বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিপর্যয় মোকাবিলায় জাতিসংঘের উদ্যোগে কনফারেন্স অব দ্য কার্টিজ- কপ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘সবাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কথা বললেও জলবায়ু পরিবর্তনের রূপরেখা সম্মেলনে (ইউএনএফসিসিসি) গণতন্ত্র নেই।’
বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ-এর সংক্ষিপ্ত রূপ কপ। এটি বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিপর্যয় মোকাবিলায় জাতিসংঘের একটি উদ্যোগ। ১৯৯৫ সালে কপের প্রথম সম্মেলন হয়। সবশেষ গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে কপের ২৬তম সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আগামী ৬-১৮ নভেম্বর মিশরে এর ২৭তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সম্মেলনকে সামনে রেখে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু নিয়ে কাজ করেন এমন একাধিক সংগঠনের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আরও পড়ুন: পরিবেশ দূষণে বছরে মারা যাচ্ছে ৩২ শতাংশ মানুষ
অনুষ্ঠানে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে না বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিচ্ছে। অনেকেই বলেন- এর আগের সম্মেলনগুলো থেকে বাংলাদেশ বা অন্যান্য দেশ কি পেয়েছে। কিন্তু এখানে সেই বিষয়টি হলো দরকষাকষি কীভাবে হবে। যদি এটা ভালোভাবে করা না যায় তাহলে আমরা যে প্রত্যাশা করি তা পাব না।
কপ সম্মেলনের অতীতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, এখানে মাইনাস রুল ৪২ একটি বিষয় আছে। যেখানে বলা আছে, আলোচনা করে সবাই ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। যদি সমঝোতা না হয় তাহলে ভোট নেওয়ার কথাও বলা আছে। কিন্তু আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। অথচ মূল চুক্তিতেও ভোটের কথা বলা আছে।
সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার জটিলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭টি দেশ এখানে সদস্য। এখানে বলা আছে একটি শব্দ বা সেমিকোলনের যদি কেউ বিরোধিতা করে তাহলে হবে না। প্রত্যেকবার এমনটা হয়। এটা কেমন হলো না? এখন জরুরি অবস্থা, তখন যদি কেউ বিরোধিতা করে তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এ জন্য আমি বলি সবাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কথা বললেও জলবায়ু পরিবর্তনের রূপরেখা সম্মেলনে (ইউএনএফসিসিসি) গণতন্ত্র নেই। একটা বা দুইটা দেশ পুরো প্রক্রিয়া জিম্মি করে রেখেছে।
এ সময় কপ-২৭ সম্মেলনে বাংলাদেশ নিজেদের জায়গা থেকে শক্ত অবস্থান নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবে বলেও জানান সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী।
আরও পড়ুন: ‘জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষির উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে’
বিগত বছরের সম্মেলনে সময়ক্ষেপণ করার অভিযোগ তুলে সাবের চৌধুরী বলেন, ‘বিগত বছরে কি হয় একটি নাটক, ড্রামা হয়। গভীর রাত পর্যন্ত দরকষাকষি হচ্ছে। কপ শেষ হয়ে যাচ্ছে, আবার আরও একদিন চলবে। তখন কী হয়, অনেক দেশের প্রতিনিধিরা থাকে না। এখন যদি দেখা যায় ১৮ তারিখের জায়গায় ২০ তারিখ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়, তখন অনেক দেশের প্রতিনিধিরা থাকবে না। দেখা গেল বাংলাদেশও থাকবে না। আমরা তো টিকিটে বুক করে চলে আসব। পরে যে কয় দেশের লোক থাকবে তাদের নিয়ে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বলা হয় এটা কপ-২৭ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত তাহলে তো হবে না।’
এমন অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বক্তব্য হবে ১৮ তারিখের মধ্যে যেসব সিদ্ধান্ত হবে সেটার সঙ্গে বাংলাদেশ আছে। এরপর যদি কোনো সিদ্ধান্ত হয় তাহলে তা পরবর্তীতে কপ-২৮ সম্মেলনে সংশোধন করা হবে।’
সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা কি কপ বা এমন সংস্থার দিকে তাকিয়ে থাকব, না নিজস্ব ফান্ড থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় খরচ করব? সেটা ভাবতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক ফান্ডিং থেকে কিছু হবে না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে হওয়া উচিত বলেও মনে করেন এই সংসদ সদস্য।
দুর্ভিক্ষ নিয়ে সরকার প্রধানের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংকট যেহেতু আসছে তখন নেতৃত্বের কোয়ালিটি দেখা দরকার। আমাদের জন্য সেটা স্বস্তির কারণ। যিনি রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্বে আছেন তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় আছেন, তিনি বিষয়গুলো ভালো বোঝেন।
আরও পড়ুন: জলবায়ু পরিবর্তন সভ্যতার অস্তিত্ব হুমকিতে ফেলেছে: পরিবেশমন্ত্রী
অনুষ্ঠানে অন্য বক্তারা বলেন, উন্নত দেশগুলোর কর্মকাণ্ড, উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে অনেক সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোটি মানুষকে বস্তুচ্যুত হতে হবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন গরিব মানুষরা। এছাড়াও নারী ও যুবকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এর প্রভাবে। শুধু তাই নয়, আমাদের বার্ষিক বড় একটি টাকা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় খরচ করতে হচ্ছে।
বক্তারা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলা এখন জীবন বাঁচানোর জন্য, পরবর্তী প্রজন্মকে নিরাপদে রাখতে অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ সময় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘বড় বড় দেশগুলো যুদ্ধের জন্য বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন টাকা খরচ করছে। যে যুদ্ধের জন্য দুনিয়া গরদ করার সম্ভাবনা আছে। অথচ যেটার জন্য টাকা দিলে পৃথিবী বাঁচবে সেখানে তারা টাকা দেবে না। ইলন মাস্ক বিপুল টাকা খরচ করে টুইটার কিনেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কিছু করবে না।’
বিইউ/আইএইচ

