Dhaka Mail Logo

শিল্প ও সাহিত্য

জলজ: জীবন, সৃষ্টি ও মহাজাগতিক শক্তির অনুপম আবাহন

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

অনন্ত মহাবিশ্বের শতকোটি গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝে পৃথিবীই একমাত্র প্রাণোচ্ছল নীলাভ নীড়। আর এই মহাজাগতিক নীড়ে প্রাণের অস্তিত্ব, স্ফুরণ ও বিকাশের প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হলো জল। আধুনিক বিজ্ঞান যেমন পৃথিবীতে জীবনের আদি সূচনাকে জলের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনি হাজার বছর আগে বৈদিক ঋষিরাও জলকেই সৃষ্টির মূল তত্ত্ব হিসেবে উপলব্ধি করেছিলেন। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির আদি রূপ বর্ণনায় বলা হয়েছে, সৃষ্টির পূর্বে সর্বত্রই ছিল অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক অসীম জলরাশি। সনাতন দর্শনে পঞ্চমহাভূতের অন্যতম ‘অপ’ বা জল এমন এক মৌলিক উপাদান, যা প্রকৃতির প্রতিটি কণায় সঞ্চার করে জীবনের স্পন্দন।

নদী, বৃষ্টি ও সমুদ্রের সঙ্গে গড়ে ওঠা আমাদের রূপসী বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত জলের এই সনাতন ও চিরন্তন অস্তিত্বকেই এবারের দুর্গাপূজার ভাবনায় ধারণ করেছে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন। বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কে আয়োজিত শারদোৎসবে তাদের বেছে নেওয়া অনন্য ও কালজয়ী থিম ‘জলজ’—জল থেকে যার জন্ম।

জীবনের পরম সংস্কার ও মাতৃশক্তির প্রকাশ

সনাতন ধর্মে জল কেবল কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক উপাদান নয়; জল স্বয়ং পবিত্রতা, পরমেশ্বর ও জীবনসংস্কারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। মাতৃগর্ভের তরল পরিবেশ থেকে শুরু করে গঙ্গাতীরে জীবনের শেষ অঞ্জলি—মানুষের সমগ্র জীবনচক্র যেন জলেরই এক অবিরাম প্রবাহে বাঁধা। ঘটস্থাপন, তর্পণ, মাঙ্গলিক সূচনা কিংবা আত্মশুদ্ধি—প্রতিটি আচারেই জল প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী দুর্গা কেবল অসুরসংহারী শক্তিরূপা নন, তিনি জীবের জীবনধারণের মূল আকুতিরও প্রতীক। চণ্ডীর ভাষায়, দেবী ‘তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা’। জলের অতল বুক চিরে যেমন প্রস্ফুটিত হয় সৌন্দর্য ও পবিত্রতার প্রতীক পদ্ম, তেমনি জীবচেতনার গভীর তৃষ্ণা থেকেই প্রকাশিত হন মহামায়া, আদ্যাশক্তি মা দুর্গা।

স্থাপত্য ও নান্দনিকতায় জলজ রূপকল্প

এই ভাবাদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কের মণ্ডপসজ্জায় ঘটানো হয়েছে স্থাপত্য, প্রকৌশল, ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প ও আধুনিক আলোকনকশার এক অপূর্ব সমন্বয়। স্থপতি অমিতি কুন্ডু এবং শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহার যৌথ পরিকল্পনা, নকশা ও নিপুণ তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছে এক বিশাল জলজ জৈব রূপকল্প (Organic Form)।

বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চটের বুননে তৈরি করা হয়েছে ঢেউখেলানো বহুস্তরীয় দৃশ্যপট। মণ্ডপে পা রাখতেই মনে হবে, এক স্থির অথচ বিশাল উর্মিমালা চারপাশ থেকে দর্শনার্থীদের ঘিরে রেখেছে।

প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত যাত্রাটি দর্শকের সামনে উন্মোচন করে এক আধ্যাত্মিক অনুভূতি। প্রকৃতির উত্তাল ও চঞ্চল তরঙ্গ পেরিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে মায়ের চরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুভব জাগিয়ে তোলে এই যাত্রা।

কৃত্রিম জলপ্রপাত, প্রতিফলন-পুকুর (রিফ্লেকশন পুল) ও আলোর সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি হয়েছে এক রূপান্তরশীল পরিবেশ।

প্যান্ডেলের ঠিক কেন্দ্রে স্থান পেয়েছে পদ্মের আদলে নির্মিত একটি বিশাল স্থাপত্য। জলের গভীর থেকে বিকশিত পদ্মের মতো শঙ্খপটে সেখানে পরম মহিমায় উদ্ভাসিত হবেন মা দুর্গা।

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পরিবেশরক্ষার মহাসন্দেশ

‘জলজ’ কেবল একটি ধর্মীয় কিংবা নান্দনিক ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি স্পর্শ করেছে বৈশ্বিক পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গভীর বিষয়কেও। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও দূষণের কারণে গোটা পৃথিবীর জলচক্র আজ মারাত্মক সংকটের মুখে। বিশেষ করে নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এই সংকট সরাসরি অস্তিত্বের প্রশ্ন।

তাই জলকে সম্মান করা এবং রক্ষা করা মানেই আমাদের ইতিহাস, জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করা। এই অর্থে ‘জলজ’ হলো প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার, প্রকৃতিকে ভালোবাসার এবং সমগ্র জীবমণ্ডলকে রক্ষা করার এক সানন্দ আহ্বান।

গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে শারদোৎসবের এই অভিনব, দৃষ্টিনন্দন ও ভাবগম্ভীর মণ্ডপটি ধর্ম-বর্ণ ও মতপথনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত।

বিইউ/এআর