বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

নারীর ক্ষমতায়নে সমান সম্পত্তির অধিকার জরুরি: মহিলা পরিষদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

নারীর ক্ষমতায়নে সমান সম্পত্তির অধিকার জরুরি: মহিলা পরিষদ
ছবি: সংগৃহীত

নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন ও সমতা নিশ্চিত করতে সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।  সংগঠনটি বলেছে, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তির সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। তাই উত্তরাধিকারসহ সম্পদ-সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত না করে শুধু সামাজিক সচেতনতা বা নীতিকথার মাধ্যমে নারীর পূর্ণ সমানাধিকার অর্জন সম্ভব নয়।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক সিডও দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব কথা বলা হয়। 

মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহিলা পরিষদের আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সদস্য লুনা নূর। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নারীরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উত্তরাধিকার ও পরিবারকেন্দ্রিক সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। 

বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনের কারণে অনেক নারী নিজের অর্জিত কিংবা পারিবারিক সম্পদ থেকেও বঞ্চিত হন। নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা আধুনিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

প্রবন্ধে বলা হয়, জমি, বাড়ি বা অন্যান্য সম্পদে মালিকানা থাকলে নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমে। নিজের নামে সম্পত্তি থাকলে পরিবার ও সমাজে নারীর কথা বলার সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে। 

অন্যদিকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীরা অনেক সময় পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা সহ্য করতে বাধ্য হন। কারণ, তাদের নিজস্ব আশ্রয় বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকে না।

বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নারীর অবদান বাড়লেও সম্পত্তির মালিকানার ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। 

বিশেষ করে কৃষিতে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা বাড়লেও জমির ওপর তাদের অধিকার প্রায় নেই বললেই চলে। খাসজমি বিতরণের নীতিমালায় স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে জমি দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কাগজে-কলমে নারীর নামে বা যৌথ নামে জমি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এর নিয়ন্ত্রণ নারীর হাতে থাকে না। সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর কারণে নিজের নামে থাকা সম্পত্তি নিয়েও অনেক নারী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ফলে শুধু সম্পত্তির কাগজে নারীর নাম থাকা যথেষ্ট নয়, সম্পত্তির ওপর তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির মালিকানা না থাকায় সংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানানো হয়। স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা না থাকায় ব্যাংক অনেক সময় নারী উদ্যোক্তাদের বড় অংকের ঋণ দিতে চায় না। ফলে মূলধারার ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে অনেকে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সীমিত পুঁজির কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারীর বড় বা টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।

সিডও সনদের প্রসঙ্গ তুলে প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিডও সনদে অনুস্বাক্ষর করে। শুরুতে কয়েকটি ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করা হলেও পরবর্তীতে দুটি ধারা, ২ এবং ১৬(১)(গ)-এ সংরক্ষণ বহাল রাখা হয়। ২ নম্বর ধারায় নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর ১৬(১)(গ) ধারায় বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এসব ধারার সংরক্ষণ প্রত্যাহার এবং বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন পরিবর্তনের দাবি জানানো হচ্ছে। ২০১৬ সালে সিডও কমিটিও বাংলাদেশের অষ্টম সাময়িক প্রতিবেদনের ওপর পর্যবেক্ষণে ২ ও ১৬(১)(গ) ধারা থেকে সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার তাগিদ দেয়। একই সঙ্গে সব ধর্মের নারীর জন্য সমঅধিকার নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরুর সুপারিশ করা হয়।

মহিলা পরিষদ সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে আইনগত ও সাংবিধানিক সংস্কার, বিবাহিত জীবনে অর্জিত সম্পত্তি ও খাসজমিতে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানা নিশ্চিত করা, নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

মতবিনিময় সভায় উইমেন ফর উইমেনের সভাপতি ও দীপ্ত ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া কে হাসান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর চন্দন লাহিড়ী এবং উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুন নাহার মিষ্টি বক্তব্য দেন।

মুক্ত আলোচনায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম এনালিস্ট ও ইউনিট ম্যানেজার তপতী সাহা, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং মহিলা পরিষদের আন্তর্জাতিক উপপরিষদের সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. সিউতি সবুর বক্তব্য দেন।

এএইচ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর