সকালের ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের একটা দিনও ইন্টারনেট ছাড়া চলে না। মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করা, ল্যাপটপে অফিসের জরুরি কাজ কিংবা স্মার্ট টিভিতে সিনেমা দেখা, সবকিছুর পেছনেই কাজ করে চলেছে একটি অদৃশ্য মাধ্যম, সেটি হলো ওয়াই-ফাই (Wi-Fi)। কিন্তু প্রতিদিন শতবার ব্যবহার করা এই ‘Wi-Fi’ শব্দটির আসল অর্থ কী, এটি কীভাবে কাজ করে কিংবা এর সর্বশেষ প্রযুক্তি কত দূর এগিয়েছে, তা আমাদের অনেকেরই অজানা।
‘Wi-Fi’-এর আসল ফুল ফর্ম কী?
বিজ্ঞাপন
সাধারণ মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় Wi-Fi-এর ফুল ফর্ম কী? ৯৯% মানুষই একবাক্যে উত্তর দেবেন “Wireless Fidelity”। তবে আপনি জানলে অবাক হবেন যে, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে Wi-Fi-এর অফিশিয়াল বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ফুল ফর্ম নেই!

প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯৯ সালে ‘Wireless Ethernet Compatibility Alliance’ (বর্তমান Wi-Fi Alliance) যখন ইন্টারনেটের এই বেতার প্রযুক্তি বাজারে আনে, তখন এর প্রযুক্তিগত নাম ছিল বেশ জটিল— IEEE 802.11b Direct Sequence। সাধারণ গ্রাহকদের কাছে এই খটমটে নাম জনপ্রিয় করা অসম্ভব ছিল। তাই তারা ‘Interbrand’ নামক একটি মার্কেটিং সংস্থাকে দায়িত্ব দেয় একটি সহজ নাম খোঁজার জন্য। অডিও সিস্টেমের জনপ্রিয় শব্দ ‘Hi-Fi’ (High Fidelity)-এর সাথে মিলিয়ে তারা ‘Wi-Fi’ নামটি তৈরি করে। এটি স্রেফ একটি ক্যাচি ব্র্যান্ড নাম, এর কোনো ফুল ফর্ম বা অর্থ নেই। তবে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে “Wireless Fidelity” নামটিই বিশ্বজুড়ে থিতু হয়ে গেছে।
অদৃশ্য তরঙ্গের ম্যাজিক: যেভাবে কাজ করে Wi-Fi
বিজ্ঞাপন
ওয়াই-ফাই মূলত রেডিও তরঙ্গের (Radio Waves) ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, যা আমাদের ঘরের রেডিও বা মোবাইল নেটওয়ার্কের মতোই। এর পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে তিনটি ধাপে-
সংকেত গ্রহণ: আপনার বাড়ির রাউটারটি ব্রডব্যান্ড তারের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডেটা বা সিগন্যাল গ্রহণ করে।
রূপান্তর: এরপর রাউটার সেই ডিজিটাল তথ্যকে রেডিও তরঙ্গে রূপান্তর করে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়।
ডিভাইসে সংযোগ: আপনার মোবাইল, ল্যাপটপ বা স্মার্ট টিভিতে থাকা ছোট ওয়াই-ফাই চিপ বা রিসিভার সেই অদৃশ্য রেডিও তরঙ্গকে লুফে নেয় এবং পুনরায় ডিজিটাল ডেটায় রূপান্তর করে। ফলে আপনি অনায়াসে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন।

ভারতীয় উপমহাদেশে ওয়াই-ফাই বিপ্লব
দক্ষিণ এশিয়ায় তথা এই অঞ্চলে ২০০০ সালের শুরুর দিকে ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিকে এটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কেবল বড় বড় কর্পোরেট অফিস বা আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোতেই এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ব্রডব্যান্ডের কম খরচ এবং ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবলের বিস্তারের পর চিত্রটি পুরোপুরি বদলে যায়। বর্তমানে গ্রামীণফোন, বাংলালিংকের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ঘরে ঘরে হাই-স্পিড ফাইবার ইন্টারনেট ও ওয়াই-ফাই সেবা পৌঁছে দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তুলেছে।
প্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন ঝড়: কী এই ‘Wi-Fi 7’?
সময়ের সাথে সাথে ওয়াই-ফাই প্রযুক্তিরও ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। আগে যেখানে কেবল ২.৪ গিগাহার্টজ (GHz) এবং ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহার করা হতো, সেখানে এখন চলে এসেছে ওয়ান-স্টপ আল্ট্রা-ফাস্ট প্রযুক্তি। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আধুনিক এবং দ্রুতগতির প্রযুক্তি হলো Wi-Fi 7 (802.11be)।
আরও পড়ুন: ‘পাসওয়ার্ডে’র বাংলা অর্থ জানেন?
এটি পূর্ববর্তী Wi-Fi 6 বা 6E-এর তুলনায় প্রায় ৪ গুণ বেশি গতি দিতে সক্ষম। যেখানে ওয়াই-ফাই ৬-এর সর্বোচ্চ গতি ছিল ৯.৬ জিবিপিএস (Gbps), সেখানে ওয়াই-ফাই ৭-এর তাত্ত্বিক গতি প্রায় ৪৬ জিবিপিএস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এটি মূলত ৩২০ মেগাহার্টজ (MHz) চ্যানেল এবং ‘৬ গিগাহার্টজ’ ব্যান্ড ব্যবহার করে ডেটা আদান-প্রদান করে। এর ফলে একই সাথে ঘরে থাকা মোবাইল, ল্যাপটপ, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্মার্ট হোম অ্যাপ্লায়েন্স কিংবা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) নির্ভর ডিভাইসগুলো কোনো রকম বাফারিং বা ল্যাগ ছাড়াই চোখের পলকে স্ট্রিম হতে পারে।
স্মার্ট লাইফের অপরিহার্য অংশ
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ওয়াই-ফাই আর কোনো বিলাসী প্রযুক্তি নয়, বরং বিদ্যুৎ বা পানির মতোই একটি মৌলিক প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে। যেকোনো ঘরে বসে এক ক্লিকে অনলাইন ক্লাস, মেটাভার্স বা হাই-ডেফিনিশন ভিডিও কল করার যে সুবিধা আমরা পাচ্ছি, তার পুরো কৃতিত্বই এই অদৃশ্য প্রযুক্তির। ভবিষ্যৎ বিশ্বে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যত বাড়বে, ওয়াই-ফাই-এর গুরুত্ব যে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, তা বলাই বাহুল্য।
এজেড




