Dhaka Mail Logo

শিল্প ও সাহিত্য

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য-গানে মৃত্যু-ভাবনা: মুক্তির বহুমাত্রিক রূপ

২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৮ এএম

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট কবিদের অন্যতম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনিই একক ও অনন্য। বিশেষ করে দ্রোহ-প্রেম ও সাম্য ন্যায়ের বিষয়ে তার লেখা অনিন্দ্য। অদ্বিতীয়। ক্ষেত্রবিশেষে তা সমালোচনারও ঊর্ধ্বে। তিনি প্রকৃতই এমন এক অনন্য কবি, যার সৃষ্টির প্রধান সুর জীবন, জাগরণ, প্রেম, সাম্য, বিদ্রোহ ও মানবমুক্তি। তাকে আমরা প্রধানত ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবেই চিনি; কিন্তু তার সাহিত্য জগতের পরিসর বিদ্রোহের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। প্রেমের কোমলতা, বিরহের বেদনা, ইসলামী আধ্যাত্মিকতা, শাক্ত সাধনার তেজ, সাম্য, মানবতাবাদ, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং জীবনের অবিনশ্বরতা, সবকিছু মিলেই নজরুলের সৃষ্টিসত্বা গঠিত। সেই বহুমাত্রিক সৃষ্টিসত্বার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মৃত্যু-ভাবনা বা মৃত্যু চিন্তা। আরও সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় যে, অনিবার্য মৃত্যুর অবিনশ্বরতা। কবি নজরুলের কবিতা ও গানে মৃত্যু কখনো নিছক জীবনের অবসান নয়। বরং তা প্রিয়জনের কাছ থেকে চিরবিচ্ছেদ, কখনো দুঃখ ও যন্ত্রণার অবসান, কখনো স্রষ্টার সান্নিধ্যে প্রত্যাবর্তন, কখনো আত্মত্যাগের মহিমা, কখনো মানবতার কাছে পরাজিত এক মহান শক্তি। আবার কখনো শিল্পীর অমরত্বের শাশ্বতদ্বার। ফলে তার মৃত্যুচেতনা একরৈখিক নয় বরং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রেম-বিরহ, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে তা ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়েছে। সমকালীন আলোচনাতেও নজরুলের কাব্য-গানে মৃত্যুকে মুক্তি, আত্মত্যাগ, আধ্যাত্মিক মিলন ও ব্যক্তিগত বেদনার বহুমাত্রিক প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে নজরুলের মৃত্যুচিন্তা বুঝতে হলে তার জীবনদর্শনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য মনে রাখতে হয়, সেটি হলো, তিনি মৃত্যুকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণও করেননি। বরং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি জীবনের জয়গান গেয়েছেন। মানব মর্যাদা, প্রেমের শক্তি, বিশ্বাসের দৃঢ়তা এবং আত্মত্যাগের মহিমাকে দার্শনিক সত্যের উপলদ্ধিগত দিক বিবেচনায় আবিষ্কার করেছেন। তাই তার কাছে মৃত্যু যেমন করুণ, তেমনি মহিমান্বিত। যেমন বিচ্ছেদের প্রতীক, তেমনি মুক্তিরও মূলমন্ত্র। 

১. নজরুলের জীবন-দর্শনে মৃত্যু

মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে অনিবার্য সত্য হলো মৃত্যু। জন্মের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং-এর মৃত্যু-ভাবনার সঙ্গে তার ‘God is in His Heaven- / All’s right with the world!’-জাতীয় আশাবাদী জীবন-দর্শনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তার বিশ্বাস, মানুষের জ্ঞান সীমিত হলেও ঈশ্বরের পরিকল্পনা অসীম। তাই মৃত্যু সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা আতঙ্কের কারণ নয়; বরং ঈশ্বরের প্রতি আস্থাই সেখানে প্রধান। এখানে ব্রাউনিং পরকাল-বিশ্বাসের জ্যোতি ছড়িয়েছেন স্রষ্টার মাহাত্ম্য বর্ণনার মধ্য দিয়ে। তবে এভাবে পরকালীন বিশ্বাসরূপে অনেকেই মৃত্যুকে দেখেন, আবার অনেকেই দেখেন না। কেউ মৃত্যুকে অন্ধকার, কেউ শূন্যতা, কেউ অনন্ত নিদ্রা, কেউ মুক্তি হিসেবে কল্পনা করেন। নজরুলের অবস্থান এক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তার বিদ্রোহী সত্বা মৃত্যুকে ভয় পায় না। তার প্রেমিক সত্বা প্রিয়জনের বিচ্ছেদে মৃত্যুকে অনুভব করে। গভীর বেদনা হিসেবে তার মরমি সত্বা মৃত্যুর মধ্যে খুঁজে পায়, স্রষ্টার কাছে প্রত্যাবর্তনের নির্ভেজাল সম্ভাবনা।

তবে তিনটি প্রবণতা যথা: বিদ্রোহ, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা; নজরুলের মৃত্যুচেতনার প্রধান ভিত্তি। তার কবিতায় জীবনকে যে বিপুল শক্তির উৎস হিসেবে দেখা হয়েছে, মৃত্যু সেখানে সেই শক্তির বিপরীত হলেও সাংঘর্ষিক নয়। বরং নজরুলীয় দর্শন হলো- মৃত্যুকে অতিক্রম করার মধ্যেই মানুষের মহত্ব। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিস্ময়কর শক্তিময় কল্পলোকের মধ্যে সৃষ্টি ও সংহার পাশাপাশি অবস্থান করে। সেখানে ধ্বংস কোনো নিষ্ক্রিয় বিনাশ নয়; ধ্বংস নতুন সৃষ্টির সক্রিয় পথ প্রস্তুত করে। এই দৃষ্টিতে মৃত্যুও শেষ নয়, এটি পরকালীন অবিনশ্বর জীবনের রূপান্তর। নজরুলের এই জীবন-দর্শনের সঙ্গে তার বিপ্লবী মানসিকতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে যিনি কলম ধরেছেন, তার কাছে মৃত্যুভয়, মানুষকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই তার কাব্যে মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার সাহস বারবার ফিরে আসে। অর্থাৎ, অমরত্বের নবরূপ প্রতিফলিত হয়।

২. ‘বিদ্রোহী’ সত্বা ও মৃত্যুকে জয় করার প্রত্যয়
নজরুলের মৃত্যুচেতনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মৃত্যুভয়কে অতিক্রম করার দুর্দম-দুঃসাহস। তিনি এমন এক মানুষের কল্পনা করেন, যে অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না এবং মৃত্যুকেও ভয় করে না। তার বহু রচনা ও গানে মৃত্যু মানুষের সাহসের কাছে পরাজিত এমন ধারনার উদ্ভাস লক্ষ্য করা যায়। ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান’ গানটিতে এমন এক বীরত্বের চিত্র পাওয়া যায়, যেখানে মৃত্যুও একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষের সাহসের কাছে সম্মান জানায়। গানটির বহুল পরিচিত পঙক্তি  ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান/ কোথা সে আরিফ, অভেদ যাহার জীবন-মৃত্যু জ্ঞান।/ যার মুখে শুনি তওহিদের কালাম/ ভয়ে মৃত্যু ও করিত সালাম।’ এছাড়াও সব্যসাচী কবিতায় কবি নজরুল লিখেছেন- ‘বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী/ যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার মরে বাঁচি।’ এভাবে কবি মৃত্যুকে মানব-সাহসের সামনে পরাজিত শক্তি হিসেবে কল্পনা করে। এখানে মৃত্যু কোনো সর্বশক্তিমান নিয়ন্তা নয়। মানুষের ঈমান, আদর্শ ও সাহস তাকে অতিক্রম করতে পারে। এই ধারণা নজরুলের বিদ্রোহী দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গেলে মৃত্যু আসতেই পারে; কিন্তু আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করলে সেই মৃত্যু পরাজয় নয়, বরং বিজয়। এই ভাবনাই পরবর্তী সময়ে তার দেশাত্মবোধক ও বিপ্লবী গানে আরও শক্তিশালী হয়েছে। স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া ব্যক্তির মৃত্যু ব্যক্তিগত জীবনের সমাপ্তি হলেও জাতীয় জীবনে তা নতুন প্রেরণার জন্ম দেয়। অর্থাৎ, শরীরের মৃত্যু আদর্শের মৃত্যু নয়। দেহ নশ্বর। কিন্তু সত্যাদর্শ অবিনশ্বর।

৩. প্রেম ও বিরহে মৃত্যুর রূপ
নজরুল মূলত প্রেমেরও কবি। তার প্রেমের কবিতা ও গানগুলোর একটি বড় অংশে মৃত্যু সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিচ্ছেদ, অনুপস্থিতি ও হারিয়ে যাওয়ার প্রতীক। প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক যখন চিরবিচ্ছেদের দিকে এগিয়ে যায় তখন মৃত্যুর অনুভূতি প্রেমের বেদনাকে আরও গভীর করে। ‘বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই’ গানটিতে বিদায়ের আবহ, অন্ধকার ও বিচ্ছেদের অনুভূতি এক ধরনের মৃত্যুচেতনা সৃষ্টি করে। এখানে মৃত্যু সরাসরি উচ্চারিত না হলেও ‘বিদায়’ ও অন্ধকারের প্রতীকী ব্যবহারে জীবনের আলো নিভে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। নজরুলের বিরহের গানগুলোতে এই কৌশল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাম্প্রতিক সাহিত্য-আলোচনাতেও গানটিকে বিরহ ও বিচ্ছেদের গভীর করুণ আবহের উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আবার ‘লাইলী-মজনু’র প্রেমকাহিনিকে আশ্রয় করে নজরুল মৃত্যুকে প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। মজনুর বিচ্ছেদ, আকুলতা এবং প্রিয়তমার প্রত্যাবর্তনের কল্পনা আসলে জীবিত ও মৃতের সীমারেখাকে স্পষ্ট করে। প্রেম এখানে শারীরিক অস্তিত্বের সীমা অতিক্রম করে। ফলে মৃত্যু প্রেমকে শেষ করতে পারে না; বরং প্রেমকে আরও চিরন্তন করে।
নজরুলের প্রেমের গান তাই কেবল রোমান্টিক আবেগের গান নয়। এগুলোতে প্রেমের সঙ্গে অনিত্যতা এবং বিচ্ছেদের গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রিয় মানুষকে হারানোর আশঙ্কা প্রেমকে যেমন তীব্র করে, তেমনি মৃত্যুর অনিবার্যতা প্রেমের মূল্যও বাড়িয়ে দেয়। ‘এছাড়াও খেলা শেষ হলো শেষ হয় নাই বেলা, আমি দাঁড়ায়ে রহিনু এ পারে তুমি ওপারে ভাসালে ভেলা’ ‘কেন এলে এলে অবেলায়’ ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’ ‘আমি যেদিন রইব না গো লইব চির-বিদায়।../ এই ধরণীর খেলা-ঘরে, মনে রাখে কে কারে’ এ রকম বহুসংখ্যক গানে কবির মৃত্যু চিন্তার প্রবিধরূপ পরিলক্ষিত হয়; যা বহুমাত্রিক ও ব্যঞ্জনাধর্মী। এ ছাড়াও ইসলামী গানে মৃত্যু: পরকাল, বিচার ও মুক্তি, কারবালা ও শহীদের মৃত্যু, মরমিবাদ ও স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা, মৃত্যু ও আত্মত্যাগ, মৃত্যু ও অমরত্বের বিষয়টি সুন্দররূপে ফুটে উঠেছে।

৩.১. ‘আমার যাবার সময় হলো’: মৃত্যুকে বিদায় হিসেবে দেখা

নজরুলের গান ‘আমার যাবার সময় হলো, দাও বিদায়’ মৃত্যুচেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গানটির কেন্দ্রে রয়েছে ‘যাওয়া’ ও ‘বিদায়’-এর অনুভূতি। এখানে ‘যাওয়া’ শব্দটি স্বাভাবিক ‘যাওয়া-আসা’ নয়। বরং ‘যাওয়া’ চিরবিদায়ের বিষয়টি তুলে আনে। রবীন্দ্রনাথের ‘দুয়ারে দাঁড়ায়ে গাড়ি। যেতে হবে তাড়াতাড়ি।’ এই ‘যেতে হবে’ শব্দদ্বয়ের মাঝেও চিরবিদায়ের করুণ সুর রয়েছে। কারণ, এই মৃত্যুকে হঠাৎ কোনো ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে দেখানো হয়নি। প্রকারান্তরে,  জীবনের নির্দিষ্ট সময় শেষে মানুষের চলে যাওয়ার স্বাভাবিক নিয়তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘আমার যাবার সময় হলো’ এই উপলব্ধির মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর অনিবার্যতা। আর ‘দাও বিদায়’ এই আবেদন মৃত্যুকে সামাজিক ও মানবিক সম্পর্কের পরিসরে নিয়ে আসে। মৃত্যু একা মানুষের ঘটনা নয়; একজন মানুষের চলে যাওয়া তার প্রিয়জনদের জীবনেও গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে। এই গানটির তাৎপর্য হলো, এখানে মৃত্যুর সঙ্গে কান্না যেমন আছে, তেমনি আছে গ্রহণ করার মানসিকতাও। মানুষ জানে যে, যেতে হবে। তাই বিদায়ের মুহূর্তে অশ্রু মুছে দরজা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। এই গ্রহণক্ষমতা নজরুলের মৃত্যুচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বলা যায়, মৃত্যুকে নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকের বেদনা বোধের পরিচায়ক। ‘আমার যাবার সময় হলো’গানটিতে চিরবিদায় ও মৃত্যুর ভাবনা এক গভীর বিষাদময় অথচ নান্দনিক রূপে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে মৃত্যু কেবল জীবনের সমাপ্তি নয়; এটি পরিচিত পৃথিবী, প্রিয়জন ও ভালোবাসার কাছ থেকে এক অনিবার্য বিচ্ছেদ। ‘আমার যাবার সময় হলো, দাও বিদায়’ এই পুনরুক্তির মধ্যে মৃত্যুর অনিবার্যতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে প্রিয়জনের কাছে শেষ আশীর্বাদ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। ‘ফোটে যে ফুল আঁধার রাতে / ঝরে ধূলায় ভোর বেলাত’ এই চিত্রকল্প জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে অত্যন্ত নান্দনিকভাবে প্রকাশ করে। আঁধারে প্রস্ফুটিত ফুলের, ভোরে ঝরে পড়া যেন জন্ম, জীবন ও মৃত্যুর স্বাভাবিক চক্রেরই প্রতিধ্বিনি। কবির কাছে মৃত্যুর ডাকও তাই ভয়াবহ নয়; ‘আমায় তারা ডাকে সাথে’ এই উচ্চারণে মৃত্যুকে প্রকৃতির আপন আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করার প্রশান্তি আছে। অন্যদিকে, ‘ক্ষণিক ভালোবেসেছিলেম চিরকালের না-ই হ’লে’ পঙ্‌ক্তিটি মানব জীবনের প্রেম ও বিচ্ছেদের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী হলেও তার স্মৃতি চিরস্থায়ী। ‘নয়ন-জলে রইলো লেখা’ সেই স্মৃতিরই মর্মস্পর্শী প্রতীক। শেষে ‘দূর বিরহের ডাকে কেকা বরষায়’ এবং ‘ফাগুন স্বপন ভোলো ভোলো’ প্রকৃতি, বিরহ ও মৃত্যুকে একাকার করেছে। ফলে গানটির মৃত্যু-ভাবনা একই সঙ্গে বিষাদময়, প্রেমময়, প্রকৃতিনির্ভর এবং আধ্যাত্মিক। চিরবিদায় এখানে ধ্বংস নয়; বরং জীবনের ক্ষণিক স্বপ্ন থেকে এক অজানা অনন্তের দিকে নীরব যাত্রা।

৩.২. ব্যক্তিগত শোক ও সন্তান বুলবুলের মৃত্যু

নজরুলের মৃত্যুচেতনার সবচেয়ে বেদনাময় দিক তার ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জীবনের নানা পর্যায়ে তিনি প্রিয়জন হারিয়েছেন। বিশেষ করে তার সন্তান বুলবুলের অকালমৃত্যু কবির মনে গভীর আঘাত সৃষ্টি করে। এই ব্যক্তিগত শোক তার পরবর্তী সৃষ্টিতে মৃত্যু, বিচ্ছেদ ও নশ্বরতার অনুভূতিকে আরও তীব্র করেছে। নজরুলের জীবন ও মৃত্যুচেতনা নিয়ে আলোচনায় সন্তানহারা পিতার এই অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন পিতার কাছে সন্তানের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যুচিন্তার চেয়ে অনেক বেশি নির্মম ও হৃদয়বিদারক। নজরুলের মতো প্রাণময় ও জীবনমুখী কবির কাছেও এই মৃত্যু গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। তবে এখানেও তার সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তিনি ব্যক্তিগত শোককে কেবল ব্যক্তিগত বিলাপে সীমাবদ্ধ রাখেননি। নিজের দুঃখকে তিনি সার্বজনীন মানবিক বেদনার ভাষায় রূপ দিয়েছেন। ফলে তার শোকগীতি পাঠ করলে শুধু নজরুলের ব্যক্তিগত কষ্ট নয়, পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানহারা পিতা-মাতার কান্না যেন সেখানে প্রতিধ্বনিত হয়। এই রূপান্তরই শিল্পীর শক্তি।
প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পর পরই তথা ১৯৩০ সালের মে মাসের দিকে কবি নজরুল অত্যন্ত শোকাতুর হৃদয় নিয়ে ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি’ গানটি রচনা করেন। নজরুলের মৃত্যু-ভাবনার একটি অপূর্ব কাব্যিক রূপ পাওয়া যায় এই গানে। ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি।’ এই বাক্য দিয়ে তিনি সন্তানের মৃত্যুর বর্ণনা তুলে ধরেছেন। এখানে ‘মৃত্যু’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার না করে ‘ঘুমিয়ে যাওয়া’র রূপক ব্যবহৃত হয়েছে। মৃত্যু যেন দীর্ঘ ক্লান্তির পর বিশ্রাম। এই রূপক মৃত্যুর ভয়াবহতাকে কোমল করে তোলে। এরপর ‘সাঝের ঝরা ফুল’-এর চিত্রের সঙ্গে মৃত বা নিস্তব্ধ বুলবুলির সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। সন্ধ্যা, ঝরা ফুল ও নিদ্রিত পাখি; এই তিনটি প্রতীক মিলে মৃত্যুর সকরুণ অথচ সৌন্দর্যময় আবহ তৈরি করে। প্রকৃতি যেন মানুষের শোকের সহচর হয়ে উঠেছে, এখানে। এই গানটিকে নজরুলের মৃত্যুচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এখানে লক্ষণীয়, নজরুল মৃত্যু দেখাতে রক্ত, অন্ধকার বা আতঙ্কের চিত্রই শুধু ব্যবহার করেননি, সাথে সাথে তিনি ঘুম, সন্ধ্যা, ঝরা ফুল, পাখি-প্রকৃতির এইসব কোমল প্রতীক ব্যবহার করেছেন। ফলে মৃত্যু হয়ে উঠেছে নান্দনিক ও চরম বিষণ্ণ।
ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হ'য়ে আমার গানের বুলবুলি/ করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি।।
ফুল ফুটিয়ে ভোর বেলাতে গান গেয়ে/ নীরব হ'ল কোন নিষাদের বাণ খেয়ে;
বনের কোলে বিলাপ করে সন্ধ্যা-রানী চুল খুলি'।।/ কাল হ'তে আর ফুটবে না হায় লতার বুকে মঞ্জুরি,
উঠছে পাতায় পাতায় কাহার করুণ নিশাস্ মর্মরি'।/ গানের পাখি গেছে উড়ে, শূন্য নীড় 
কণ্ঠে আমার নাই যে আগের কথার ভীড়/ আলেয়ার এ আলোতে আসবে না কেউ কূল ভুলি'।।
এই গানটির প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে কবির হৃদয়ের গভীর বেদনা এবং প্রিয়জনের মৃত্যুশোক অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি’, এই কথার মধ্য দিয়ে কবি তার প্রিয় সত্বার মৃত্যুকে ঘুমের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ‘বুলবুলি’ যেন কবির আনন্দ, গান ও প্রাণের প্রতীক; তার মৃত্যুতে কবির জীবন নিস্তব্ধ ও শূন্য হয়ে গেছে। সাঁঝের ঝরা ফুলের করুণ দৃষ্টি, বনের কোলে সন্ধ্যা-রানীর চুল খুলে বিলাপ করা; এসব প্রকৃতিচিত্রের মধ্যেও মৃত্যুর শোক প্রতিফলিত হয়েছে। ‘ফুল ফুটিয়ে ভোর বেলাতে গান গেয়ে / নীরব হ’ল কোন নিষাদের বাণ খেয়ে’ এই পঙ্‌ক্তিতে মৃত্যুর কারণকে শিকারির তীরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যে পাখি এক সময় গান গেয়ে চারপাশকে প্রাণবন্ত করে তুলতো, সেই পাখিই হঠাৎ মৃত্যুর আঘাতে চিরনীরব হয়েছে। তার মৃত্যুতে প্রকৃতিও যেন শোকাহত। ‘কাল হতে আর ফুটবে না হায় / লতার বুকে মঞ্জুরি’ এই আক্ষেপে প্রিয়জনকে হারানোর চিরস্থায়ী শূন্যতা প্রকাশিত হয়েছে। তাই কবির নিজের কণ্ঠেও আর আগের কথার ভিড় নেই; অর্থাৎ প্রিয়জনের মৃত্যু তার সৃষ্টিশক্তি ও আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। ‘গানের পাখি গেছে উড়ে, শূন্য নীড়’ চিত্রকল্পটি মৃত্যুর নিঃসঙ্গতাকে অত্যন্ত গভীর করে তুলেছে। ফলে গানটি শুধু মৃত্যুর বর্ণনা নয়, বরং প্রিয়জনকে হারিয়ে কবির অন্তরের নিঃসঙ্গতা, নিদারুণ অসহায় অবস্থা ও অসীম শোকের এক করুণ প্রকাশ।
যদিও বুলবুলের মৃত্যুর প্রায় চার বছর পর কবি নজরুল লেখেন,‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয় ফিরে আয়’; তবুও এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এই গান রচনার মধ্য দিয়ে, কবি ব্যক্তিগত মৃত্যুকে সার্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছেন।
‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয় ফিরে আয়!/ তোরে না হেরিয়া সকালের ফুল অকালে ঝরিয়া যায়।।
তুই নাই ব’লে ওরে উন্মাদ/ পান্ডুর হ’ল আকাশের চাঁদ,/ কেঁদে নদী জল করুণ বিষাদ ডাকে: ‘আয় ফিরে আয়’।।
গগনে মেলিয়া শত শত কর/ খোঁজে তোরে তরু, ওরে সুন্দর!/ তোর তরে বনে উঠিয়াছে ঝড় লুটায় লতা ধূলায়!
তুই ফিরে এলে, ওরে চঞ্চল/ আবার ফুটিবে বন ফুলদল/ ধূসর আকাশ হইবে সুনীল তোর চোখের চাওয়ায়।।’
এই গানের মধ্যে একটি সন্তানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মর্মস্পর্শী শোক ও পুত্রবাৎসল্যের প্রকাশ ঘটেছে। ‘শূন্য এ-বুকে পাখি মোর’ এই উক্তির মাধ্যমে শোকাতুর পিতা তার হারানো সন্তানকে পাখির সঙ্গে তুলনা করে ফিরে আসার আকুল নিবেদন করেছেন। সন্তানের অনুপস্থিতিতে তার হৃদয় শূন্য হয়ে গেছে। শুধু পিতাই নন, যেন সমগ্র প্রকৃতিও সেই মৃত্যুর বেদনায় কাতর। সাংঘাতিক ব্যথাতুর। সকালের ফুল অকালে ঝরে পড়ে, আকাশের চাঁদ পান্ডুর হয়ে যায়, নদীর জল করুণ বিষাদে কেঁদে ওঠে। তরুগুলো শত শত শাখা-হাত মেলে প্রিয় পাখিটিকে খুঁজতে থাকে এবং তার জন্য বনে ঝড় ওঠে; লতাগুলো ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। প্রকৃতির এই বিষণ্ন রূপ সন্তানের মৃত্যুকে আরও করুণ ও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। এখানে পিতার গভীর পুত্রবাৎসল্যও অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। সন্তানের অনুপস্থিতিতে তার জীবন ও চারপাশের পৃথিবী বিবর্ণ হয়ে গেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সন্তান ফিরে এলে আবার বন ফুলে ভরে উঠবে, ধূসর আকাশ সুনীল হবে। অর্থাৎ, সন্তানের উপস্থিতিই তার জীবনের আনন্দ, সৌন্দর্য ও আশা-প্রত্যাশার উৎস। সন্তানের প্রতি পিতার এই গভীর মমতা, বিচ্ছেদের অসহ্য যন্ত্রণা এবং তাকে ফিরে পাওয়ার আকুল আকাঙ্ক্ষাই গানটির মূল আবেগ। মৃত্যুর বেদনা ও পিতৃস্নেহ মিলেমিশে গানটিকে মারাত্মক গভীর করুণ আবহে পূর্ণ করেছে।

৩.৩. ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব’: মৃত্যুর পর অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা
নজরুলের মৃত্যুচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৃষ্টির মাধ্যমে অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা। ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব’ গানটিতে কবি শারীরিকভাবে দূরে চলে যাওয়ার কথা বললেও প্রিয়জনদের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে চান না। গানটির মূল বক্তব্য হলো, মানুষ চলে যায়। স্মৃতি রয়ে যায়। সৃষ্টি কর্ম  মানুষের মনে থেকে যায়। আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের সুবিখ্যাত উক্তি “Men may come and men may go but I go on forever” চরণটি মানব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও চিরন্তন সত্বার দার্শনিক ইঙ্গিত বহন করে। এখানে men দ্বারা মানুষ ও ব্যক্তি জীবনের অস্থায়িত্ব বোঝানো হয়েছে, যারা আসে ও চলে যায়। কিন্তু I go on forever অংশে প্রকৃতি, সময়, জীবনপ্রবাহ বা বিশ্বচেতনার অবিনশ্বর ধারাকে নির্দেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যক্তি নশ্বর হলেও সামগ্রিক অস্তিত্ব চিরন্তন। এটি আমাদের শেখায় যে ব্যক্তিগত মৃত্যু থাকলেও জীবনধারা ও সৃষ্টির প্রবাহ অব্যাহত থাকে। ফলে মানব জীবন ক্ষণিক, কিন্তু মহাজাগতিক সত্বা অনন্ত। এই দ্বৈত সত্বা ও সত্যই এই চরণের অনন্য দার্শনিক বার্তা। আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের এই দুই চরণের সত্যনিষ্ট দর্শনের সাথে কাজী নজরুলের ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো’ গানের মূলভাবার্থগত মিল বিদ্যমান। এখানে মৃত্যু ও শিল্পের সম্পর্ক অত্যন্ত  জীবনঘনিষ্টরূপ লাভ করেছে। কবি জানেন, দেহ নশ্বর; কিন্তু সৃষ্টিশীলতা নশ্বর নয়। শিল্পী চলে গেলেও তার গান অন্যের কণ্ঠে, অন্যের হৃদয়ে এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে পারে। এই ধারণার সঙ্গে ‘আমায় নহে গো ভালোবাসো, শুধু ভালোবাসো মোর গান/ বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান’; গানটির ভাবও যুক্ত করা যায়। সেখানে কবি ব্যক্তিমানুষের চেয়ে নিজের সৃষ্টিকে ভালোবাসার আহ্বান জানান। গানটির বিখ্যাত পঙক্তি শুধু ‘ভালোবাসো মোর গান’ শিল্পীর মৃত্যুর পর শিল্পের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতা এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমায় নহে গো ভালোবাসো’ গান-দুটি রচনার ভাষা, আবেগ ও প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন হলেও অন্তর্নিহিত দর্শনে এক গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় রচনাতেই মানব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, আত্মসমর্পণ, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিসত্বার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘সোনার তরী’-তে কবি তার সঞ্চিত ধান সোনার তরীতে তুলে দিতে চান, কিন্তু নিজে সেই তরীতে স্থান পান না। এখানে ধান হয়ে ওঠে মানুষের সৃষ্টিকর্ম ও জীবনসঞ্চয়ের প্রতীক, আর তরী প্রতীক হয়ে ওঠে অনন্তের যাত্রার। মানুষ তার কর্ম রেখে যায়, কিন্তু নিজে চিরকাল তার সঙ্গে থাকতে পারে না। অন্যদিকে, নজরুলের ‘আমায় নহে গো ভালোবাসো’ গানে ব্যক্তিগত ভালোবাসার চেয়ে বৃহত্তর এক চিরন্তন প্রেমের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। ভালোবাসা এখানে কেবল ব্যক্তি মানুষের প্রতি আকর্ষণ নয়; বরং আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে বৃহত্তর সত্বার সঙ্গে মিলনের বাসনা। দুই রচনাতেই তাই ব্যক্তি মানুষের ‘আমি’ সীমাবদ্ধ ও ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু প্রেম, সৃষ্টি ও অনন্তের আহ্বান তার ঊর্ধ্বে। রবীন্দ্রনাথ যেখানে সৃষ্টি বিসর্জনের মধ্য দিয়ে অনন্তে উত্তরণের কথা বলেছেন, নজরুল সেখানে প্রেম ও আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চিরন্তনের সন্ধান করেছেন। ফলে উভয়ের দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে, মানুষ ক্ষণিক, কিন্তু তার প্রেম ও সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা অনন্ত। রবীন্দ্রনাথ যেমন দেখিয়েছেন, তার সৃষ্টিকর্ম সকলেই ভালোবাসে এবং সৃষ্টিকর্মের অমরত্ব আছে। কিন্তু তার দেহের অমরত্ব নেই। তার স্থান পৃথিবীতে নেই। তবে তার সৃষ্টিকর্মের রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামও ঠিক একইভাবে লিখেছেন, ‘বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান’ অর্থাৎ ‘আমায় নহে গো ভালোবাসো’ কিন্তু আমার গান ভালোবেসো। আমার সৃষ্টিকর্ম ভালোবেসো। এবং তা স্মৃতিতে ধরে রেখো। অর্থাৎ, মৃত্যুর পরেও সেই অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশে কবি এখানে ব্যাকুল। অর্থাৎ নজরুলের কাছে অমরত্ব কোনো অলৌকিক বিষয় নয়; মানুষের হৃদয়ে, স্মৃতিতে এবং সৃষ্টির ধারায় বেঁচে থাকাই প্রকৃত অমরত্ব। তবে অভিমানী কবি নজরুল মৃত্যু নিয়ে নিজের অভিমান প্রকাশ করেছেন এভাবে,
“ঢাকা থেকে এসে অবধি রক্তও উঠছে মাঝে মাঝে- আর মনে হচ্ছে আমি যেন কিটস সে কোন ফ্যানির নিষ্করুণ নির্মমতায় হয়তো বা আমারও বুকের চাপ-ধরা রক্ত তেমনি করে কোনদিন শেষ ঝলকে উঠে আমায় বিয়ের বরের মতো করে রাঙিয়ে দিয়ে যাবে। তারপর হয়তো বা বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়তো আমার নামে! দেশপ্রেমিক, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী-বিশেষণের পর বিশেষণ। টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পড় মেরে-বক্তার পর বক্তা। 
এই অসুন্দর শ্রদ্ধানিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে-বন্ধু! তুমি যেন যেয়ো না। যদি পার, চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোনো একটি কথা স্মরণ করো। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশে-পাশে যদি একটি ঝরা, পায়ে-পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বলো-‘বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি।’

আকাশের সবচেয়ে দূরের যে তারাটির দীপ্তি চোখের জলকণার মতো ঝিলমিল করবে-মনে করো সেই তারাটি আমি। আমার নামে তার নামকরণ করো! কেমন?

মৃত্যুকে এত করে মনে করি কেন জান? ওকে আজ আমার সবচেয়ে সুন্দর মনে হচ্ছে বলে। মনে হচ্ছে, জীবনে যে আমায় ফিরিয়ে দিলে, মরণে সে আমায় বরণ করে নেবে।” [শাহাবুদ্দীন আহমদ, সম্পা., নজরুলের পত্রাবলি (৩য় সং.; ঢাকা: নজরুল ইন্সটিটিউট, ২০১৭), পৃ. ১০৯]

৩.৪. 
যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে।
ধুয়ো ‘লাশ’ আমার লাল পানি দিয়ে।। 
শেয়র: শারাবী জমশেদী গজল ‘জানাজায়’ গাহিও আমার
দিবে গোর খুঁড়িয়া মাটি খারারী ঐ শারাব-খানার!
‘রোজ-কিয়ামতে’ তাজা উঠব জিয়ে।।
শেয়র: এমনি পিইব শারাব ভেসে যাব তাহার স্রোতে,
উঠিবে খুশবু শারাবের আমার ঐ গোরের পার হতে;
টলি’ পড়বে পথিক সে নেশায় ঝিমিয়ে।।
গানটির বাহ্যিক প্রকাশে মৃত্যু, লাশ, গোর, শারাব ও জানাজার মতো বিষয় থাকলেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন গভীরভাবে জীবন, প্রেম, আত্মবিসর্জন ও মৃত্যুচেতনার সঙ্গে যুক্ত। কবি মৃত্যুকে জীবনের সমাপ্তি হিসেবে দেখেননি। তিনি মৃত্যুর মধ্যেও জীবনের উন্মাদনা ও প্রেমের অমরত্ব খুঁজে পেয়েছেন। ‘ধরা ছাড়ি প্রিয়ে’ কথাটি দেহ ও পার্থিব জীবনের বন্ধন থেকে মুক্তির প্রতীক। মানুষ একদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যাবে, এই অনিবার্য সত্য কবি স্বীকার করেছেন। কিন্তু তার মৃত্যুচিন্তা ভীতিকর নয়; বরং তা আনন্দময় ও উদাসীন। ‘লাল পানি’ দিয়ে লাশ ধোয়ার রূপকটি শারাবের মাধ্যমে জীবনের উচ্ছ্বাস, প্রেম ও আত্মবিস্মৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখানে শারাব কেবল পানীয় নয়; এটি এমন এক আধ্যাত্মিক নেশার প্রতীক, যা মানুষকে জাগতিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অসীমের দিকে নিয়ে যায়। ‘শারাবী জমশেদী গজল’ ও ‘জানাজায়’ গাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও একটি বৈপরীত্য রয়েছে। সাধারণত জানাজা শোকের প্রতীক, কিন্তু কবি সেখানে গজল ও শারাবের কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি মৃত্যুর মধ্যেও আনন্দ, সৌন্দর্য ও সৃষ্টিশীলতার উপস্থিতি কল্পনা করেছেন। অর্থাৎ, মৃত্যু তার কাছে জীবনের বিপরীত নয়; বরং জীবনেরই অন্য এক রূপান্তর। ‘রোজ-কিয়ামতে’ আবার জেগে ওঠার ভাবনায় পুনর্জন্ম বা পরকালীন অস্তিত্বের বিশ্বাসও প্রতিফলিত হয়েছে। কবির কাছে দেহ মাটিতে মিশে গেলেও তার প্রেম, সৃষ্টির সৌরভ ও আত্মিক সত্বা বিলীন হবে না। ‘গোরের পার হতে’ শারাবের খুশবু ছড়িয়ে পড়ার রূপকটি সেই অমরত্বেরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

সবশেষে, ‘টলি’ পড়বে পথিক’, এই চিত্রকল্পে বোঝানো হয়েছে, মৃত্যুর পরও কবির প্রেম ও জীবনদর্শন অন্য মানুষের হৃদয়ে নেশার মতো প্রভাব ফেলবে। তাই গানটির গভীর দর্শন হলো: দেহের মৃত্যু অনিবার্য হলেও প্রেম, সৌন্দর্য, সৃষ্টিশীলতা ও আত্মার আকাঙ্ক্ষা মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে। মৃত্যু এখানে শেষ নয়; বরং সীমিত জীবন থেকে অসীমের দিকে এক রহস্যময় যাত্রা।

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য-গানে মৃত্যু-ভাবনা বাংলা সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। তাকে শুধু বিদ্রোহের কবি হিসেবে দেখলে তার মৃত্যুচেতনার গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। তার কাছে মৃত্যু কখনো ভয়, কখনো শোক, কখনো বিচ্ছেদ, কখনো আধ্যাত্মিক প্রত্যাবর্তন, কখনো আত্মত্যাগ, কখনো বিদ্রোহের চ্যালেঞ্জ এবং কখনো অমরত্বের দ্বার। প্রেমের গানে মৃত্যু প্রিয়জন হারানোর বেদনা ও চিরবিচ্ছেদের প্রতীক। শোকের গানে মৃত্যু ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে সার্বজনীন মানবিক অনুভূতিতে রূপান্তরিত। আবার ইসলামী গানে মৃত্যু পার্থিব জীবনের অবসান এবং পরকালীন জীবনের সূচনা; সেখানে রয়েছে বিচার, অনুশোচনা ও স্রষ্টার করুণার আকাঙ্ক্ষা। কারবালার গানে মৃত্যু আত্মত্যাগ ও সত্যের বিজয়ের প্রতীক। দেশাত্মবোধক ও বিদ্রোহী চেতনার রচনায় মৃত্যু অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মূল্য, কিন্তু সেই মৃত্যু পরাজয় নয়; আদর্শের অমরত্বের পথ। আর শিল্পীর গান ও কবিতায় মৃত্যু সৃষ্টির মাধ্যমে অমর হয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়।
নজরুলের বিশেষত্ব এখানেই যে, মানুষ ভয়ে মাথা নত করে, তার কাছে মৃত্যু অন্ধকার; যে মানুষ আদর্শের জন্য আত্মত্যাগ করে, তার কাছে মৃত্যু মহিমা; যে প্রেমিক প্রিয়জনকে হারায়, তার কাছে মৃত্যু অসীম বেদনা; আর যে মরমি স্রষ্টার দিকে ফিরে তাকায়, তার কাছে মৃত্যু হতে পারে মিলনের দ্বার। তার বিখ্যাত মৃত্যুভাবনামূলক গানগুলোর, [‘আমার যাবার সময় হলো, দাও বিদায়’, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব’, ‘আমায় নহে গো ভালোবাসো, শুধু ভালোবাসো মোর গান’, ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি’ প্রভৃতি] মধ্যে মৃত্যুর আলাদা আলাদা অনুভব ধরা পড়ে। কোথাও বিদায়, কোথাও স্মৃতি, কোথাও শিল্পের অমরত্ব, কোথাও প্রকৃতির নীরব শোক। এসব সৃষ্টিতে মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে।

সবশেষে বলা যায়, নজরুলের মৃত্যু-ভাবনার মূল সুর মৃত্যুভয় নয়, মৃত্যুকে অতিক্রম করে জীবনের মহত্ব আবিষ্কার। দেহ নশ্বর, কিন্তু প্রেম নশ্বর নয়; মানুষ মরে, কিন্তু আদর্শ বেঁচে থাকে; শিল্পী চলে যান, কিন্তু তার শিল্প রয়ে যায়; শহীদ মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তার আত্মত্যাগ ইতিহাসে অমর হয়। আর স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসী মানুষ পার্থিব জীবনের সীমা অতিক্রম করে চিরশান্তির অনন্তের দিকে যাত্রা করে। এই কারণেই নজরুলের কাব্য-গানে মৃত্যু শেষ কথা নয়। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই সেখানে জীবনের জয়, প্রেমের অমরত্ব, আত্মত্যাগের মহিমা, শিল্পের স্থায়িত্ব এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তার মৃত্যুচেতনা তাই প্রকৃত অর্থে এক জীবনবাদী মৃত্যুদর্শন। তার কাব্যগানে মৃত্যুকে স্বীকার করেই মানুষ আরও সাহসী, আরও প্রেমময়, আরও মানবিক এবং আরও সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠার প্রেরণা পায়।

লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক।