধূসর-বাদামী। গলার পেছনে যার কালো অর্ধচন্দ্র দাগ। এদেশের লোকের আদুরে ডাক- ‘তুর্তরেল ত্যুর্ক’। ঘন গাছের পাতার ফাঁকে সেই যে সিঁধিয়ে গেছে, বেরোবার নামটি নেই। 

fef71e4b-adc8-4436-81d9-d6fa43dfe3bb_(1)

এই হচ্ছে অক্টোবরের প্যারিস নগরীর গাছ-পাখিরা। আর মানুষ? সুযোগ পেলেই দেহের অনাবৃত অঞ্চলে মৃদু হুল ফোঁটাচ্ছে কচি দাঁত গজানো হিম। অবশ্য পারিজিয়ানতের কাছে শরতের ‘শীত শীত’ দিন বেশ উপভোগ্য। ট্রেঞ্চ কোট, উলের কোট, সোয়েটার, জ্যাকেটের সঙ্গে জিনস, মিডি স্কার্ট, ট্রেইলর্ড ট্রাউজার আর বুট। পথে পথে এমনই সাজসজ্জা মানুষের এখন। ক্যামেল, নেভি, অলিভ, বারগন্ডি, ক্রিম-যার যে রঙ পছন্দ। 

আরও পড়ুন: ইংরেজি অনুবাদে হাবিবুল্লাহ ফাহাদের নতুন গল্পের বই

সাহিত্যের ভাষায়, ‘লোতোন, লা সেজোঁ দে ফয় মর্ত।’ অর্থাৎ শরৎ-মরা পাতার ঋতু। প্যারিসের নানন্দিক সব ইটপাথরের স্থাপত্য। শতবর্ষী কাতেদ্রাল (ক্যাথেড্রাল), ইগলিস (গির্জা) যেমন আছে, আছে রাজপ্রাসাদ, নকশাখচিত বাড়ি, আছে আধুনিক স্থাপত্যের নির্দশন বহুতলভবনও। তেমনি সবুজেও পিছিয়ে নেই ভিক্তর উগো-ভলতেরের শহর প্যারিস। 

df29deaf-78ed-4fdf-a69f-f2ef683ed2e5

প্রাক্শীতে সবুজ তার রূপ হারালেও প্যারিসের শোভা কমবে না এতটুকু। এ এক অন্যরকম শহর। যা শব্দের বর্ণনায় ধরা দেয় না। ধরা দেয় চোখে। অনুভবে। ভালোবাসায়। ‘লা ভিল দামুর।’ 
অবারিত প্রেমের শহর প্যারিস। ‘ভালোবাসা আছে বলেই কি এই শহর এত স্নিগ্ধ, নির্মল?’ 
বন্ধু ক্লোয়ে স্মিত হেসে বলল, ‘প্রেমের চেয়ে নির্মল, মসৃণ কিছু কি আছে এই পৃথিবীতে?’

সত্যিই তাই। যে শহরের বুক বেয়ে চলে গেছে সেন নদী, তার স্বচ্ছ জলের উঠোন, যেখানে উঁকি দেয় জলজশৈবাল, ধীরলয়ে চলে প্রমোদতরী, সেই শহরের মানুষের মনে প্রেম থাকবে না, তা কী হয়? অথবা যেখানে রেস্তোরাঁ বা পানশালার আঙিনায় গলে যায় অবসর; পানীয়র পাত্রে ঠোঁট রেখে সন্ধ্যা নামে, ভাগাভাগি হয় যাপিতদিনের গল্প, সেই শহরের নাগরিকরা একে অন্যের আত্মীয় হবে না, হবে না সহমর্মী, তা হতে পারে?

‘এককাপ কফি ছাড়া শরীর উষ্ণ হয় কী করে বলো?’ বুলভার সাঁ মিশেলের একটি কফিবারের উঠোন দেখিয়ে বলে ক্লোয়ে। নাম ‘ক্যুভে নোয়ার।’ 

2e953b61-8b3d-4b7d-8274-11530521949a

দুকাপ কফি কথা বলে এসে তেরাসে বসল ক্লোয়ে। কাঠের বেঞ্চি আর টুল। বেশ খোলামেলা পরিবেশ। এখানে বসে কফি পান করতে করতে দেখা মেলে নানা বর্ণ, রূপের মানুষ। তাদের হাঁটার ছন্দ। একে ভিন্ন অন্য থেকে। 

এই শহরের প্রায় নিঃসঙ্গ মানুষের কমবেশি সবারই আছে আদুরে পোষা কুকুর কিংবা বিড়াল। ঢিমেতালে হেঁটে যাচ্ছেন মনিব। তার পিছু পিছু অথবা পাশাপাশি বাধ্য পোষ্য। একজন বৃদ্ধা উদয় হলেন পথের ডানপ্রান্তের বাড়িটার আড়াল থেকে। তার হাতে ধরা বেল্টর মাথায় বাঁধা ধবধবে কুকুর ছানা। বেশ দুষ্টু। ভদ্রনারী তাল হারাচ্ছেন মাঝে মাঝে। ‘দুসমঁ মা ফিইয়। ত্যু ভা উ?’ (ধীরে মেয়ে আমার। কোথায় যাচ্ছো তুমি?) বলতে বলতে হরকে যাচ্ছেন প্রায়। অথচ মেয়েটি তার যা দুষ্টু হয়েছে আজকাল!

8e325678-b01b-4091-bf08-f20afde867d5

‘কেউ নিঃসঙ্গ হলেও এই শহর তাকে একা হতে দেয় না।’ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল ক্লোয়ে, ‘পথে বেরোলে মানুষের আনাগোনা দেখে মনে হবে সবাই তোমার সাথে আছে। তুমি একা নও।’ 
একটু থেমে ফের বলল, ‘এই যেমন ধরো রেস্তোরাঁর তেরাসগুলোও প্রাণস্পন্দনে ভরপুর। এক কাপ কফি নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ তোমায় বলবে না উঠে যাও। এখানে বসে তুমি যেমন তোমার পাশের টেবিলের মানুষটির সঙ্গ অনুভব করছো,  সেই সঙ্গে, এই শরতের এই বিকেল, হিমবায়ুও সঙ্গী তোমার। প্রকৃতির ভালোবাসা শর্তহীন।’ 

শুধু প্রকৃতিই নয়, অগণন মানবিক প্রেমের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে এই শহর! সরু গলি থেকে প্রশস্ত উদ্যানের বুকে লেখা আছে সেই ইতিহাস। ফরাসি কবি ও ঔপন্যাসিক ভিক্তর উগো এবং অভিনেত্রী জুলিয়েত দ্রুয়ে। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সজিব ছিল তাদের প্রেম। সেই ১৮৩৩ সালের কথা। আজ থেকে দুশো বছর আগে হয়েছিল শুরুটা। জানা যায়, উগোকে প্রায় ২২ হাজার চিঠি লিখেছিলেন জুলিয়েত। ক্লোয়ে জানাল, প্যারিসের মেজোঁ দ্য ভিক্তর উগোতে সেই স্মৃতি রাখা আছে আজও।   

11b9e49a-179e-4215-b5d6-08c6436bd45c

‘রদ্যাঁ আর কামিই প্রেমের গল্পটিও কি কম রোমান্সকর?’ ক্লোয়ে বলল, ‘কামিই ক্লদেল ছিল রদ্যাঁর ছাত্রী। সেই থেকে প্রেম। কামিই রদ্যাঁর জীবনে শুধু প্রেমিকই নন, শিল্পসত্তার অনুপ্রেরণাও।’ 

ইতিহাস বলে, কামিইর প্রেমে পড়লেও রদ্যাঁ তার দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী রোজ বোরেরেকে ছেড়ে দেননি। বরং চরম এক সম্পর্কের টানাপোড়েনের বাঁকে পড়ে রদ্যাঁর জীবন। শেষমেশ কামিই ছেড়ে যান রদ্যাঁকে। ১৯৮২ সালের দিকে। এই সম্পর্ক বদলে ছিল তাদের দুজনের শিল্পজীবনও। 

d7ee3a02-4346-40e7-b40b-951bbc8d2601

‘এই প্যারিসের পাথুরে পথ, উদ্যানের শতবর্ষী পাইন, ওক, সিডার, চেস্টনাট গাছেরাও সাক্ষী হয়ে আছে পিকাসো ও দোরার প্রেমের।’ একটা যুগল ম্যাপল পাতার ঝঁরে যাওয়া দেখতে দেখতে বললাম। ‘বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো আর আলোচিত্রী দোরা মারের পরিচয় হয়েছিল প্যারিসে ত্রিশের দশকে। প্রবল আবেগ ও সৃজনশীলতায় পূর্ণ ছিল তাদের সম্পর্ক।’

‘মানসিক টানাপোড়েনও কি কম ছিল?’ যোগ করল ক্লোয়ে। ‘কথা যখন তুললেই সার্ত্র আর বোভোয়ারের কথা বলবে না?’ 

‘নিশ্চয়ই। দার্শনিক সেই প্রেম। প্রচলিত বিয়ের বাইরে এমন এক প্লেটোনিক প্রেমের সম্পর্ক তারা গড়েছিলেন, যেখানে প্রেম ছিল, ছিল স্বাধীনতা আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যও।’ ক্লোয়ের কথার রেশ ফুরাবার আগে বললাম, ‘সম্পর্কও যে গাঁথা যায় দর্শনের সুতোও জ্যাঁ-পল সার্ত্র ও সিমোন দ্য বোভায়ার দেখিয়েছিলেন। 

‘তাই বলে মানবিক সম্পর্কে বিদ্যমান ক্ষুদ্র মাৎসর্যের পুরোপুরি ঊর্ধ্বেও উঠতে পারেননি ওঁরা।’ ক্লোয়ের  ঠোঁটে মৃদু হাসি। ‘সম্পর্কের জটিলতা ঈর্ষা-একটু আধটু তাও তো ছিল।’  শিল্প-সাহিত্য নিয়ে ক্লোয়ের জানাশোনার গভীরতা আমায় মুগ্ধ করে। এই ফরাসি তন্বীর কাছে আমার যে সামান্য আশকারা, তাও এই সাহিত্যের সূত্রেই। সাহিত্যের প্রতি আমার অনুরাগ, সামান্য লেখালেখির চেষ্টাই ওর সঙ্গে সখ্যের মূলে। সে গল্প করা যাবে আরেকদিন।  

db6a2163-1042-4221-9ee8-72d4220558e5

এইক্ষণে স্মরণ করা যেতে পারে ফরাসি কবি গিয়োম আপোলিনেয়ার ও চিত্রশিল্পী মারি লরাঁসাঁর প্রেমের কথাও। তাদের পরিচয় হয় ১৯০৭ সালের দিকে। ইতিহাস বলে, বিশ শতকের গোড়ার দিকে তাদের এই প্রণয় সম্পর্ক বেশ আলোচিত ছিল শিল্পজগতে। ১৯১২ সাল অবধি সেই প্রেমের সঙ্গে যুগপৎ চলেছে শিল্প, কবিতা ও আধুনিকতার অনুসন্ধানও। 

দার্শনিক ও শিক্ষক পিয়ের অ্যাবেলার ও তার ছাত্রী হেলোইজের  প্রেম কাহিনিও কি কম চর্চা হয়েছে প্যারিসে? গোপন অভিসার, পারিবারিক প্রতিশোধ, বিরহ। নানা বৈচিত্রে সাজানো সেই প্রেমের প্রমাণ তাদের প্রেমপত্রে। ইউরোপী ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে এই প্রেমের অমর গাঁথা। দুজনেই শুয়ে আছেন প্যারিসের পের-লাসেইজের কোলাহলহীন সমাধি অঙ্গনে। 

কথা যখন উঠেছেই তখন ফরাসি উপন্যাসিক জর্জ স্যান্ড আর পোলিশ সুরকার ফ্রেদেরিক শোপাঁকে কথাও বলতে হয়। ১৮৩০ এর দিকে শুরু হওয়া ভালোবাসার বন্ধন দীর্ঘ হয়েছিল প্রায় এক দশক। প্যারিসের তৎকালিন সাহিত্য ও সংগীত জগতে আলোচিত সেই প্রেম ভেঙেছিল শিল্প ও জীবনের পারস্পরিক সংঘাতে। 

সাহিত্য জগতের আরও একটি প্রেমের কথাও স্মরণ করা যায় ইতিহাসের পাতা উল্টে। সময়টা ছিল বিশ শতকের গোড়ার দিকে। মার্কিন লেখক গারট্রুড স্টাইন ও অ্যালিস টোকলাস একসঙ্গে জীবন শুরু করেছিলেন এই প্যারিসে। এই দুই নারীর সম্পর্ক ছিল অনেকটা জীবনসঙ্গীর মতো। তবে মূলে প্রোথিত ছিল সৃজনশীলতার বীজমন্ত্র। তাদের বাড়িটি মুখর হয়ে থাকত তৎকালীন শিল্প ও সাহিত্যের নানা আড্ডায়। পিকাসো, হেমিংওয়ের মতো বিখ্যাত শিল্পী-লেখকদের নিয়মিত যাতায়াতও নাকি ওই বাড়িতে। 

dfb5d441-c326-4604-b831-6bd2c299493b

কফির কাপ দুটো খালি হয়েছে বেশ আগে। সন্ধ্যা উন্মুক্ত করেছে তার সুঢৌল বাহু। কদিন আগেও ঘড়ির কাটার দশটাকে রাত বলা যেত না। দিনের আলো থাকত তখনও। এখন সন্ধ্যা নামে ঘড়ির কাটা সাতটা ছুঁতে গেলেই। উঠতে হবে আমাদের। সময়টা যেন থমকে গেছে এই সন্ধ্যায়। নড়ছেনা এক পা-ও। ঠিক যেন বিখ্যাত ফরাসি কবি জাক প্রেভেরের ভাষায়, ‘নগরের ওপর দিয়ে সময় বয়ে যাচ্ছে—হঠাৎ যেন সময় থেমে যায়—এক/ চিত্রকরের ঘরে কয়েক মাসের জন্য থেমে থাকে।/ হ্যাঁ, বেশ কিছুক্ষণের জন্য সময় থেমে যায়—চিত্রকরের সঙ্গী হয়ে থাকে।’ (অনুবাদ সুদেষ্ণা চক্রবর্তী।) 

লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক