কৃষকের স্বার্থ রক্ষাকে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেছেন, কৃষি খাতে যে কোনো ধরনের নীতি ও প্রকল্প নির্ধারণে প্রথম লক্ষ্য হবে কৃষকের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ এবং দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি—এসব উদ্যোগই দেশের টেকসই কৃষি অর্থনীতি গড়ে তোলার মূল ভিত্তি।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’-এর উদ্বোধনী সেশনের ‘কৃষির রূপান্তর: দেশীয় উপযোগী কৃষিযন্ত্র ও কৃষিপণ্য রপ্তানি চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন কৃষি সচিব। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।
কৃষি সচিব বলেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে পেঁয়াজ ও আদা আমদানির প্রয়োজন হবে না। নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানোর ফলে শুধু গত এক বছরেই চার হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় হয়েছে, যা প্রকল্পের অপচয় ও দুর্নীতি কমিয়ে কৃষকের কল্যাণে ব্যয় করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা ছাড়া কৃষকবান্ধব কৃষি অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। দেশের কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
কৃষির আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করতে আগামী ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই এর চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হবে বলে জানান কৃষি সচিব। তিনি বলেন, সারের খরচ কমাতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে চলতি বছরেই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প থেকে ৬০০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে, ২০ কোটি টাকা দিয়ে প্রকল্প শেষ করা হয়েছে এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ২৫০০ কোটি টাকা ফেরত এসেছে। এভাবে গত বছর মোট চার হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় হয়েছে।
সচিব বলেন, সবজির দাম ১০০ টাকা হলে সাধারণ মানুষ গ্রহণ করলেও পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা হলেই সমালোচনা হয়। কৃষককে পেঁয়াজের ন্যায্য দাম দেওয়া কি উচিত নয়? আগামী তিন বছরের মধ্যে আদা ও পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। আলুর দাম কমে কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনাকে তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন।
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বৈশ্বিক এগ্রো প্রসেসিং বাজার ৪ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও বাংলাদেশের অংশ মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার। মান ও ভ্যারাইটির ঘাটতি বড় সমস্যা। ৪০০ প্রতিষ্ঠান থাকলেও সবাই আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারে না। রফতানিতে ১৮ দফতরের অনুমতির জটিলতাসময় বাড়ায়, তাই ওয়ান স্টপ সার্ভিস জরুরি। কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাব সংকট ও বিএসটিআই মান আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য না হওয়াও বড় বাধা। তিনি গ্রাম পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, গত পাঁচ বছরে আম রপ্তানি তিন গুণ বেড়েছে এবং এই সময়ে আম আমদানি শূন্য হয়েছে। বর্তমানে ৩৮টি দেশে আম রপ্তানি হচ্ছে, সবচেয়ে বেশি যুক্তরাজ্যে। ইউরোপের বাজার দখলের বড় সুযোগ রয়েছে। তবে বিমান ভাড়া বেশি হওয়া এবং কার্গোতে জায়গা না পাওয়ায় রপ্তানি বাড়াতে সমস্যা হচ্ছে। কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিমানে নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) প্রকল্প পরিচালক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম মূল প্রবন্ধে বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ কৃষিযন্ত্র উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা ও জাপানের সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে মানসম্মত কৃষিযন্ত্র তৈরির সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, যা ব্যয় কমানো, সময় বাঁচানো ও নতুন শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। ব্রি কৃষিযন্ত্র আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
ব্রি–এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দুরুল হুদা বলেন, দেশে আধুনিক কৃষিযন্ত্র তৈরির বড় বাধা হলো লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের দুর্বলতা। স্বাধীনতার পরও দেশে কোনো রাষ্ট্রীয় ইঞ্জিন কারখানা নেই, পূর্বের কারখানাগুলোও টিকিয়ে রাখা যায়নি। ফলে কম্বাইন হারভেস্টার বা রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মতো আধুনিক যন্ত্র ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ হিসেবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পিকেএসএফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়; কৃষিকে লাভজনক, মর্যাদাপূর্ণ ও শিক্ষিত পেশায় পরিণত করাই লক্ষ্য। পিকেএসএফের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করে, যার ৪০ শতাংশ কৃষিখাতে যায়। দেশে মোট কৃষি অর্থায়নের ৮৫ শতাংশই এমএফআই খাত থেকে আসে, যা বর্তমানে কৃষি উন্নয়নের বড় স্তম্ভ।
ব্রি মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, ধানভিত্তিক গবেষণা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি। স্বাধীনতার পর যেখানে হেক্টরপ্রতি দেড়–দুই টন ধান উৎপাদন হতো, বর্তমানে আধুনিক জাত ও প্রযুক্তির ফলে অনেক জায়গায় ৮–১০ টন পর্যন্ত হয়। হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনে জোর দেওয়া হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই গড় উৎপাদন ১০ টনের বেশি হবে।
বিএজেএফ সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন বলেন, কৃষক ও কৃষির সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে দীর্ঘমেয়াদি ও স্পষ্ট কৃষিনীতি থাকা উচিত। কৃষিকে টেকসই করতে রাজনীতির সঙ্গে দৃঢ় সংযোগ তৈরি করাই এই সম্মেলনের লক্ষ্য।
এএইচ/ক.ম

