images

কৃষি ও পরিবেশ

মেগা প্রকল্প নয়, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা চায় আইপিডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:১১ পিএম

দেশের নগর সংকট মোকাবিলায় ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে কার্যকর, ব্যয়সাশ্রয়ী এবং সুশাসননির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, সেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো গেলে দেশের নগরগুলোকে ধীরে ধীরে বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।
 
শনিবার (১৪ মার্চ) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আইপিডি জানায়, যানজট, জলজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নাগরিক সেবার সংকট, খেলার মাঠ ও সবুজ এলাকার ঘাটতি এবং পরিবেশ দূষণের কারণে ক্রমশ অবাসযোগ্য হয়ে উঠছে দেশের অনেক নগর। রাজধানী ঢাকা ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম অবাসযোগ্য নগর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একই ধরনের চাপে রয়েছে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লাসহ দ্রুত বিস্তৃত অন্যান্য নগরও।
 
আইপিডির মতে, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, দুর্বল সেবা ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে নগর সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে নগরগুলোকে বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। 
 
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আইপিডির পক্ষ থেকে নিচের প্রস্তাবনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে—
 
১) সবার আগে জরুরি ভিত্তিতে কমিউনিটি ও নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে এলাকাভিত্তিক নগর সমস্যা চিহ্নিত করা এবং ব্যয়সাশ্রয়ী ও সহজসাধ্য সমাধান নির্ধারণ করা।
 
২) নির্বাচিত মেয়রের বদলে সরকার সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বসালেও সিটি করপোরেশনগুলোতে কাউন্সিলর না থাকায় নগরবাসীর ভোগান্তি কমবে না। আগের ছয়টি সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি সরকার নতুন করে আরও পাঁচটি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। প্রশাসক দিয়ে নগরের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। 

মূলত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সেবা দেওয়া হয়। অতি দ্রুত নির্বাচন না হলে কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে। ফলে অনতিবিলম্বে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নগর এলাকার সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগে নগর সমস্যা সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

৩) নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে টেকসই, কার্যকর ও সাশ্রয়ী করতে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। কেবল বড় বড় ফ্লাইওভার বা মেগা অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য গণপরিবহনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ, মিনিবাস, রিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের সঙ্গে সুশৃঙ্খল সমন্বয় এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। নগরের রাস্তা শুধু যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য নয়, বরং মানুষের নিরাপদ চলাচলের উপযোগী হতে হবে। 

রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য শহরে বহুমাত্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে মেট্রোরেল, মনোরেল, লাইট র‍্যাপিড ট্রানজিট (এলআরটি) ও কমিউটার ট্রেনের পাশাপাশি বাসভিত্তিক বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) এবং আধুনিক বাস ও মিনিবাস সেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাস সার্ভিসকে ঢেলে সাজাতে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে জলপথ ও রেলপথের সম্ভাবনাকেও নগর পরিবহন ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।

৪) নগর এলাকার ফুটপাতগুলোকে হাঁটার উপযোগী করতে পরিকল্পনামাফিক অবৈধ দখল, হকার ও দোকানপাট সরিয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সত্যিকারভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ফ্যামিলি কার্ড, সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি হকার ও রাস্তা দখলের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক, প্রভাবশালী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণের মাধ্যমে বৈধ হকারদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

৫) নগরের হারিয়ে যাওয়া খাল ও নদীগুলো পুনরুদ্ধার করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করা জরুরি। পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের খাল খনন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দখলদারদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে, যাদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তাই খাল পুনরুদ্ধারের মতো উদ্যোগ সফল করতে বলিষ্ঠ রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য।
 
৬) নগরের বর্জ্য সমস্যার সমাধানে সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার জন্য সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। খাল, সড়কের পাশে ও উন্মুক্ত জায়গায় বর্জ্য ফেলা বন্ধে জরুরি নির্দেশনা ও মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম চালু করতে হবে। প্রধান ল্যান্ডফিল সাইটগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে তাৎক্ষণিক সংস্কার পরিকল্পনা নিতে হবে। পাশাপাশি জৈব বর্জ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্য উৎসে পৃথকীকরণের উদ্যোগের পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং জৈব বর্জ্যকে কম্পোস্টে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

৭) এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠ, পার্ক ও বিনোদন সুবিধা তৈরির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। যে সব ওয়ার্ড বা এলাকায় একেবারেই খেলার মাঠ নেই, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। একই সঙ্গে ক্লাব বা বিভিন্ন গোষ্ঠীর অবৈধ দখলে থাকা মাঠগুলো দ্রুত এলাকাবাসীর ব্যবহারের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

৮) বর্তমানে সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে যে তীব্র সমন্বয়হীনতা রয়েছে, তা উন্নয়নের সুফলকে বাধাগ্রস্ত করছে। এসব সংস্থার মধ্যে জবাবদিহিমূলক ও তথ্যনির্ভর একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানে শুধু বড় বাজেটের মেগা প্রকল্প নয়; প্রকৃত উন্নয়ন হলো পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

৯) নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অপরাধ দমনে দ্রুত বিশেষায়িত পরিকল্পনা আদালত গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান পরিবেশ আদালতকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং আইনের প্রয়োগে দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়।

১০) পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহার–সংক্রান্ত আইনগুলোকে যুগোপযোগীভাবে সংস্কার করে পরিবেশ ধ্বংস, দখল এবং দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষত দূষণজনিত অপরাধের জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তা কার্যকরভাবে আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে আইন ভঙ্গের প্রবণতা কমে আসে।

১১) দেশের উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িত ব্যবসায়ী, শিল্পগোষ্ঠী ও অন্যান্য স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব বন্ধ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। মেগা, বিশেষ ও উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নির্বাচন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থা, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা করপোরেট স্বার্থের অযাচিত প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপযোগিতা, জনকল্যাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়ন যেন কেবল প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার মাধ্যম না হয়ে জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করে—এমন নীতিগত অবস্থান স্পষ্টভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

১২) নগর উন্নয়ন কার্যক্রমে সব ধরনের দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নগর উন্নয়নসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তথ্যপ্রকাশ ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশের নগর এলাকাগুলোকে উন্নত ও বাসযোগ্য করে তোলার আহ্বান জানিয়েছে আইপিডি।
 
এএইচ/ক.ম