জেলা প্রতিনিধি
২২ মার্চ ২০২২, ০২:০১ পিএম
মো. কামরুল হাসান (৩২)। বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার শিকারমঙ্গল গ্রামে। টাকার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে কাজ করার জন্য ঘুরেছেন বিভিন্ন দেশে। এরইমধ্যে জীবন থেকে চলে গেছে ১২টি বছর। দেশে ফেরার পর এক ইউটিউব ভিডিও বদলে দিয়েছে তার জীবন। বর্তমানে তিনি একজন সফল মাশরুম চাষি।
কামরুল হাসানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাবলম্বী হওয়ার জন্য কাজের জন্য ২০০৮ সালে চলে যান ভারতে সেখান থেকে নেপাল ও পরে ভুটানে। কিন্তু ভাগ্যদেবতা হয়তো অসন্তুষ্ট, দেখেননি সফলতার মুখ। ১২ বছর প্রবাসে কাটিয়ে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে শূন্য হাতেই ফিরে এসেছিলেন নিজ দেশে। লোকের কাছ থেকে ধার নিয়ে গ্রামে শুরু করেন পোল্ট্রি মুরগী পালন। এতেও অসফল তিনি। বেকার থাকায় আশেপাশের লোকের কাছ থেকে শুনতে হচ্ছিলো নানা রকম কটূকথা। অনেকটা ভেঙে পড়েন তিনি।
একদিন মোবাইলে একটি ইউটিউবে ভিডিও দেখছিলেন কামরুল, হঠাৎ তার সামনে আসে মাশরুম চাষের ভিডিও। ভিডিও দেখে তিনি জানতে পারেন ড্রিম মাশরুম সেন্টারের পরিচালক বাবুল হোসেনের সম্পর্কে। যোগাযোগ করে চলে যান মাগুরাতে ১০ দিনের ট্রেনিং নেন মাশরুম চাষের ওপরে। ফিরে আসেন গ্রামে, কিছু টাকা ধার নেন স্থানীয় এক লোকের কাছ থেকে। পরবর্তী মাগুরায় এক সঙ্গে ট্রেনিং করা এক বন্ধুর কাছ থেকে মাশরুমের ৫০ পিচ মাদার বাকিতে আনেন। সেই ৫০ পিচ মাদার থেকে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বাসায় বসেই উৎপাদন করেন বীজ।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে তার সেই পরিত্যক্ত মুরগীর খামারে শুরু করেন মাশরুম চাষ। ভাগ্য দেবতা প্রসন্ন হতে থাকে। ৪০ হাজার টাকায় ব্যয় করে মাশরুম চাষের জন্য কিনে আনেন সকল আনুষাঙ্গিক জিনিস। সঙ্গে মাদার থেকে বীজ তৈরি করার জন্য নিজেই বাসায় তৈরি করেন ল্যাব। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে তার খামারের পরিধি। এ পর্যন্ত মাশরুমে চাষে তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার টাকার মতো। তিনি তার মাশরুমের খামারে চাষ করে থাকেন ওয়েস্টার মাশরুম। বর্তমানে তার খামারে স্পন পদ্ধতিতে ২০০ প্যাকেট ও সিলিন্ডার পদ্ধতিতে ৩০০ প্যাকেট ওয়েস্টার মাশরুম চাষ করছেন। প্রতিদিন কামরুল হাসান তার খামার থেকে ৩ কেজি থেকে ৪ কেজি মাশরুম সংগ্রহ করেন। যা তিনি স্থানীয় বাজারে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি করেন। এখন তিনি স্বাবলম্বী।
আশেপাশের এলাকার অনেক যুবক এখন দারস্থ হচ্ছেন কামরুল হাসানের কাছে। বেকার যুবকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন কামরুল। বেকার যুবকরা আগ্রহী হয়ে উঠছেন মাশরুম চাষে। কামরুল তার সাধ্যমতো সবাইকে মাশরুম চাষ করার জন্য উদ্ভুদ্ধ করছেন। এরই মধ্যে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার বিভিন্ন প্রোগ্রামে গিয়ে সবাইকে মাশরুম চাষ করার জন্য প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিনি সকল বেকার যুবকদের মাশরুম চাষে অনুপ্রাণিত চলেছেন তাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য। নিজে থেকেই প্রতিনিয়ত তার এলাকার বেকার যুবকদের উৎসাহ দিচ্ছেন। এবং তাদের বোঝাচ্ছেন মাশরুম একটি লাভজনক ব্যবসা। বিজ্ঞানসম্মতভাবে মাশরুম চাষ করলে এখন বিক্রিতেও কোনো সমস্যা নেই। মাশরুমে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধি গুণ থাকায় উপজেলার অনেক পরিবার এখন মাশরুমকে নিয়মিত খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছেন। ফলে দিন দিন এর চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সরেজমিনে কালকিনি শিকারমঙ্গল এলাকায় কামরুলের মাশরুমের খামারে গিয়ে দেখা যায়, পুকুর পাড়ে তৈরি পুরাতন একটি দোচালা ঘরে ঝুলে আছে মাশরুমের অনেকগুলো পলিব্যাগ। কিছু পলিব্যাগ আবার মাচায় রাখা। পলিব্যাগের চারপাশের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে কিছুটা চালতা ফুলের মতো বের হয়ে আছে চকচকে সাদা মাশরুম। মাশরুমগুলো থোকায় থোকায় ঝুলছে। প্রতিটি থোকায় ১০ থেকে ১২টি রয়েছে মাশরুম। কিছু মাশরুম বের হওয়ার জন্য প্লাস্টিকের ছিদ্র দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। কামরুল হাসান তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র দেখে বুঝে, স্প্রে মেশিনের সাহায্যে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। একটু পরেই ছোট একটি ছুড়ির সাহায্যে একটি প্লাস্টিকের গামলায় তুলে নিচ্ছেন মাশরুম।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজ মোল্লা বলেন, ‘কামরুল যখন প্রথম মাশরুম চাষ শুরু করেন, আমরা জিনিসটাকে ভালো মনে করিনি। ভেবেছিলাম কি না কি নিয়ে আসছে। কামরুল এখন লাভের মুখ দেখছে। আর এখন আমরাও জানি মাশরুমের উপকারিতা সম্পর্কে।’
কামরুল হাসান বলেন, ‘বেকার যুবকরা যদি মাশরুম চাষে এগিয়ে আসে, তাহলে তারা নিজে স্বাবলম্বী হবে। এতে দেশের বেকারত্ব কমবে। সরকারের কাছে আমার একটাই চাওয়া সরকার যদি সুদমুক্ত কোনো ঋণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমি খামারটি আরও বড় পরিসরে করে বিভিন্ন জাতের মাশরুম চাষ করতে পারবো। পাশাপাশি খামার বড় হলে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।’
মাদারীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকা মেইলেকে বলেন, ‘দিন দিন ফসলি জমি কমে আসছে। চাষি ভাইয়েরা যাতে অল্প জায়গায় চাষ করে সবজির ঘাটতি পূরণ করতে পারে সেইজন্য মাশরুম চাষ একটি বিকল্প পদ্ধতি। এই চাষের জন্য আমাদের তেমন একটা জমির প্রয়োজন হয় না। একটি ছোট কুঁড়ে ঘর থেকে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ কেজি মাশরুম উৎপাদন করা সম্ভব। আমাদের তেমন একজন মাশরুম চাষি কামরুল হাসান। তার জন্য সব রকম সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। মাশরুম চাষে যে সকল চাষিরা এগিয়ে আসতে চায় তাদের ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’
টিবি