শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

অক্টোবরে বৃষ্টি কমবে, তবু কেন ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

অক্টোবরে বৃষ্টি কমবে, তবু কেন ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা
চলতি অক্টোবর মাসে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ছবি- সংগৃহীত

অক্টোবরের শুরুতেই বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। যদিও পুরো মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। আবার এই মাসে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলছে সংস্থাটি।

অক্টোবর মাসের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এ মাসে দুই থেকে তিনটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।

পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, অক্টোবরের প্রথমার্ধের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নিতে পারে। আর দ্বিতীয়ার্ধে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে পারে।

এ ছাড়া, এ মাসে দেশে তিন থেকে চার দিন বজ্রঝড় হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। সেইসঙ্গে, মাসের প্রথমার্ধের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নিতে পারে। এরপর বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসার পাশাপাশি মাসের শেষ দিকে তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে কমতে পারে বলেও জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে বৃষ্টি কেন হচ্ছে? এই বৃষ্টি আর কতদিন চলতে পারে? আর বৃষ্টির পরিমাণ কমে আসার পূর্বাভাসের মধ্যেই কেন ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে?

চলতি অক্টোবর মাসে বৃষ্টি কমার পূর্বাভাস দিলেও একটি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ছবি- সংগৃহীত
চলতি অক্টোবর মাসে বৃষ্টি কমার পূর্বাভাস দিলেও একটি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ছবি- সংগৃহীত

বৃষ্টি কেন হচ্ছে, চলবে কতদিন?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অক্টোবর হলো বর্ষা শেষ হয়ে শুষ্ক মৌসুম শুরুর সময়। এ সময় বাংলাদেশ থেকে মৌসুমি বায়ু ধীরে ধীরে বিদায় নিতে শুরু করে এবং শীতের আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত পশ্চিমা বায়ু বা ওয়েস্টার্লির প্রভাব বাড়তে থাকে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির।

তিনি বলেন, সাধারণত অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে মৌসুমি বায়ু বিদায় নিতে শুরু করে। তবে এবার এখনো মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ রয়েছে।

সম্প্রতি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কাছাকাছি এলাকায় একটি সুস্পষ্ট লঘুচাপ পরে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছিল। এর কারণে মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়।

ওই নিম্নচাপ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলেও মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে পশ্চিমা বায়ুও ধীরে ধীরে বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

বিগত মাসগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ছবি- সংগৃহীত
বিগত মাসগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ছবি- সংগৃহীত

আবহাওয়াবিদ কবির বলেন, ‘মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ চলে গেলে পশ্চিমা বায়ু আসবে এবং আসার পর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে... অর্থাৎ, এই দু'টোই এখন জায়গা দখলের চেষ্টা করছে। আর এই কারণে এখন মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ থাকলেও সেটা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এর সঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে জলীয় বাষ্প আসছে। এগুলোর কারণে বিভিন্ন জায়গায় মেঘ তৈরি হচ্ছে এবং বৃষ্টি হচ্ছে।’

তার হিসাবে, এমন পরিস্থিতি আরও চার থেকে পাঁচ দিন থাকতে পারে এবং এই সময়ের মাঝে দেশের পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকবে। বিশেষ করে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

এ সময় রংপুর ও রাজশাহী তুলনামূলকভাবে শুষ্ক থাকতে পারে। তবে পরে রংপুর ও রাজশাহীতেও এক-দুই দিনের জন্য বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে। এরপরই সারাদেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অনেকটা কমে আসবে।

এই আবহাওয়াবিদ বলেন, ‘অক্টোবরের ১০ তারিখের পর থেকেই বৃষ্টি কমবে। তখন তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ বৃষ্টি কমলেও সূর্য এখনো খুব বেশি দক্ষিণে সরে যায়নি। তবে অক্টোবরের শেষ দিকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।’

তার মতে, এবার শীতের শুরুতে তাপমাত্রা অন্য বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এল নিনোর কারণে এ বছর বিশ্বব্যাপী ওয়ার্ম উইন্টার হবে, মানে টেম্পারেচার কম থাকবে না। অন্যান্য বছর যেমন বৃষ্টির পরেই তাপমাত্রা কমে যেতে দেখি, এবার একটু সময় নেবে।’

অক্টোবরে বৃষ্টি কমলেও ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা কেন?

আবহাওয়া অধিদফতরের মাসব্যাপী পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অক্টোবরে বঙ্গোপসাগরে দুই থেকে তিনটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে একটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। তবে সম্ভাব্য কোনো ঘূর্ণিঝড় কোথায় সৃষ্টি হবে, সেটির গতিপথ কী হবে, কিংবা বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়বে কিনা, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলার সুযোগ নেই। মূলত, বাংলাদেশে সাধারণত মৌসুমি বায়ু আসার আগে এবং মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার পরের সময়টিতে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরির প্রবণতা থাকে।

আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির বলছেন, এখন যেহেতু মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে, তাই বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরির জন্যও ‘এটি স্বাভাবিক একটি সময়’।

তিনি বলেন, ‘অক্টোবরে মৌসুমি বায়ু বিদায় নেয়, তাই স্বাভাবিকভাবেই এটা ঘূর্ণিঝড়ের সময়। বিগত বছরগুলোতেও অক্টোবর-নভেম্বরে বাংলাদেশে বড় বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছে।’

অর্থাৎ, অক্টোবরে বৃষ্টি কমে আসার সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা থাকার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি নেই। বরং, মৌসুমি বায়ু বিদায়ের এই সময়েই বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরির প্রবণতা থাকে।

চলতি অক্টোবর মাসে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ছবি- সংগৃহীত
চলতি অক্টোবর মাসে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ছবি- সংগৃহীত

তবে এই আবহাওয়াবিদ বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বর্ষার বৃষ্টির ধরন কিছুটা আলাদা ছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত তিন-চার বছরে বর্ষাকালে শুরুর দিকে তুলনামূলক কম বৃষ্টি হলেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছিল। কিন্তু এবার জুন-জুলাই-আগস্টে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে, সেপ্টেম্বরেও কিছুটা হয়েছে এবং তখন থেকেই বৃষ্টির প্রবণতা কমতে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, ‘গত তিন-চার বছরের চাইতে এবার ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থা। জুন থেকে আগস্ট হলো বাংলাদেশের বৃষ্টিবহুল মাস। কিন্তু কয়েক বছর এই সময়ে একেবারেই বৃষ্টি হয়নি, শেষে গিয়ে হয়েছে। এবার প্রকৃতি তার নিয়ম অনুসরণ করেছে। আমি মনে করি, এটা ইতিবাচক।’

যদিও এল নিনোর প্রভাবে শেষ দিকে এসে এ বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিগত বছরগুলোয় অক্টোবরে কেমন বৃষ্টি হয়েছে?

এটি স্পষ্ট যে অক্টোবরে বৃষ্টি হওয়া বাংলাদেশে অস্বাভাবিক নয়। আবহাওয়া অধিদফতরের বিগত বছরগুলোর তথ্যেও অক্টোবর মাসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের নজির রয়েছে।

বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবর মাসে গড়ে ১০ হাজার ৪৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। তবে গত বছরের অক্টোবরে সারাদেশে মোট আট হাজার ৭৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল, যা স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের তুলনায় ৩০ দশমিক পাঁচ শতাংশ কম ছিল। আর ওই মাসে শুধু ঢাকা বিভাগে এক হাজার ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল।

এর আগে, ২০২৪ সালে ঢাকা বিভাগে দুই হাজার ৬২৬ মিলিমিটার এবং সারাদেশে ১৯ হাজার ১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল।

বিগত মাসগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ছবি- সংগৃহীত
বিগত মাসগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ছবি- সংগৃহীত

২০২৩ সালে ঢাকা বিভাগে দুই হাজার ১৯৬ মিলিমিটার এবং সারাদেশে ১১ হাজার ২৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল।  তার আগের বছর, ২০২২ সালের একই সময়ে ঢাকা বিভাগে মোট এক হাজার ৮৭২ এবং সারাদেশে নয় হাজার ৭৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল।

আর, ২০২১ সালের অক্টোবরে ঢাকা বিভাগে মোট ৮৬৯ মিলিমিটার এবং সারা দেশে আট হাজার ৬৪২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। করোনা মহামারীর বছর, ২০২০ সালের অক্টোবরে ঢাকা বিভাগে ৯২১ ও সারা দেশে নয় হাজার ৭৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল।

আর চলতি বছরের পহেলা অক্টোবর সারাদেশে সর্বমোট ৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হলেও আজ দোসরা অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টার মাঝেই সারাদেশে সর্বমোট ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, এর মাঝে ২১ মিলিমিটারই হয়েছে নিকলীতে।

আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা, এর বাইরেও হয়তো আরও কিছু জায়গায় বৃষ্টি হয়েছে। তবে সব জায়গায় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র না থাকায় সেসব এলাকার বৃষ্টিপাতের তথ্য তাদের কাছে নেই।

এর আগে, আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, ‘অক্টোবরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে মৌসুমি বায়ু বিদায় নেয়। ফলে এ সময়টায় বৃষ্টিপাত হয়।’ সূত্র- বিবিসি বাংলা

এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর