বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ঢাকা

ভ্যাপসা গরম আর কত দিন থাকবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ মে ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম

শেয়ার করুন:

ভ্যাপসা গরম আর কত দিন থাকবে?
এই গরম আর কত দিন থাকবে?

ঢাকার তাপমাত্রা এখনও ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁতে পারেনি, তবু নগরজীবন হয়ে উঠেছে অসহনীয়। থার্মোমিটারের পারদ ৩৬ ডিগ্রিতে থাকলেও বাস্তবে অনুভূত হচ্ছে ৪২ ডিগ্রির বেশি। রাস্তায় বের হলেই মনে হচ্ছে আগুনের চুল্লির ভেতর দিয়ে হাঁটছে মানুষ। অবিরাম ঘাম ঝরলেও শরীর ঠান্ডা হচ্ছে না। একটুখানি ছায়া, বাতাস কিংবা সামান্য স্বস্তিও যেন মিলছে না রাজধানীতে।

স্বাধীনতার আগে ১৯৬০ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দীর্ঘ ৫৪ বছর পর ২০১৪ সালের এপ্রিলে ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। একই তাপমাত্রা আবার রেকর্ড হয় ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিল। তবে এবার তাপমাত্রা সেই সীমায় না পৌঁছালেও গরমের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


তাপমাত্রা ৩৬ হলেও কেন ৪২ ডিগ্রির অনুভূতি?

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এখন শুধু থার্মোমিটারের পারদ দিয়ে গরম বোঝার সুযোগ নেই। প্রকৃত তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা মিলে শরীরে যে তাপ অনুভূত হয়, সেটিই এখন আসল বিষয়। একে বলা হয় ‘হিট ইনডেক্স’ বা তাপ সূচক। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে দেহের ভেতরের তাপ বের হতে না পেরে অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

weather-20250816124632

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে দুপুরের দিকে ঢাকার প্রকৃত তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও ‘রিয়েল ফিল’ বা অনুভূত তাপমাত্রা ছিল ৪২ ডিগ্রিরও বেশি। অর্থাৎ, শরীর বাস্তবে যে গরম অনুভব করছে, তা রেকর্ড করা তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: দুপুরের মধ্যে যেসব অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা

রাতের গরমই বাড়াচ্ছে দিনের দুর্ভোগ

চলতি মৌসুমে রাজধানীতে তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। এবার এপ্রিল-মে জুড়ে আগের দুই বছরের মতো দীর্ঘস্থায়ী বা ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি, বরং বৃষ্টি বেশি হয়েছে। তবে তাতে কমেনি ভ্যাপসা গরম। আবহাওয়াবিদদের মতে, এবার গরমের প্রধান কারণ রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ২৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৬ ডিগ্রি বেশি।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এ সময় ঢাকায় ৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাতের তাপমাত্রা না কমায় দিনের গরম তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। বিকেল বা সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর বৃষ্টিতে সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কমলেও দ্রুত মেঘ কেটে গিয়ে রোদ উঠছে। ফলে দিনের বেলায় আবার গরম বাড়ছে। সেই সঙ্গে দখিনা বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় শরীর বেশি ঘামছে এবং সেই ঘাম শুকাতে না পারায় ভ্যাপসা গরম মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গরম

বৃষ্টি হচ্ছে, তবু মিলছে না স্বস্তি

২০২৩ ও ২০২৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে দেশে টানা দীর্ঘ তাপপ্রবাহ বয়ে গিয়েছিল এবং তাপমাত্রা ৪২-৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল। এবার সে ধরনের তাপমাত্রা দেখা না গেলেও বৃষ্টির পর আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গরম অনুভূত হচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহের মতো। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী জুন-জুলাই মাসজুড়েও এই ভ্যাপসা গরম থাকতে পারে এবং এ সময়ে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। অর্থাৎ, বর্ষাকালেও এই গরমের অস্বস্তি কমার সম্ভাবনা কম।

কংক্রিটের শহর যখন ‘তাপীয় দ্বীপ’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার গরম এখন শুধু আবহাওয়ার কারণে নয়; অপরিকল্পিত নগরায়ণও এর বড় কারণ। গাছপালা, খোলা জায়গা ও জলাভূমি হারিয়ে কংক্রিটে ঢেকে গেছে শহর। এতে ঢাকা ধীরে ধীরে ‘তাপীয় দ্বীপে’ (হিট আইল্যান্ড) পরিণত হয়েছে।

heat-wave-20250511124303

এক যৌথ গবেষণায় ঢাকার ২৫টি এলাকাকে ‘চরম উত্তপ্ত অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাড্ডা, গুলশান, মিরপুর, গাবতলী, বাসাবো, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, মহাখালী, উত্তরা ও তেজকুনিপাড়া অন্যতম। দেখা গেছে, ঢাকার উষ্ণতম স্থানের সঙ্গে শহরের বাইরের অপেক্ষাকৃত শীতল এলাকার তাপমাত্রার পার্থক্য দিনে প্রায় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়। যেমন, সাভার বা সিঙ্গাইরে যখন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি, তখন ফার্মগেট বা তেজগাঁও এলাকায় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরে হাজার হাজার এসি থেকে নির্গত তাপ একসঙ্গে বাতাসকে গরম করছে। ফলে যারা এসি ছাড়া থাকেন, তারা আরও বেশি গরম অনুভব করছেন। সবুজায়ন ও জলাধার কমে যাওয়ায় শহর প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলছে।

এজেড

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর