images

কৃষি ও পরিবেশ

দেশের রাজনীতিতে দরকার ‘সারভাইভাল ম্যানিফেস্টো’: ড. কামরুজ্জামান

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, ব্রিজ, ফ্লাইওভার বা মেট্রোর প্রতিশ্রুতি নয়—রাজনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত মানুষ আদৌ নিরাপদে বাঁচতে পারছে কি না। উন্নয়নের নামে যদি নাগরিক জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত অধিকার উপেক্ষিত থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন।
 
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে পরিবেশ, রাজনীতি ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. কামরুজ্জামান এসব বলেন। 
 
ড. কামরুজ্জামান বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি ‘সারভাইভাল ম্যানিফেস্টো’, যেখানে উন্নয়নের আগে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
 
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ড. কামরুজ্জামান বলেন, রাজধানীর বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে সপরিবারে বেঁচে ফেরার ঘটনা তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তার মতে, ঢাকা শহর আজ কার্যত একটি ‘মৃত্যুকূপে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পর্যায়ে চরম অবহেলা রয়েছে।
 
এই পরিবেশ বিজ্ঞানী বলেন, নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত করার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট। গণভবনে বসবাসকারী মানুষ এবং কড়াইল বস্তির বাসিন্দারা একই দূষিত বাতাস গ্রহণ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বৈষম্যহীন দূষণের দায় কোনোভাবেই রাজনীতি এড়িয়ে যেতে পারে না।
 
ঢাকার নগর বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে ড. কামরুজ্জামান বলেন, এমন একটি শহরে আমরা বাস করছি যেখানে ফুটপাতে নিরাপদে হাঁটার সুযোগ নেই। মাথার ওপর ঝুলে থাকে নির্মাণাধীন ভবনের ইট, আর পায়ের নিচে থাকে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। এই অনিরাপদ পরিস্থিতিকে উন্নয়ন বলা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
 
বিগত বিভিন্ন সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে এই গবেষক বলেন, একাধিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও সাধারণ মানুষের নিরাপদ বসবাস ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কখনোই অগ্রাধিকার পায়নি। তিনি ‘অর্নামেন্টাল ডেভলপমেন্ট’ বা প্রদর্শনমূলক উন্নয়নের সমালোচনা করে বলেন, ফ্লাইওভার ও মেট্রোর ভিড়ে শহরের খোলা জায়গা, নির্মল পরিবেশ ও নাগরিক স্বস্তি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
 
পরিবেশভিত্তিক প্রকল্পে দুর্নীতি বেশি হওয়ার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, এসব প্রকল্পে নেওয়া ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়, অথচ প্রকৃত সুফল তারা পায় না।
 
আগামী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সামনে রেখে ড. কামরুজ্জামান একটি ‘গ্রিন ক্লিন ম্যানিফেস্টো’ বা সবুজ ইশতেহারের দাবি জানান। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের বক্তব্য আবেগনির্ভর নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। বড় কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়ার আগে বাধ্যতামূলকভাবে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হবে।

খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া প্রসঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন, শুধু ক্যান্সার হাসপাতাল বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে তা একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থারই প্রতিফলন। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা ভোট চাইতে আসবেন, তাদের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে পাঁচটি বিষয়ে অঙ্গীকার আদায় করতে হবে—শব্দদূষণমুক্ত এলাকা, যানজট নিরসন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান।
 
ড. কামরুজ্জামান বলেন, পরিবেশ দূষণ কেবল প্রাকৃতিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি একটি রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের প্রধান অঙ্গীকার হতে হবে একটি ‘সবুজ বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা। পরিবেশগত নিরাপত্তার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি যারা দিতে পারবে, শেষ পর্যন্ত জনগণ তাদেরই পাশে দাঁড়াবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
 
এএইচ/ক.ম