Dhaka Mail Logo

কৃষি ও পরিবেশ

‘বর্জ্যকে বোঝা নয়, সম্পদ ও অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করতে হবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনও মূলত ‘সংগ্রহ-পরিবহন-ডাম্পিং’ নির্ভর। এতে বিপুল বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, সম্পদ পুনরুদ্ধার ও জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগছে না। একই সঙ্গে উন্মুক্ত স্থানে, জলাভূমি ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশ দূষণ, মিথেন নিঃসরণ, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এ অবস্থায় বর্জ্যকে আর বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদ, শক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জীবন সদস্য ড. নাসির উদ্দীন খান।

রোববার (৮ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।  উপস্থাপনায় বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন, জেলা শহর ও পৌরসভাগুলোর জন্য একটি সমন্বিত, জলবায়ু-সহনশীল ও চক্রাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার রূপরেখা তুলে ধরা হয়।

বর্জ্য বিশেষজ্ঞ ড. নাসির উদ্দীন খান বলেন, বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন সমন্বিত, কম খরচের এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালনাযোগ্য সমাধান। বর্তমানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান পদ্ধতি ‘সংগ্রহ-পরিবহন-ডাম্পিং’ হওয়ায় বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান, জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পদ পুনরুদ্ধারের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। এর ফলে বিপুল বর্জ্য উন্মুক্ত স্থান, জলাভূমি ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে।

এ ধরনের ব্যবস্থার পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও রয়েছে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়। বর্জ্য থেকে মিথেন নিঃসরণ, নদী ও জলাশয় দূষণ, নদীর তলদেশ ভরাট, জলাবদ্ধতা ও বায়ুদূষণের পাশাপাশি ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন জনস্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে মূল্যবান নগরভূমির অপচয়, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে দেশ।

উপস্থাপনায় বলা হয়, গত এক দশকে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা, উদ্যোক্তা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু পাইলট প্রকল্প ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বড় অংশই ছিল বিচ্ছিন্ন, স্বল্পমেয়াদি ও সমন্বয়হীন। অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্যের ধরন, স্থানীয় চাহিদা ও বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে উল্লেখযোগ্য অর্থ ও সময় ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। দেশের নগর এলাকার প্রয়োজন, পরিসর ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশের জন্য কোন প্রযুক্তি বেশি উপযোগী—এমন প্রশ্নে উপস্থাপনায় দহন, গ্যাসীভবন, প্লাজমা পাইরোলাইসিস, বায়োগ্যাস এবং ল্যান্ডফিল প্রযুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়। এতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বায়োগ্যাসকে ‘অত্যন্ত উপযোগী’, অবশিষ্ট বর্জ্যের জন্য ল্যান্ডফিলকে ‘মাঝারি থেকে কম উপযোগী’, গ্যাসীভবনকে ‘কম উপযোগী’ এবং প্লাজমা পাইরোলাইসিসকে ‘অত্যন্ত কম উপযোগী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

উপস্থাপনায় বড় আকারের দহনভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের ক্ষেত্রে উচ্চ মূলধনী ব্যয়, বেশি বিদ্যুৎ শুল্ক, উন্নত নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জটিল বিদেশি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বিপরীতে, বায়োগ্যাস ও আরডিএফ (RDF) তুলনামূলক কম ব্যয়ে দেশীয় অর্থায়ন ও স্থানীয় দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশে বর্জ্যের মধ্যে জৈব উপাদানের পরিমাণ ও আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জৈব বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও কম্পোস্ট এবং অজৈব ও দাহ্য বর্জ্য থেকে আরডিএফ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বায়বীয় ও অবায়বীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

উপস্থাপনায় বলা হয়, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় উচ্চ বিদ্যুৎ শুল্কের ওপর নির্ভরতার বিপরীতে আরডিএফ ও বায়োগ্যাসভিত্তিক ব্যবস্থায় আরডিএফ জ্বালানি, কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস থেকে রাজস্ব অর্জনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আরডিএফকে সিমেন্ট কারখানার ভাটায়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং অন্যান্য শিল্পে যৌথভাবে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে বিকল্প জ্বালানির চাহিদা পূরণের সুযোগ রয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বর্তমান ‘সংগ্রহ-পরিবহন-ফেলে দেওয়া’ পদ্ধতি থেকে ‘পৃথকীকরণ-প্রক্রিয়াজাতকরণ-সম্পদ পুনরুদ্ধার’ ব্যবস্থায় যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ব্যবস্থার প্রথম ধাপ হবে উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ। এরপর পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুনরুদ্ধার, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস, দাহ্য বর্জ্য থেকে আরডিএফ এবং অবশিষ্ট বর্জ্যের জন্য নিরাপদ স্যানিটারি ল্যান্ডফিল গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ড. নাসির উদ্দীন খানের মতে, এর মূল লক্ষ্য শুধু বর্জ্য অপসারণ নয়; বরং ‘বর্জ্য বোঝা নয়, সম্পদ’—এই ধারণাকে বাস্তবায়ন করা। এর মাধ্যমে জৈব বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও কম্পোস্ট, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে বাজারমূল্যসম্পন্ন উপকরণ এবং আরডিএফ থেকে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য বিকল্প জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ও রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কার্বন ক্রেডিট থেকে অর্জিত অর্থও এসব প্রকল্পে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশব্যাপী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে সমন্বিত করতে একটি জাতীয় পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তথ্যভান্ডার তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জিআইএসভিত্তিক বর্জ্য উৎপাদনের ঘনত্বের মানচিত্র তৈরি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বর্জ্যের ধরন ও উপাদান বিশ্লেষণ, বিদ্যমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণিতে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের শ্রেণিভেদে উপযুক্ত সমন্বিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা মডেল নির্ধারণ এবং একটি জাতীয় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ও কার্যপরিচালনা সহায়কপুস্তিকা প্রণয়নেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা শহর ও পৌরসভার জন্য স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেল তৈরি করা সম্ভব হবে।

উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত কম খরচের, সহজ প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালনাযোগ্য। দেশীয় বিনিয়োগ ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে বর্জ্য থেকেই সম্পদ, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ড. নাসির উদ্দীন খানের বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, বর্জ্যকে শুধু ফেলে দেওয়ার উপাদান হিসেবে বিবেচনা না করে অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। ‘বর্জ্যকে আর বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য এটিকে সম্পদ, শক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা উচিত’—এই ধারণাকে সামনে রেখেই দেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার আহ্বান জানানো হয়।

আলোচনা সভায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এমএইচ/এএস