ঢাকা মেইল ডেস্ক
২৪ জুন ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
আজ থেকে শতবর্ষ আগে ১৯২৬ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) বহু আলোচিত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শীর্ষক দেশাত্মবোধক ও মানবতাবাদী কবিতাটি লিখেছিলেন। রচনাটি একই সঙ্গে জনপ্রিয় গান ও কবিতা হিসেবে পরিচিত। এ রচনাটি তিনি বাংলা ১৩৩৩ সালের ৬ই জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি মে-জুন ১৯২৬ খ্রি.) রচনা করেন এবং রচনার প্রায় কয়েকদিনের মধ্যে মাসিক ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের পঞ্চম বর্ষ জ্যৈষ্ঠ প্রথমার্ধ চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ জ্যৈষ্ঠ ৫০ বর্ষ ২য় সংখ্যায় ‘ভারতী’সহ অনেক সাময়িকীতে এ লেখা প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাটি ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ শিরোনামে গান হিসেবে সমধিক পরিচিতি পায়। গানটি ‘কালিকলম’ পত্রিকার আশ্বিন ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় কাজী নজরুল-কৃত স্বরলিপিসহ প্রকাশিত হয়েছিল।
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনাটিকে নানা রকম দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করা হয়। কাজী নজরুলের অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা তার সাহিত্যজীবনের উন্মেষকাল থেকেই শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে এ ভূমিকা তার অসংখ্য কবিতা ও গানে, প্রবন্ধ, উপন্যাস, সাংবাদিকতায় ও রাজনৈতিক শ্রমিক সংগঠন (১৯২৫-২৬) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অব্যাহত রেখেছিলেন। এ কথা বার বার উচ্চারিত হয় যে, ব্রিটিশ শাসনের আগে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় ছিল। এই সম্প্রীতির নানা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থে পাওয়া যায়। কাজী নজরুল অতীত সম্পর্কে একটা গৌরববোধ করতেন এবং বর্তমান সম্পর্কে গভীর আত্মবিশ্বাস রাখতেন। আর্থসামাজিক ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে এসবই ছিল তার উত্তরাধিকার। কিন্তু ব্রিটিশ কলোনিয়াল স্বার্থবাদী শাসক-শোষকদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কারণে তা নষ্ট হয়। ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশে গরু-কুরবানি এবং মসজিদ-মন্দিরের সামনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান-মহরম, পুজার মিছিলকে কেন্দ্র করে পুনঃপুন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছে। কাজী নজরুল চোখের সামনে সাম্প্রদায়িক দেখেছেন, যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে সেই হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে তিনি তার লেখায় সাধারণভাবে বলার চেষ্টা করেছেন। তিনি তার সৃষ্টিকর্মে প্রধান গুরুত্ব হিসেবে মানুষের জীবনটাকেই দিয়েছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের আলোচ্য ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনাটি বুঝতে হলে তার সমকালকে সর্বাগ্রে বুঝতে হবে। ব্রিটিশ শাসনের চিরাচরিত শঠতার নীতি যা ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ সৃষ্টি করে তাদের শাসন-শোষণ দীর্ঘায়িত করা। উপমহাদেশের এই হিন্দু-মুসলিম সমস্যা কাজী নজরুলকে ভাবিয়ে তুলত। তিনি এ সমস্যা নিয়ে বার বার লিখেছেন। কবি নজরুল তার ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনার আগে ‘বিদ্রোহী’সহ বেশ কিছু রচনা ও গ্রন্থ প্রকাশের ফলে সাহিত্য অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এ রচনাটি প্রকাশের ফলে অবিভক্ত বাংলায় তরুণ ছাত্র, যুবক, রাজনীতিবিদসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। সমকালে অনেক পত্রিকায় এ কবিতাটি পুনঃমুদ্রিত এবং নানা সম্মেলন ও অনুষ্ঠানে গীত হয়। সমকালে কবিতাটি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া তুলেছিল। রচনাটির জন্য কবিকে নানা অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তি-সেচ্ছাসেবক-ছাত্র-যুবক উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন। কবি নজরুল সে সময় হয়ে উঠেছিলেন সারা বাংলায় জনপ্রিয় কবি তারকা।
রচনাটি প্রসঙ্গে মাহবুবুল হক তার ‘নজরুল তারিখ অভিধান’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
গানটি ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ২২ মে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন-সংগীত রূপে কবি-কর্তৃক গীত হয়েছিল। ১৩৩৩ আশ্বিনের (সেপ্টেম্বর ১৯২৬) কালিকলমে এই গানটি কবিকৃত স্বরলিপিসহ প্রকাশিত হয়। পরে এটি সর্বহারা কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়। [উদ্ধৃত : নজরুল তারিখ অভিধান।। মাহবুবুল হক ।। পৃ. ১০৩]
কাজী নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শীর্ষক কবিতাটির প্রেক্ষাপট অতি দীর্ঘ। এ রচনার সমকালে বাংলার তথা ভারতবর্ষ এক বিক্ষুব্ধ সময়। তখনকার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুলের মানসপট তৈরি হয়েছে। রচনাটির পূর্বাপর ইতিহাস পাঠে বলতে হয়, ব্রিটিশদের ‘ভাগ কর শাসন কর’ নীতির কথা। ব্রিটিশ সরকার এ দেশের মানুষের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে ধর্ম, বর্ণ, জাতি এবং অঞ্চলভেদে বিভেদ সৃষ্টি করে। তাদের পুরো শাসনামলই ছিল উপমহাদেশের মানুষের জন্য সংকটময় এক দুঃসময়। যদিও তারা নিজেদের ক্ষমতাকে এক চেটিয়া করার জন্য উপমহাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইন ও শাসন কাঠামোর বিন্যাস, ইংরেজি শিক্ষাবিস্তার, রেলপথ নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, সমাজ সংস্কারমূলক কাজ ইত্যাদি কল্যাণসাধন করলেও তাদের নিষ্ঠুর শাসন ও শোষণ আজও কালের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে।
কাজী নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ রচনার পূর্বাপর কালে গোটা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল এক অস্থির সময়। এ সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক বিপর্যয় ঘটে। এর কারণ আর কিছু নয়, ইংরেজ সরকারের শাসন, শোষণ, নির্যাতন, দমন, নিপীড়ন। ভারতবর্ষে এ সময়ে যে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিল বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫) সময়েও তা হয়নি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এই অগ্নিযুগের চালচিত্র ঔপনিবেশিক দলিলপত্রে প্রমাণ পাওয়া যায়। উত্তাল এ সময়ে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তালিকায় রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর (১৯১৪-১৯১৮) ভারতবর্ষে প্রভাব, খিলাফত আন্দোলন (১৯১৮-১৯২০), অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-১৯২২), রাওলাট আইন, ১৯১৯; ভারত শাসন আইন, ১৯১৯; জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড (১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯), চৌরিচৌরার ঘটনা (৪ঠা ফেব্রুয়ারি ১৯২২), আইন অমান্য আন্দোলন, প্রজা-আন্দোলন ইত্যাদি।
পরাধীন ভারতবর্ষের রাজনীতির এই টালমাটাল সময়ে কবি নজরুল সদ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক জীবন থেকে দেশে ফিরে আসার পর সাংবাদিকতা ও লেখালিখিতে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন সক্রিয় জাতীয়তাবাদী প্রত্যয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একজন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি। তিনি মনে করতেন রাজনৈতিক মুক্তির মধ্যেই অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ সকল মুক্তি নিহিত। কাজী নজরুল কিশোর বয়স থেকে জীবনের প্রত্যেকটি পর্যায়ে দারিদ্র্য, সামাজিক প্রতিকূলতা, পরাধীনতা, অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বেড়ে উঠেছেন। বিদ্রোহ ও সংগ্রামী জীবন তাঁর ধমনিতে মিশে ছিল গভীরভাবে।
দেশ ও জাতির রাজনৈতিক পরাধীনতা, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক এই ঘটনাবলি কাজী নজরুল-মানসকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ১৯১৭ সালে কবি নজরুল শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় ব্রিটিশের হয়ে সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিতে করাচিতে গিয়েছিলেন। সাদা চোখে ব্রিটিশ সরকারকে সন্তুষ্ট করে ভিতরে ভিতরে যুদ্ধবিদ্যা শিখে দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে কাজে লাগাবেন, সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে কাজ করবেন এই উদ্দেশ্যেই তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা বিশ্বযুদ্ধচলাকালীন যুদ্ধের অজুহাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ, খাদ্য, অর্থ ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটেনে নিয়ে যায়। বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ সরকার স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতির শর্তে ভারতবাসীর সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়েছিল। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশরা চিরাচরিত শঠতার আশ্রয় নিলেন। ব্রিটিশরা রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মুসলমানদের খেলাফত অর্থাৎ ধর্মজগতে মুসলমানদের এক জাতীয়তা ভাঙনে লিপ্ত হলেন। ভারতীয় দণ্ডবিধি, ১৮৬০ আইনে দেশদ্রোহিতার ধারা ১২৪ক ও ১৫৩ক যুক্ত করে তা লঙ্ঘনের দায়ে শত শত দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।

ব্রিটিশ সরকার রাওলাট নামক কালো আইনের শৃঙ্খলে মুক্তিকামী হাজার হাজার জাতীয়তাবাদী নেতা-কর্মীকে স্বাধীনতা হরণ করে বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরীণ করলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী আইনজীবীদের কারও কারও বার সনদ তুলে নেয়া হলো। মিছিল, মিটিং, পত্রিকার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হলো। অসংখ্য পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ এবং শত শত বিপ্লবীকে কারারুদ্ধ করা হয়।। স্বাধীনতাকামী সাধারণ জনগণ হরতাল, সভা, বিক্ষোভ, শোভাযাত্রা করে সারা ভারতবর্ষ কাঁপিয়ে তুলল। আন্দোলন অহিংসার পথ ধরে না চলে সহিংস হতে লাগল। ব্রিটিশ সরকার আন্দোলন দমন করতে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করল। এই সংঘাত ও সংঘর্ষের চূড়ান্ত পরিণাম পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগে ইংরেজ সৈন্যরা নিরীহ জনগণের ওপর নৃশংস হত্যাকাণ্ড (১৩ই এপ্রিল ১৯১৯) চালায়। এরই প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) নাইটহুড উপাধি বর্জন করার ঘোষণা করলেন।
তারুণ্যের প্রতীক কাজী নজরুল ইসলাম ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যারাক থেকে ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের সব খবরই জানতেন। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতির সম্পর্কে খবর রাখতেন। এজন্য করাচীর সেনানিবাসে অবস্থানকাল থেকেই ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দাবাহিনী তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছিল। সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ (১৯২০) পত্রিকায় কর্মরত থাকাকালে কাজী নজরুলের সম্পাদকীয় প্রবন্ধগুলো পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গণমানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই প্রবন্ধসমূহে তিনি রুশ বিপ্লব, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খলমুক্ত নতুন তুরস্ক এবং পরাধীন ভারতের মুক্তির সংগ্রামকে এক সূত্রে গ্রথিত করেছিলেন। ফলে অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলন বিপুল গতি সঞ্চার করেছিল। তখন কাজী নজরুলের লিখনীতে মুক্তির একটি অগ্রণী হাতিয়ার হয়ে ওঠে। অসাম্য ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তার লিখনী গতি সঞ্চার করে। তার লেখার মূল সুর ছিল আর্থসামাজিক পরিবর্তন যা যুগের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছিল।
আরও পড়ুন
কাজী নজরুল ইসলামের পত্রাবলির নানাদিক
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ব্রিটিশ ভারতে সাম্প্রদায়িক সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। কলকাতায় বারবার হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হতো। এই দাঙ্গার প্রভাব, সাম্প্রদায়িক বিষ ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে পড়ে। কাজী নজরুল ধর্মীয় বিভাজন, সামাজিক কুসংস্কার, জাতপাতের বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে গান, কবিতা, বক্তৃতা উপস্থাপন করেন। এই রাজনৈতিক এই অস্থিরতার সময়ই কবি নজরুল তার ২৬ পঙ্তির বিখ্যাত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি রচনা করেন। তিনি তার ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম ও বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার বার্তা দিয়েছেন। তিনি দেশের সংকটময় মুহূর্তে নেতৃত্ব, সাহস, ঐক্য এবং আত্মত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। এ কবিতায় তিনি ইঙ্গিতে অসাম্প্রদায়িক ভূমিকার গোটা চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন যা অপূর্ব, অনন্য ও শাশ্বত। কবিতাটির কয়েকটি বিখ্যাত পঙ্তি উদ্ধৃতি করা হলো :
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।
‘‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!
[উদ্ধৃতি : নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি, অক্টোবর ২০১৮।। দ্বিতীয় খণ্ড।।সর্বহারা। পৃ. ১২২]
এ কবিতা যেন তার নিজেরই প্রতিরূপ। চরণ গুলোতে মানবতার এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। এ বার্তা এক গভীর রাজনৈতিক ও জাতীয় চেতনার প্রতীক। এটি শুধু একটি কবিতা নয়, এটি একটি সময়ের ডাক, একটি বিপ্লবের আহ্বান।
এ প্রসঙ্গে করুনাময় গোস্বামী তার ‘নজরুল গীতি প্রসঙ্গ’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :
১৯২৬ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হয়। এতে কবি নজরুল অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তখন তিনি কৃষ্ণনগরে থাকতেন। পরের মাসে কৃষ্ণনগরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো হচ্ছে: বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন, অর্থাৎ প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন ও যুব সম্মেলন। প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নজরুল ইসলাম এই তিনটি সম্মেলনের আয়োজনের ব্যাপারেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির তাৎপর্যকে বিষয়বস্তু করে নজরুল কংগ্রেস সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীত রচনা করেন : দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার/লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার। নিজেই তিনি সভায় এই উদ্বোধনী সংগীতটি গেয়েছিলেন।
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান/আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা দিবে কোন বলিদান' চরণদুটিতে সমকালীন একটি আত্মোৎসর্গের ঘটনা বিধৃত আছে।
সন্ত্রাসবাদী দলীয় গোপীনাথ সাহা টেগার্ট সাহেবকে মারতে গিয়ে ভুল করে গুলি চালালেন ডে সাহেবের ওপর। টেগার্ট সাহেবকে খুব ভাল করে চিনতেন না গোপীনাথ। সকাল বেলায় ডে সাহেব বেড়াতে বেরিয়ে চৌরঙ্গীর মোড়ে একটা দোকানের শো কেসে কী একটা কিছু দেখছেন, এমন সময় তাকে টেগার্ট মনে করে গুলী চালালেন গোপীনাথ। ডে সাহেব মারা গেলেন। তাকে হত্যার দায়ে ফাঁসির আদেশ হলো গোপীনাথের। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখছেন : হলে হবে ফাঁসি, গোপীনাথ সে তোয়াক্কা করে না। সে দেশমুক্তির যজ্ঞে ইন্ধন যোগাতে পেরেছে এই তো তার আনন্দ। ফল-অফল, ভুল-অভুল সমস্ত অবান্তর। ফাঁসির আগের দিন সে কোর্তায় সাবান দিল, চুল ছাঁটল, খেল পেটভরে। দেখা গেল পাঁচ পাউণ্ড ওজন বেড়েছে। হাসতে হাসতে মঞ্চে গিয়ে উঠল। বললে, মা আমাকে ডেকেছে তার বুকে মাথা রেখে এখন ঘুমুব। এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিকের কথাই ধ্বনিত হচ্ছে চরণ দুটিতে:
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা দিবে কোন বলিদান? [উদ্ধৃত : নজরুল গীতি প্রসঙ্গ।। করুনাময় গোস্বামী।। পৃ. ৩৩৭-৩৩৮]
এ কবিতায় রূপক অর্থে বেশ কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- বিখ্যাত কয়েকটি পঙৃতি :
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভূলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার!!
. . .
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!
[উদ্ধৃতি : নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি, অক্টোবর ২০১৮।। দ্বিতীয় খণ্ড।।সর্বহারা। পৃ. ১২২]
কাজী নজরুল এখানে বাংলার নেতাদের (নৌকার কান্ডারী) সতর্ক করছেন। তিনি বলেছেন, জাতি এক গভীর সংকটে আছে, তরী (দেশ) দুলছে, মাঝি (নেতা) দিশেহারা, আর জাতি ডুবে যাচ্ছে। এই সময়ে সাহসী, অগ্রগামী, সত্যিকারের নেতৃত্ব প্রয়োজন। দেশকে একটি নৌকা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। মাঝি বা কান্ডারী হলো নেতা বা পথপ্রদর্শক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতা এক অনন্য, অদ্বিতীয় ও যুগান্তকারী সৃষ্টি। এই কবিতাটি শুধু সাহিত্যকর্ম হিসেবেই নয়, বরং পরাধীন জাতির আত্মজাগরণের এক বজ্রনিনাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ রচনা ধর্ম, জাতি ও বর্ণের ভেদাভেদ দূর করার এক অমোঘ বাণী, অসাম্প্রদায়িকতার বাণী প্রচার করার এক শাণিত অস্ত্র।
১৯২৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন মুসলিম সাহিত্য সমাজের একাধিক ঢাকায় অধিবেশন ও বার্ষিক সম্মেলনে কাজী নজরুল নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি সে সময় একদল সাহিত্যিক তরুণ-তুর্কীকে উৎসাহিত করেছেন। জানা যায়, কবি নজরুল ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ১৯২৬ সালের ২৪শে জুন প্রথম ঢাকায় আগমন করেন। সেই সময় কেন্দ্রীয় আইন সভায় তদানীন্তন সমগ্র ঢাকা বিভাগ থেকে মুসলমানদের জন্য দুটি আসন সংরক্ষিত ছিল, যার একটিতে কবি নজরুল প্রার্থী ছিলেন। ১৯২৬ সালের শেষ দিকে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, কবি কাজী নজরুল ইসলাম নির্বাচনে কংগ্রেস-সমর্থিত অর্থাৎ স্বরাজ পার্টির প্রার্থী ছিলেন। তার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগের প্রার্থী, বরিশালের বামনার জমিদার মুহম্মদ ইসমাইল চৌধুরী (তিনি ছিলেন রাজবাড়ীর পদমদীর জমিদার নবাব মীর মোহাম্মদ আলীর ভ্রাতুষ্পুত্রী ও আসমাতুন্নেছার স্বামী), টাঙ্গাইলের জমিদার আব্দুল হামিদ গজনভী, ঢাকার নবাববাড়ির আব্দুল করিম ও মফিজ উদ্দিন আহমেদ। স্বরাজ পার্টি-কংগ্রেস থেকে নিম্ন আইন পরিষদে নির্বাচন করেন ফরিদপুরের তরুণ জমিদার চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে লাল মিয়া। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগ থেকে তমিজউদ্দিন খান। তারুণ্যদীপ্ত কাজী নজরুলের খ্যাতি তখন সারা ভারতবর্ষ জুড়ে। নির্বাচনি প্রচারের কাজে তিনি একবার ঢাকা হয়ে জয়দেবপুরে গিয়েছিলেন। পথে যেতে যেতে তিনি ‘চাঁদনী রাতে’ নামে কবিতাটি লিখেন।
নির্বাচনি প্রচার কাজ চালাতে গিয়ে কবিকে বাববার প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তখন তিনি তার লেখা ইসলামি গান ও কবিতা শুনিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেছেন। এ সময় প্রগতিপন্থি তরুণদের এগিয়ে আসার জন্য বারবার আহ্বান করেছেন তিনি। নির্বাচনি কাজে কবি নজরুলের ঢাকায় আগমনের খবর পেয়ে সাহিত্য সমাজের কর্মী কবি আবদুল কাদির ও তাঁর সাহিত্যিক বন্ধু মোহাম্মদ কাসেম এবং আবদুল মজিদ সাহিত্যরত্নসহ অনেকে কবির সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় সাহিত্য সমাজের নেতা কর্মীদের সাথে তার পরিচয় হয়। কবি নজরুল সাহিত্য সমাজের খবর আগেই শুনেছিলেন এবং দূর থেকে শুরু থেকেই এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সরাসরি তাদের নিকট ঢাকা সাহিত্য সমাজের হিন্দু মুসলিম সমন্বয় ধারার যুক্তিবাদী-প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের খবর শুনে খুবই প্রীত হন এবং তাদের সঙ্গে যুক্তভাবে কাজ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন।

১৯২৬ সালের ২৭-২৮শে জুন মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সমাজের বিশেষ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সাহিত্য সমাজের কর্মীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সময় সাহিত্য সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের বর্ধমান হাউস ছাত্রাবাসের [বর্ধমান হাউস তখন মুসলিম হলের অন্তর্ভুক্ত] হাউস টিউটর তরুণ শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীকালে কাজী নজরুল বর্ধমান হাউসে বেশ কয়েকবার তার আতিথেয়তা গ্রহণ করেন এবং সাহিত্য সমাজের সম্মেলনের বার্ষক এসেছেন। সম্মেলনে কবিতা আবৃত্তি ও জাগরণী গান গেয়ে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। তিনি উদীয়মান অনেক কবি ও লেখককে কবিতা ও গান লিখে দিয়ে প্রেরণা দিয়েছেন। তরুণ সাহিত্যসেবীদের তিনি প্রাণভরে ভালোবাসতেন ও উৎসাহ দিতেন। তাদেরকে নিজ হস্তে অনুভূতি লিখে দিয়ে বই উপহার দিয়েছিলেন। শিক্ষিত তরুণেরা সাহিত্য সমাজের সান্নিধ্যে এসে নতুন করে জগতকে দেখতে শুরু করে। পরবর্তীকালে, বাংলাদেশের অনেক চিন্তাশীল লেখক ও বুদ্ধিজীবী ‘সাহিত্য সমাজে’র আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। সাহিত্য সমাজের নিমন্ত্রণে এসে কত তরুণ সাহিত্যসেবীদের যে কতভাবে উৎসাহিত করেছিলেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পূর্ব বাংলায় তার সৃষ্টিকর্ম এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। এই প্রভাব জাতির অগ্রগতি ও ইতিহাস বিনির্মাণে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। এ প্রসঙ্গে আবদুল কাদির তার ‘নজরুল-প্রতিভার স্বরূপ’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :
১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বন্ধু পরলোকগত শ্রী হেমন্ত কুমার সরকার এম, এ, এম, এল, সি, মহোদয়কে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় প্রথম এসেছিলেন। তাঁরা তখন উঠেছিলেন স্বরাজ্য দলের প্রখ্যাত সদস্য পরলোকগত চাঁদসীর ডাক্তার শ্রীমোহনীমোহন দাসের বাস-ভবনে। মোহনীবাবু থাকতেন ঢাকার কাছারির কাছে একটা বাড়ীতে। কবির ঢাকা আগমনের খবর পেয়ে বন্ধুবর মোহাম্মদ কাশেম ও আবদুল মাজীদ সাহিত্যরত্বকে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে দেখতে যাই। কবির সঙ্গে আমার সেই প্রথম সাক্ষাৎ। ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৯শে জানুয়ারী প্রধানতঃ 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' প্রতিষ্ঠিত হয়; এই প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তিত 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলন ইতিমধ্যেই দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে কিছু ঔৎসুক্যের সৃষ্টি করেছিল : কবিও তার খবর রাখতেন দেখা গেল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন সাহেবের কথা। মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রগতিশীল চিন্তাধারার কথা শুনে খুব আনন্দ প্রকাশ করলেন। কিন্তু সেই আনন্দ প্রকাশের মধ্যে কবির স্বাভাবিক ও স্বতঃফূর্ত উচ্ছলতা বেশী দেখতে পেলাম না। আলোচনা প্রসঙ্গে বুঝতে পারলামঃ সারাদেশে সাম্প্রদায়িক বিরোধ যেভাবে বাড়ছে তার পরিণাম-চিন্তাই কবির মনের স্বতোৎসারিত উল্লাস অনেকখানি হরণ করেছে। মাত্র একমাস আগে, ২২শে ও ২৩শে মে তারিখে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন কবি তাঁর রচিত 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার' গানটি গেয়ে। কিন্তু সেই হুঁশিয়ারি হয়েছে ব্যর্থ, প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস কর্মী সংঘের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের তৎপরতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট গেছে বাতিল হয়ে; সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুন উস্কিয়ে দেওয়া হচ্ছে সর্বত্র। কবি এজন্য দুঃখ করে বললেন, প্রগতিপন্থী তরুণদের এগিয়ে আসতে। শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নয়, হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির যুগ-সম্মত সমন্বয়-সাধন মুসলিম সাহিত্য-সমাজের প্রধান কর্মীদের বিশেষ ভাবনার বিষয়, আমার মুখে এই কথা শুনে কবি ও হেমন্ত বাবু আগ্রহ প্রকাশ করলেন সাহিত্য-সমাজের এক বৈঠকে মিলিত হতে।
অতঃপর কবির সঙ্গে পরামর্শ করে ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দের ২৭শে জুন রবিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে সাহিত্য-সমাজের চতুর্থ বৈঠক আহত হয়। উক্ত বৈঠকে কবি একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন এবং 'কাণ্ডারী হুশিয়ায়', 'আমরা ছাত্রদল', 'কৃষাণের গান', 'জেলেদের গান' প্রভৃতি জন জাগরণমূলক কয়েকটি গান গেয়ে সকলকে অপরিমেয় আনন্দ দান করেন। নজরুল মধুকণ্ঠ ছিলেন না, কিন্তু সুকণ্ঠ ছিলেন। তিনি স্বরে এমন অলঙ্করণ ও আন্তরিক আবেগ দিয়ে তাঁর বাণীর বিস্তার করতেন যে, তার প্রভাবে সহজেই শ্রোতার চিত্ত হতো অভিভূত। সেদিন নজরুলের কণ্ঠে জাগরণী গানগুলি কথার অতীত অর্থে শ্রোতাদের প্রাণের অতল করে উদ্দীপিত। [উদ্ধৃত : ‘নজরুল-প্রতিভার স্বরূপ’ ।। আবদুল কাদির ।। পৃ. ৫৮-৫৯]
আজকের দিনে ধর্মীয় আদর্শকে বিকৃত করে যখন হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন কাজী নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ সমাজকে সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়। এ কবিতায় তিনি সকল মানুষকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে প্রতিহত করার, রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৯২৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর কলকাতা এ্যালবার্ট হলে (বর্তমানে ইন্ডিয়ান কফি হাউস নামে পরিচিত যা কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে অবস্থিত ) এক অনুষ্ঠানে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে মাত্র ৩০ বছর বয়সে কাজী নজরুল ইসলাম সংবর্ধনা দেওয়া হয়। উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলাম যখন বজ্রকন্ঠে তার বিখ্যাত কবিতা ❝দুর্গম গিরি কান্তার মরু❞ আবৃত্তি করে শোনাচ্ছিলেন, সেসময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি কাজী নজরুলের কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন : ❝ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে আমি সারা ভারতবর্ষ ঘুরেছি কিন্তু ❝দুর্গম গিরি কান্তার মরুর❞ মতো কোনো গান আমি খুঁজে পাইনি। এই গানের উপরে ভর করেই আমি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে আসবো। নজরুলের গান ও কবিতা আমাদের বিপ্লবী চেতনাকে আরো শক্তিশালী করেছে।❞ তিনি এ গানকে জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছিলেন। নেতাজির স্বপ্ন যদিও আজও অপূর্ণই থেকে গেছে। ঐ অনুষ্ঠানে নেতাজি আরো বলেন—❝ যেদিন দেশ স্বাধীন হবে সেদিন বাঙালীর ‘জাতীয় কবি’ হবেন কাজী নজরুল ইসলাম❞।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শক্তি ছিলেন কাজী নজরুল। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করার পর বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণের যুদ্ধজয়ের অবশ্যম্ভাবী হাতিয়ার হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২৬শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে। পরে কালুরঘাট বেতার প্রক্ষেপণ কেন্দ্রে বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। পাকিস্তানি হামলার আগ পর্যন্ত এই বেতার কালুরঘাটেই ছিল। পরে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অনুরোধে ভারত সরকার ৫০ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন মধ্যম তরঙ্গের একটি ট্রান্সমিটারের ব্যবস্থা করেছিল। তাই নিয়ে ২৫ মে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি বাড়িতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হলো। এই প্রথম সরকার পরিচালিত প্রচারকেন্দ্র চালু হলো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক গান বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। তন্মধ্যে কাজী নজরুলের কোরাস (সমবেত) ‘দূর্গম গিরি কান্তার মরু’ গানটি উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় ।
আমরা মনে করি ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার প্রতিটি পঙক্তির আবেদন অনিঃশেষ, অফুরন্ত ও সময়োপযোগী। এ রচনার মর্ম বাণী বিশেষ কোনো দেশ, কোনো সময়, কোনো জাতির উদ্দেশ্যে উচ্চারিত ধ্বনি নয়, এ ধ্বনি অতীত, বর্তমান কিংবা অনাগত ভবিষ্যতের জন্যে। যতদিন মানুষে মানুষে হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা থাকবে, ততদিনই 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার' কবিতার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিঃশেষ হবে না। এই কবিতা রচনাকালে নিপীড়িত পরাধীন ভারতবাসীর ক্ষেত্রে যেমন প্রাসঙ্গিকতা ছিল তেমনি আজ এ কবিতার শতবর্ষপূর্তি কালেও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে এবং তারপরও থাকবে। অন্যের ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে এই গান সব সময়ই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এ রচনা আমাদের জাতীর চেতনার অংশ হয়ে ওঠেছে।
গ্রন্থপঞ্জি
১. নজরুল গীতি প্রসঙ্গ। করুনাময় গোস্বামী। বাংলা একাডেমি, ঢাকা। প্রথম পুনর্মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬
২. নজরুল তারিখ অভিধান । মাহবুবুল হক। বাংলা একাডেমি, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ, জুন ২০১০
৩. নজরুল-প্রতিভার স্বরূপ । আবদুল কাদির। নজরুল ইনস্টিটিউট। ঢাকা। প্রথম প্রকাশ ১৯৮৯
৩. নজরুল রচনাবলী । রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য (সম্পা.)। দ্বিতীয় খণ্ড। বাংলা একাডেমি। অক্টোবর ২০১৮
লেখক: নজরুল গবেষক ও কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা