images

শিল্প ও সাহিত্য

ভাটিবাংলার ধামাইল ও রাধারমণের আবির্ভাব দিবস

২৭ মে ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম

‘ভ্রমর কইও গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে’ বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে এই পঙক্তি শুধু একটি গানের অংশ নয়; এটি বাঙালির হৃদয়ের গভীরতম আবেগের প্রতিধ্বনি। ভাটিবাংলার নদী, হাওর, কুয়াশা, বর্ষা আর জনজীবনের অনুভূতি মিলেমিশে যে সংগীতধারার জন্ম দিয়েছে, রাধারমণ দত্ত তার অন্যতম রূপকার। তার গান শুধু শোনার বিষয় নয়, অনুভবের বিষয়। তার গান বাংলার সামষ্টিক স্মৃতি ও সংস্কৃতির এক অনিবার্য অংশ। এ গীতধারার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল গান ও নৃত্য।

রাধারমণ দত্ত ১৮৩৩ সালের ২৬ মে সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রাধামাধব দত্ত ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ ও বৈষ্ণব ভাবধারায় বিশ্বাসী। পারিবারিকভাবেই রাধারমণ দত্ত সংগীত, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি শাস্ত্রচর্চা, সাধুসঙ্গ প্রভৃতি লোকজ সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসেন। তার সৃষ্টিশীলতার ভেতরে একদিকে যেমন বৈষ্ণব ভাববাদ, অন্যদিকে তেমনি মাটির ঘ্রাণ ও মানুষের জীবনবাস্তবতা মিশে আছে।

প্রখ্যাত এই সংগীতকার প্রায় তিন হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছিলেন বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে; যদিও সংরক্ষিত গানের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তার গানে প্রেম, বিরহ, ভক্তি, মানবজীবনের অনিত্যতা, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান ও সামাজিক অনুভব গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে কেন্দ্র করে তিনি যে বিরহভাব নির্মাণ করেছিলেন, তা বাংলা লোকসংগীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তার গানে প্রেম কেবল পার্থিব নয়; তা আত্মা ও পরমাত্মার মিলনেরও প্রতীক। তিনি যখন বলেন, ‘কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া/অন্তরে তুষের অনল জ্বলে গইয়া গইয়া।’ তখন এ আকুতি নিছক ব্যক্তিগত কোনো বেদনা নয়; মানুষের চিরন্তন অন্তর্জ্বালার কাব্যিক প্রকাশ হয়ে ওঠে। রাধারমণ দত্তের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ভাষার সরলতা। তিনি জটিল অলংকারের আশ্রয় নেননি; বরং মানুষের মুখের ভাষাকেই শিল্পে পরিণত করেছেন। তার গানে সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক শব্দ, লোকজ উপমা ও গ্রামীণ জীবনের চিত্র এমনভাবে উঠে এসেছে যে তা শ্রোতার হৃদয়ের মণিকোঠায় সহজেই স্থান করে নেয়।

রাধারমণ দত্তের গান লোকসমাজের ধমণীতে প্রবাহিত হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো ‘ধামাইল’। ধামাইল মূলত সিলেট অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী নারীসমাজকেন্দ্রিক দেশজনৃত্য ও গীতধারা। ধারণা করা হয়, বৈষ্ণব কীর্তনের বৃত্তনৃত্য এবং লোকজ সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের সমন্বয়ে ধামাইলের উৎপত্তি। ‘ধামাইল’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মত রয়েছে। কেউ বলেন এটি ‘ধামাল’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ আনন্দোচ্ছ্বাসপূর্ণ নৃত্য; আবার কেউ মনে করেন এটি বৈষ্ণব ধর্মীয় আসরের বিশেষ নৃত্যরীতির বিবর্তিত রূপ। ধামাইল সাধারণত বৃত্তাকারে পরিবেশিত হয়। নারীরা হাততালি দিয়ে তাল মিলিয়ে ধীরলয়ে নৃত্য করেন এবং সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে থাকেন। এতে এক ধরনের সামষ্টিক ছন্দ ও আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়। ধামাইলের সুরে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি আছে গভীর বিষাদও। বিয়ে, গায়ে হলুদ, অন্নপ্রাশন, পূজা-পার্বণ কিংবা সামাজিক উৎসবে ধামাইল দীর্ঘদিন ধরে সিলেটি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। রাধারমণ দত্তের অসংখ্য গান ধামাইলের মাধ্যমে নতুন জীবন পেয়েছে। ‘শ্যামল বরণ রূপে মন নিলো রে’, আমার গলার হার খুলিয়া নিলো কে’, ‘প্রাণ সখিরে ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে’ এসব গান ধামাইলের আসরে এক অনন্য আবেগ সৃষ্টি করে। ধামাইলের সম্মিলিত নৃত্যভঙ্গি ও রাধারমণের সুর যেন একে অপরের পরিপূরক। তার গানের ভেতরে যে আবেগ ও দোলাচল আছে, ধামাইলের পদচারণা তা আরও দৃশ্যমান করে তোলে।

বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, ‘ধামাইল’ নারীদের সাংস্কৃতিক আত্মপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলার গ্রামীণ সমাজে যেখানে নারীদের প্রকাশের সুযোগ সীমিত; সেখানে ধামাইল হয়ে ওঠে তাদের অনুভূতি, প্রেম, অভিমান ও আনন্দ প্রকাশের সামাজিক মঞ্চ। নারীরা সম্মিলিতভাবে গান গেয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। ফলে ‘ধামাইল’ কেবল বিনোদন নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক সংহতি ও মানসিক মুক্তিরও মাধ্যম। সিলেট অঞ্চলের হাওরভিত্তিক জনজীবন ‘ধামাইল’ ও রাধারমণ দত্তের গানে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ হাওরের জলরাশি, নৌকার চলাচল, ‍কৃষিজীবন, বিচ্ছিন্নতা এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপন মানুষের আবেগকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। সে কারণেই তার গানে নদী, নৌকা, ভাটির হাওয়া, বৃষ্টি ও জল বিষয়ক রূপকের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। তার সংগীতে প্রকৃতি যেন জীবন্ত চরিত্র হয়ে ওঠে। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, রাধারমণ দত্তের গান বাংলা লোকসংগীতকে আধ্যাত্মিকতা ও নান্দনিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ উপহার দিয়েছে। তার গানের মধ্যে বৈষ্ণব পদাবলির প্রভাব থাকলেও তিনি কেবল ধর্মীয় ভাবনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ ও অস্তিত্ববোধকে অত্যন্ত মানবিকভাবে প্রকাশ করেছেন। ফলে তার গান শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

বর্তমান সময়ে ধামাইল শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়; ভারতের আসাম, ত্রিপুরা এবং প্রবাসী সিলেটি সম্প্রদায়ের মধ্যেও সমান জনপ্রিয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক লোকসংগীত আয়োজনে ধামাইল এখনও নিয়মিত পরিবেশিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে এটি বিশ্বসংস্কৃতির পরিসরেও পরিচিতি লাভ করেছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে ধামাইলের সুর মিশিয়ে নতুন উপস্থাপনার চেষ্টা করছেন, যদিও অনেকেই মনে করেন এর মূল লোকজ স্বর ও আবেগ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।

২০২৩ সালের ২৬ মে ‘ধামাইল’ নৃত্যের প্রবর্তক রাধারমণ দত্তের জন্মদিবস উপলক্ষে দিনটিকে ‘জাতীয় ধামাইল দিবস’ পালনের দাবি জানিয়ে সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ধামালি চুনারুঘাট’ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে ‘জাতীয় ধামাইল দিবস’ পালন করে। প্রতি বছরই সিলেটের বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ে ‘ রাধারমণ স্মরণ দিবস’ ও ‘জাতীয় ধামাইল দিবস’ পালন করে। ২০২৪ সাল থেকে ভারতের আসামের সম্মিলিত লোকমঞ্চ, শিলচর ‘আন্তর্জাতিক ধামাইল দিবস’ পালন করে। আজকের প্রযুুক্তিনির্ভর ও দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে লোকসংস্কৃতির অনেক উপাদান হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবু রাধারমণের গান ও ‘ধামাইল’ এখনও মানুষের হৃদয়ে টিকে আছে, কারণ এর ভেতরে আছে মাটির গন্ধ, মানুষের জীবন ও আত্মার সত্য। ধামাইলের বৃত্তে যখন নারীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন ‘প্রাণ সখিরে ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে’ তখন শত বছরের পুরোনো ভাটিবাংলা পুনরায় জীবন্ত হয়ে ওঠে।

রাধারমণ দত্তের সংগীত এবং ধামাইল বাংলার লোকঐতিহ্যের এমন এক সম্পদ, যা কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে শুধু একটি সংগীতধারাকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং বাংলার লোকজ আত্মা, ইতিহাস ও সামষ্টিক স্মৃতিকে রক্ষা করা।

লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।