Dhaka Mail Logo

শিল্প ও সাহিত্য

নজরুল পত্রে প্রেমের শিল্পরূপ

২৬ জুন ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম

(দ্বিতীয় পর্ব): কাজী নজরুলের মতো দার্শনিকগণ দীর্ঘকাল ধরে প্রেমের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ প্রেমকে একটি গুণ হিসেবে দেখেন, যা নৈতিক বিকাশ এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নে উৎসাহিত করে। অন্যরা এটিকে একটি মৌলিক শক্তি হিসেবে গণ্য করেন, যা ব্যক্তি ও সম্প্রদায়কে সংযুক্ত করে। অধুনা প্রেম অনেক ক্ষেত্রে পণ্য হিসেবে গণ্য হয়। যদিও প্রেম শব্দটি সাংস্কৃতিক।

‘প্রেম’ শব্দের প্রকৃতি ও প্রত্যয় হলো: প্রিয় + ইমন (ইমন্) = প্রেম। ইমন তদ্ধিত প্রত্যয়। সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ী, ‘প্রিয়’ শব্দের সঙ্গে ‘ইমন’ প্রত্যয় যুক্ত হলে ‘প্রিয়’ শব্দটির স্থলে ‘প্র’ হয় এবং আদি স্বরের গুণ হয়ে ‘প্রেম’ শব্দটি গঠিত হয়। সংগীতের ভাষায় ‘ইমন’ একটি রাগ। এটি প্রেমের রাগ। একে ‘কল্যাণ’ নামেও ডাকা হয়। বস্তুত, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয়, সুমধুর এবং ব্যাপক ব্যবহৃত একটি রাগ হলো রাগ ইমন। উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখার শুরুতে সাধারণত এই রাগটি দিয়েই শিক্ষার্থীদের গায়কী বা বাদ্যযন্ত্রে হাতেখড়ি দেওয়া হয়। এটি মূলত শান্ত, স্নিগ্ধ এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। প্রেমের ক্ষেত্রে এই গাম্ভীর্য মূলত প্রেমের পথ সহজ নয়—এমন একটি ধারণাকে প্রোথিত করে।

এই রাগে সব স্বর শুদ্ধ, কেবল মধ্যম স্বরটি তীব্র। এই হিসেবে একসময় প্রেম শুদ্ধই ছিল, কিন্তু এখন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। এই রাগের জাতি আরোহ-অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ। অর্থাৎ, আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বরই অবিকৃতরূপে ব্যবহৃত হয়। প্রেমের ক্ষেত্রেও কোনো কিছু অপূর্ণ থাকলে পরিপূর্ণ সুখী হওয়া যায় না। এই রাগের গীতকাল রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গাওয়ার উপযুক্ত সময়)। এর প্রধান রস—শান্ত, ভক্তি এবং শৃঙ্গার (প্রেম) রস। শান্ত, নম্র, ভদ্র স্বভাব এবং প্রিয়জনের প্রতি নির্ভেজাল ভক্তিই প্রেমের রসে রূপান্তরিত হয়।

ইমন রাগের সঙ্গে স্রষ্টাভক্তির যেমন অনাবিল সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানব-মানবীর প্রেমও। এই রাগের তীব্র মধ্যম প্রেমে জাদুর ছোঁয়ার মতো কাজ করে। ইমনের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর তীব্র মধ্যম (মা তীব্র) স্বরটির নিখুঁত ব্যবহারের ওপর। এই একটি স্বরের পরিবর্তনের কারণেই রাগটি সাধারণ বিলাবল ঠাট থেকে আলাদা হয়ে এক অপূর্ব রূপ ধারণ করে। মানব-মানবীর প্রেমের ক্ষেত্রেও তাই। দুটি প্রাণ এক হওয়ার আগে ও পরে আচার-আচরণ, চালচলন, ভাব-বিভাব এবং অনুভূতির পরিবর্তন হয়ে প্রকৃতই অপূর্ব রূপ ধারণ করে।

প্রেমের একঘেয়েমি কাটানোর জন্য অনেক সময় প্রেমিক-প্রেমিকা একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে মনোভাব নিবেদন করে, কিছুটা ব্যঞ্জনার আশ্রয় নেয়। ঠিক ইমন রাগের চলনের মতো। যেমন, ইমন রাগের আরোহে সরাসরি ‘সা’ এবং ‘পা’ স্বর স্পর্শ না করে কিছুটা ঘুরিয়ে (যেমন: ‘নি রে গা...’ বা ‘রে গা মা ধা...’) ব্যবহার করার চল আছে। একে বলা হয় ‘বক্র চলন’। ভারতীয় উপমহাদেশের বা বাংলা সিনেমার বেশির ভাগ রোমান্টিক কিংবা ভক্তিমূলক জনপ্রিয় গান রাগ ইমনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সন্ধ্যা নামার মুখে এই রাগের আলাপ বা বিস্তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়।

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘প্রেম’ শব্দটি ইংরেজি বা অপরাপর ঋদ্ধ ভাষার সমতুল্য। এ কথা ধারণা করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, ভালোবাসা প্রকাশে ‘প্রেম’ শব্দটি অত্যন্ত কার্যকর। সাহিত্য-সংস্কৃতি বা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় প্রাচীন গ্রিক ছিল সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রসর। প্রাচীন গ্রিক চিন্তাধারায় প্রেম-ভালোবাসার বিভিন্ন রূপ বর্ণনা করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হতো। ‘ইরোস’ (Eros) বলতে বোঝাত তীব্র বা রোমান্টিক ভালোবাসা, ‘ফিলিয়া’ (Philia) বলতে বোঝাত বন্ধুত্ব ও স্নেহ এবং ‘আগাপে’ (Agape) বোঝাত নিঃস্বার্থ, শর্তহীন ভালোবাসা। এই পার্থক্যগুলো মানুষের স্নেহ ও আসক্তির বহুবিধ দিককে তুলে ধরে।

রোমান্টিক ভালোবাসা (ইরোস)

গ্রিক শব্দ ‘ইরোস’ দ্বারা রোমান্টিক ভালোবাসা পরিচিত। সম্ভবত ভালোবাসার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত রূপ এটি। এর মধ্যে দুজন ব্যক্তির মধ্যে গভীর মানসিক আকর্ষণ, স্নেহ, আবেগ এবং আকাঙ্ক্ষা জড়িত থাকে। রোমান্টিক ভালোবাসা সাধারণত এমন সঙ্গীদের সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত, যারা মানসিক এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতা ভাগ করে নেয়।

এই ধরনের ভালোবাসা অবুঝ আকর্ষণ দিয়ে শুরু হয়। একজন ব্যক্তি অন্যের চেহারা, ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা বা চরিত্রের প্রশংসা করতে পারেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আকর্ষণ একটি গভীর মানসিক সংযোগে পরিণত হতে পারে, যার বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি এবং সাহচর্য। রোমান্টিক ভালোবাসার মধ্যে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে—মানসিক ঘনিষ্ঠতা, শারীরিক আকর্ষণ, আবেগ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা এবং পারস্পরিক সমর্থন।

সুস্থ রোমান্টিক ভালোবাসার জন্য শুধু তীব্র অনুভূতিই যথেষ্ট নয়। এটি নির্ভর করে শ্রদ্ধা, যোগাযোগ, বিশ্বাস এবং একে অপরকে বোঝার ওপর। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবেগের তারতম্য হতে পারে, দীর্ঘস্থায়ী রোমান্টিক সম্পর্কগুলো বন্ধুত্ব, আনুগত্য এবং অভিন্ন মূল্যবোধের দ্বারা টিকে থাকে।

মানব ইতিহাসজুড়ে রোমান্টিক ভালোবাসা অগণিত কবিতা, উপন্যাস, গান এবং শিল্পকর্মকে অনুপ্রাণিত করেছে, কারণ এটি তীব্র আবেগ এবং জীবন-পরিবর্তনকারী অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত। কবি নজরুলের জীবনেও নার্গিস আসার খানমের আগমন তেমনই একটি ঘটনা।

২৩ জুন ১৯২১ সালের বিকেলে কবি নজরুল নার্গিসের মামা আলী আকবর খানকে একটি পত্র লেখেন। কাজী নজরুল ইসলামের ‘পত্রাবলি’ থেকে নেওয়া এই অংশটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী এবং কবি-হৃদয়ের গভীর অভিমান, ক্ষোভ ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার দালিলিক অনন্য দর্পণ। বাইরে যিনি ‘বিদ্রোহী’ ও বজ্রকণ্ঠ, ভেতরে তিনি যে কতটা কোমল এবং নিজের আত্মমর্যাদা বা ‘পৌরুষ’ নিয়ে কতটা সংবেদনশীল ছিলেন, এই পত্রের প্রতিটি ছত্র তার প্রবল প্রমাণ।

কান্দিরপাড়, কুমিল্লা
২৩ জুন, ১৯২১
(বিকেলবেলা)

বাবা শ্বশুর!

আপনাদের এই অসুর জামাই পশুর মতো ব্যবহার করে এসে যা কিছু কসুর করেছে, তা ক্ষমা করো সকলে, অবশ্য যদি আমার ক্ষমা চাওয়ার অধিকার থাকে। এইটুকু মনে রাখবেন, আমার অন্তর-দেবতা নেহায়েত অসত্য না হয়ে পড়লে আমি কাউকে ব্যথা দিই না। যদিও ঘা খেয়ে খেয়ে আমার হৃদয়টাতে ঘাটা বুজে গেছে, তবু সেটার অন্তরতম প্রদেশটা এখনো শিরীষ ফুলের পরাগের মতোই কোমল আছে। সেখানে খোঁচা লাগলে আর আমি থাকতে পারিনে।

তাছাড়া, আমিও আপনাদেরই পাঁচজনের মতো মানুষ। আমার গণ্ডারের চামড়া নয়, কেবল সহ্যগুণটা কিছু বেশি। আমার মান-অপমান সম্বন্ধে কাণ্ডজ্ঞান ছিল না বা ‘কেয়ার’ করিনি বলে আমি কখনো এত বড় অপমান সহ্য করিনি, যাতে আমার ‘ম্যানলিনেসে’ বা পৌরুষে গিয়ে বাজে—যাতে আমাকে কেউ কাপুরুষ কিংবা হীন ভাবতে পারে।

আমি সাধ করে পথের ভিখারি সেজেছি বলে লোকের পদাঘাত সইবার মতো ‘ক্ষুদ্র-আত্মা’ অমানুষ হয়ে যাইনি। আপনজনের কাছ হতে পাওয়া অপ্রত্যাশিত এত হীন ঘৃণা ও অবহেলা আমার বুক ভেঙে দিয়েছে। বাবা! আমি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। দোওয়া করবেন, আমার এ ভুল যেন দুদিনেই ভেঙে যায়—এ অভিমান যেন চোখের জলে ভেসে যায়!

বাকি উৎসবের জন্য যত শিগগির পারি বন্দোবস্ত করব। বাড়ির সকলকে দস্তুরমতো সালাম-দোয়া জানাবেন। অন্যান্য যাদের কথা রাখতে পারিনি, তাদের ক্ষমা করতে বলবেন। তাকেও ক্ষমা করতে বলবেন, যদি এ ক্ষমা চাওয়া ধৃষ্টতা না হয়।

আরজ-ইতি
চির-সত্য স্নেহ-সিক্ত
নুরু

চিঠির শুরুতেই ‘অসুর জামাই’ প্রত্যয়-দ্বয়ের ব্যবহার মূলত তীব্র আত্মধিক্কারের সমন্বিত রূপ। এভাবে নিজেকে ‘অসুর জামাই’ এবং নিজের আচরণকে ‘পশুর মতো’ বলে উল্লেখ করেছেন। এটি কোনো সাধারণ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নয়; বরং আপনজনদের কাছ থেকে পাওয়া বড় আঘাত বা ভুল বোঝাবুঝি থেকে জন্ম নেওয়া চরম অভিমান ও তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

নজরুল লিখেছেন, তাঁর ভেতরের মানুষটি বা অন্তর-দেবতা কখনো কাউকে ‘ব্যথা দিত না’। তাঁর হৃদয় ‘শিরীষ ফুলের পরাগের মতোই কোমল’। বাহ্যিক রুক্ষতা বা দ্রোহের আড়ালে নজরুলের মন যে কতটা সংবেদনশীল ও কবিসুলভ ছিল, এই উপমা তা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

তবে তিনি কোমল হৃদয়ের হলেও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে ছিলেন চির-আপসহীন। কবি দারিদ্র্য বা ‘পথের ভিখারি’ হওয়াকে কখনো লজ্জার মনে করেননি। কিন্তু সেই কারণে কেউ তাঁকে ‘কাপুরুষ’ বা ‘হীন’ ভাববে কিংবা তাঁর পুরুষত্বে আঘাত করবে—এটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি স্পষ্ট বলেছেন: ‘আপনাদেরই পাঁচজনের মতো মানুষ, আমার গণ্ডারের চামড়া নয়, কেবল সহ্যগুণটা কিছু বেশি।’

নার্গিসকে বিবাহ করার পর বাসররাতে কী ঘটেছিল, তার পরিপূর্ণ বর্ণনা এখনো অনাবিষ্কৃত। কবি কখনোই তা প্রকাশ করেননি। তবে মারাত্মক অবমাননাকর কিছু ঘটেছিল—এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। তা না হলে আদর্শবাদী যুবক কাজী নজরুল কখনোই নববিবাহিতা স্ত্রীকে ত্যাগ করে গভীর রাতে বৃষ্টি-কাদার মধ্যে কুমিল্লা শহরে গিয়ে উঠতেন না।

এই পত্রে মানুষের প্রতি নজরুলের বিশ্বাস হারানোর হাহাকার লিপিবদ্ধ হয়েছে—‘আমি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি।’ নজরুলের মতো প্রখ্যাত মানবতাবাদী কবির মুখ থেকে যখন এই হাহাকার বের হয়, তখন বোঝা যায় আঘাতটা কতটা গভীর ছিল। তিনি সমাজ বা শত্রুর কাছ থেকে নয়, বরং ‘আপনজনের কাছ হতে পাওয়া অপ্রত্যাশিত হীন ঘৃণা’র কারণে এই কষ্ট পেয়েছিলেন।

এই চিঠিটি নজরুলের জীবনের এক চরম অশান্ত ও আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী। এই পত্রে একদিকে তাঁর তীব্র দারিদ্র্য ও অবহেলার অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে তাঁর আকাশচুম্বী আত্মসম্মানবোধ ফুটে উঠেছে।

চলবে...

লেখক: ড. হাফিজ রহমান, নজরুল গবেষক ও কলামিস্ট।