Dhaka Mail Logo

কৃষি ও পরিবেশ

জলবায়ু পরিবর্তন: বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ ৫ সুপারিশ বাপার

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২০ জুন ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনে প্রস্তাবিত বাজেটের শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ বরাদ্দ যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।পরিবেশবাদী সংগঠনটি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি অন্তত ৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের জন্য সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত বন্ড চালু করে তহবিল গঠন করা যেতে পারে বলেও প্রস্তাব দিয়েছে বাপা।

শনিবার (২০ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘পরিবেশ ও জলবায়ু খাত: ২০২৬-২৭ বাজেট বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে আর্থিক কাঠামো ও বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ পাঁচ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্যে বাপার সদস্য ফারহান হোসেন জয় বলেন, বাজেট হচ্ছে রাষ্ট্রের আলোকনির্দেশিকা। বাজেট থেকেই একটি সরকারের রাষ্ট্র বিনির্মাণের সদিচ্ছা প্রতিফলিত হয়। এই সরকারের আগের আমলেই আমরা দেখেছি পলিথিন ব্যান হতে। এই সরকারই আগেরবার বেবি ট্যাক্সির কালো ধোঁয়া থেকে ঢাকাকে মুক্ত করে সিএনজি মোটরে আনতে পেরেছিল। তাহলে এবারও নাগরিকদের ও পরিবেশের জন্য কাজ করবে এমন সমাধান আনতে পারবে এই আশা রাখি।

বরাদ্দের বৈপরীত্য নিয়ে সমালোচনা করে ফারহান বলেন, যেই রাজনৈতিক দল দলীয় ছত্রছায়ায় বালু উত্তোলনকে উৎসাহিত করে, সেই দলের সরকার-ই যখন নদীর ড্রেজিংয়ের হাজার কোটি টাকার বাজেট দেয়, জনগণের কাছে তা দ্বিমুখী আচরণ বলেই মনে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় ২২% বৃদ্ধি পেলেও, কঠোর জবাবদিহিতা ছাড়া এই বরাদ্দ কেবলই শুভঙ্করের ফাঁকি।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাষ্ট্রের নিজস্ব বাজেট ১০০ কোটিতে বছরের পর বছর আটকে থাকাও অত্যন্ত অপ্রতুল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সভাপতির বক্তব্যে বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, আমাদের গতানুগতিক আমলানির্ভর বাজেট পরিকল্পনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বছরের শেষপ্রান্তে এসে বাজেটের টাকা খরচের যে মহাউৎসব আমরা বিগত দিনগুলোতে দেখেছি, তার ফলে টাকা খরচের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনাই পরিলক্ষিত হয়েছে।

অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ বলেন, বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ দুর্নীতিমুক্ত ভাবে খরচ করতে হবে এবং পরিবেশের বাজেট করার আগে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করার দাবি জানাই।

বাপা সহসভাপতি অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, কার্বন ট্রেডিং কিয়োটো-প্রটোকলের মাধ্যমে বিক্রি করা সম্ভব হলেও বাংলাদেশ তা করতে ব্যর্থ। অথচ এই মার্কেটের শতকরা ৬০% ভাগ চায়না নিয়ে যাচ্ছে। সলিড ডিসপোজালগুলোকে পুরোপুরি কার্বন ট্রেডিংয়ের আওতায় আনা উচিত।

ফিরোজ আহমেদ বলেন, ফ্লাইওভার তৈরির মাধ্যমে শহরে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে; আন্ডারগ্রাউন্ড যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হলে এ বায়ু দূষণের মাত্রা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো। পয়ঃবর্জ্য ও শিল্প দূষণ আজ সুপেয় পানির উৎস বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এশিয়ার যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করছে।

বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে যে বরাদ্দ আসে তা যথাযথ খাতে বাস্তবায়ন করা হয় না, সেই খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যবহার হয়। বাজেট সবসময় মুখরোচক হয়ে থাকে, কিন্তু পরে তা অপচয় ও লোপাট করা হয়। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ময়লাযুক্ত কয়লা আমদানি বন্ধের কোনো উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি।

সহ-সভাপতি জাকির হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবির সুমন, জীবন সদস্য ড. এম এ আব্দুল ওহাব, পরিবেশকর্মী হাফিজুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, জবাবদিহিতাহীন এবং আমলাতান্ত্রিক উপায়ে তৈরি এই বাজেট দেশের পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। মেগা প্রজেক্টের নামে পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব বন্ধ করে প্রকৃত অর্থে সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলতে হবে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে উত্থাপিত অন্যান্য সুপারিশগুলো হলো-
কার্বন ট্যাক্স ও দূষণ মূল্য: উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী শিল্প ও লাক্সারি গাড়ি আমদানিতে বিশেষ কার্বন কর আরোপ করে সেই অর্থ পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যবহার করা। যেসকল শিল্প বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) চালায় না, তাদের ওপর কঠোর জরিমানা আরোপ করে সেই তহবিলে কেন্দ্রীয় শোধনাগার নির্মাণ।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: মহানগরগুলোর ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প গ্রহণ করে পরিবেশ রক্ষা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করা। প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্পে কর ছাড় দেওয়া এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ।

প্রযুক্তি ও গবেষণা: বাংলাদেশে ক্লাইমেট টেকনোলজি স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ ইনকিউবেশন সেন্টার ও সিড ফান্ড প্রদান করা। মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রকে শক্তিশালী করে নদীর গতিপথ ও বনভূমি দখল রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং করা।

উপকূলীয় সুরক্ষা ও ম্যানগ্রোভ: সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কৃত্রিম বাঁধের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করে সাইক্লোন থেকে রক্ষার প্রাকৃতিক দেওয়াল তৈরি করা।

এএম/ক.ম