জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২৭ জুলাই ২০২২, ১২:৩৮ পিএম
করোনা মহামারি, যুদ্ধ এবং বন্যা, সাইক্লোনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ধারা শুধু অব্যাহত রাখা নয়, তা আরও বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।
বুধবার (২৭ জুলাই) কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে এআইপি সম্মাননা ২০২০ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী।
বুধবার সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২০ সালের এআইপি পুরস্কার তুলে দেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। কৃষি সচিব মো. সায়েদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এসময় বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপ মন্ত্রী হাবিবুন নাহার, অতিরিক্ত সচিব ওয়াহিদা আক্তার। এসময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রথমবারের মতো সিআপির আদলে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, আবহমানকাল ধরে বাংলার কৃষক ছিল অন্তহীন শোষণ ও বঞ্চনার শিকার এবং নিপীড়িত ও অবহেলিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৈশোর-তরুণ বয়স থেকেই বাংলার কৃষকের দৈন্যদশা স্বচক্ষে দেখেছেন, যা তার কোমল হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তাই আমরা দেখি, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনজুড়ে কৃষক ও কৃষির উন্নয়ন ও কল্যাণ ভাবনা নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। আমরা দেখতে পাই, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরপরই বাংলার চিরদুঃখী ও নির্যাতিত কৃষক চাষির উন্নয়নে বিরাট উদ্যোগ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকেই তিনি চাষিদের সমস্ত বকেয়া খাজনার সুদ মওকুফ করে দিলেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনাও মওকুফ করার ঘোষণা দিলেন। জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করেন। পাকিস্তানি শাসন আমলে রুজু করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি দেন এবং তাদের সকল বকেয়া ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দেওয়া হয়। তাছাড়া, কৃষি এবং কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে ‘বঙ্গবন্ধু পুরস্কার তহবিল’ গঠন করেন।
মন্ত্রী বলেন, মানব ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়ের সূচনা করে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ‘বঙ্গবন্ধু পুরস্কার তহবিল’ থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দেওয়া হয় এবং এ কৃষি পুরস্কার প্রদান কার্যক্রমও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষিবান্ধব সরকার ২১ বছর পর দায়িত্ব নিয়ে পুনরায় ‘বঙ্গবন্ধু পুরস্কার তহবিল’ পুনর্গঠন করে এবং পুরস্কার প্রদানের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়।
ড. রাজ্জাক বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৭০-৭১ সালে যেখানে মোট খাদ্যশস্য (চাল, গম ও ভুট্টা) উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন, সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন (চাল, গম ও ভুট্টা) ৪ কোটি ৬০ লাখ মেট্রিকটনের উপরে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বে পরপর চতুর্থবার তৃতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, চলমান কোভিড-১৯ এর কারণে বিগত প্রায় তিন বছর ধরে সারা বিশ্ব এক চরম ক্রান্তিকাল ও সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এর সাথে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ। এসবের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরু হতেই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বার বার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক পদক্ষেপে গত বছরের (২০২০-২১) তুলনায় এ বছরও (২০২১-২২) সকল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছেন জানিয়ে ড. রাজ্জাক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গতবছরের তুলনায় এক লাখ ৬০ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে এবারের বোরো আবাদ হয়েছিল। কিন্তু হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও বোরোতে ২ কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে, আর বছরে মোট চালের উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি টনের বেশি। চাল, গম ও ভুট্রা মিলে গত বছর দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়েছিল ৪ কোটি ৪৩ লাখ টন, আর এবছর ২০ লাখ টন বেড়ে তা হয়েছে ৪ কোটি ৬৫ লাখ টন। এছাড়া, আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টন, শাকসবজি ২ কোটি ১৫ লাখ টন। পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে দুই বছরেই কৃষি মন্ত্রণালয় ১০ লাখ টন উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এবছর ৩৬ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আলু রফতানি ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষিপণ্যের রফতানি ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে ২টি রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। এছাড়া, আগামী ৩ বছরের মধ্যে ভোজ্য তেলের চাহিদার শতকরা ৪০ ভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করার জন্য নেওয়া হয়েছে সময়াবদ্ধ সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি।
কৃষি উন্নয়নের এই সাফল্য সারা পৃথিবীতে বহুলভাবে প্রশংসিত ও নন্দিত হচ্ছে। এই দৃষ্টান্তবহুল ও বিশ্বময় প্রশংসিত অর্জন সম্ভব হয়েছে- আমাদের জনবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দিকনির্দেশনায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মতৎপরতা এবং কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ ও কৃষক সমাজের নিবিড় কার্যক্রমের ফলে।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের কৃষির সাফল্যের অন্যতম কারিগর দেশের কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, উৎপাদনকারী, খামারি. প্রক্রিয়াজাতকারী, রফতানিকারকসহ কৃষির সাথে সম্পৃক্তদেরকে প্রতি বৎসর সম্মাননা জানানোর জন্য এআইপি একটি মহৎ উদ্যোগ। কৃষকদের সম্মান জানানোর একটি নতুন উদাহরণ। এআইপি সম্মাননা প্রবর্তন কৃষিখাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এর ফলে কৃষি পেশার মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে।
উপ মন্ত্রী হাবিবুন নাহার, মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো আমাদের এই দুটি মন্ত্রণালয়। সারা বিশ্বে খাদ্য নিয়ে নানা সংকটের কথা বলা হলেও আমাদের দেশ বেশ ভালো অবস্থানে আছে। সবুজায়নে কৃষি বিভাগ আমাদের পাশে আছেন। একটি রাস্তা মাইলের পর মাইল যাবে আমরা যেন চেষ্টা করি গাছগুলো না কেটে রাস্তাগুলো করার।
সম্মাননা পেয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত নুরুন্নাহার বেগম বলেন, কৃষক বড় মুক্তিযুদ্ধা। কৃষি করে অনেক সম্মান পাওয়া যায়। মাটিকে ঘুষ দিতে হয় না, মাটি আমাদের সাথে কথা বলে। আমাদের ভিক্ষা চাইতে হবে না, আমাদের বল আছে। আমরা খাদ্য নিরাপত্তায় কাজ করছি। দু হাজার টাকা থেকে পরিশ্রম করে এখানে এসেছি। ৫০ বিঘা জমি, আড়াইশ গরু আছে খামারে। আমি স্কুলের গন্ডি পেরুতে পারি নাই তবে তিন ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি। আমি আমার সন্তানদের বলি চাকরি করো আমার খামারে, সাহায্য করো, আমি বেতন দেবো।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ, আমাদের কিছু লাগবে না, শুধু খেয়াল রাখবেন। ১৩ জন যে এআইপি হলাম আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটু সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন।
সম্মাননা প্রাপ্ত মো. সামছুদ্দিন (কালু) অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এটি দেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। আমাদের মতো কৃষকদের এমন সম্মান দিলেন সত্যি আমরা কৃতজ্ঞ।
তিনি বলেন, খামারে শিল্পের মতো বিদ্যুৎ বিল করা হয়। কৃষিতে অনেক ভর্তুকি দিচ্ছেন এই বিষয়টি একটু দেখবেন। আমাদের ফার্মের জমির খাজনা কমানো দরকার। কৃষকরা থাকতে এদেশে খাদ্যের সংকট হবে না বলেন তিনি।
ডব্লিউএইচ/এএস