সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ঢাকা

বাংলাদেশের ১৭ কারখানায় তৈরি হচ্ছে দেশ-বিদেশি ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৫, ১০:০৯ এএম

শেয়ার করুন:

বাংলাদেশের ১৭ কারখানায় তৈরি হচ্ছে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন
বাংলাদেশের ১৭ কারখানায় তৈরি হচ্ছে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন।

আমদানির পাশাপাশি দেশেই ক্রমে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে মোবাইল ফোন উৎপাদন শিল্প। ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই খাত এখন দেশের একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশি ও বিদেশি মিলে প্রায় ১৭টি কারখানায় মোবাইল ফোন তৈরি হচ্ছে, যেখানে বিনিয়োগ হয়েছে ২,৫০০ কোটি টাকারও বেশি এবং কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় এক লাখ মানুষের।

বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি) এ তথ্য জানায়।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয় উৎপাদন থেকে রপ্তানির সম্ভাবনা

সংবাদ সম্মেলনে এমআইওবি নেতারা জানান, দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোন এখন কেবল দেশীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তারা বলেন, মোবাইল ফোন উৎপাদন ঘিরে দেশে আধুনিক প্যাকেজিং, প্রিন্টিং, ব্যাটারি, চার্জার, হেডফোন ও ডাটা কেবলসহ অনেক উপখাত গড়ে উঠেছে। এসব উপখাতে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে এবং ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ কাজ করছে।

এছাড়াও দেশে অনুমোদিত ২০ হাজার বিক্রেতা ও ৮০ হাজার বিক্রয়কর্মী এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। উৎপাদন ও বিতরণ পর্যায়ে সরাসরি ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এবং পরোক্ষভাবে ৮ লাখ মানুষ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।


বিজ্ঞাপন


বৈধ শিল্পের বড় বাধা ‘গ্রে’ হ্যান্ডসেট

এমআইওবি নেতারা জানান, বৈধ শিল্পের প্রধান বাধা হলো অবৈধ বা ‘গ্রে’ হ্যান্ডসেটের দখল। বর্তমানে দেশের মোবাইল বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশই অবৈধ মার্কেটের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, পাশাপাশি বৈধ কোম্পানির বিনিয়োগ পড়ছে ঝুঁকিতে।

অবৈধ ফোন দিয়ে আর্থিক প্রতারণা ও অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে, যার মূল অপরাধীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

MIOB-PressConference.05.11.2025-2

বিটিআরসির নতুন উদ্যোগ NEIR

এই সমস্যার সমাধানে সরকার এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে চালু হবে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR)’। এর মাধ্যমে অবৈধভাবে আমদানিকৃত বা নিবন্ধনবিহীন ফোন দেশে ব্যবহার করা যাবে না।

এমআইওবি জানায়, এই উদ্যোগ সরকারের রাজস্ব বাড়াবে, বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং ভোক্তার অধিকার সুরক্ষিত করবে।

NEIR: ভোগান্তি নয়, সুরক্ষা

সংগঠনটির অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ‘লাগেজ পার্টি’ নামে পরিচিত গোষ্ঠী NEIR–এর বিরুদ্ধে ভ্রান্ত তথ্য ছড়াচ্ছে। এসব গোষ্ঠীর মাধ্যমে চোরাই, নকল ও রিফার্বিশড হ্যান্ডসেট দেশে প্রবেশ করছে, যা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বাজারে কম দামে বিক্রি হয়।

এমআইওবি জানায়, NEIR ব্যবহার সহজ করার জন্য বিটিআরসি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, যাতে সাধারণ গ্রাহক হয়রানির শিকার না হন। তাই NEIR–কে ভয় নয়, বরং সমর্থন করা উচিত।

উৎপাদননীতি ও কর কাঠামো

সংগঠনটির নেতারা বলেন, দেশীয় উৎপাদনে কিছু ভ্যাট/ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা কোনো বৈষম্য নয়। এটি বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনসেনটিভ পলিসি’ অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ প্রণোদনা। তবে, সরকার চাইলে আমদানিকৃত বৈধ ফোন ও স্থানীয় উৎপাদিত ফোনের করের পার্থক্য কিছুটা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে, যাতে উভয় খাতই টিকে থাকতে পারে।

দাম ও মানের ভারসাম্য

এমআইওবি জানায়, দেশে তৈরি ফোনের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় সাশ্রয়ী। ডলার ও কাঁচামালের দাম ৬০% বাড়লেও, স্থানীয় উৎপাদকরা দাম না বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।

অন্যদিকে, কম দামে বিক্রি হওয়া গ্রে ফোনগুলো ট্যাক্স ফাঁকি, নকল বা রিফার্বিশড পণ্য, যেখানে ওয়ারেন্টি, সফটওয়্যার সাপোর্ট ও নিরাপত্তা থাকে না।

গ্রাহক সুরক্ষা ও নৈতিক ব্যবসা

NEIR চালু হলে গ্রাহক সহজেই জানতে পারবেন তাঁর ফোন বৈধভাবে উৎপাদিত বা আমদানি করা কিনা। বৈধ ফোন ব্যবহার করলে মিলবে ওয়ারেন্টি, সফটওয়্যার আপডেট ও নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা।

আরও পড়ুন: ১৬ ডিসেম্বর থেকে অবৈধ স্মার্টফোন চলবে না

অবৈধ ফোনে ম্যালওয়্যার ও ডাটা চুরির ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, NEIR ব্যবস্থায় হারানো ফোন ট্র্যাক ও বন্ধ করার সুবিধা থাকবে, যা গ্রাহক সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

অবৈধ স্মার্টফোনের কারণে প্রতিবছর সরকার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া, অবৈধ ব্যবসা বৈধ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অন্যায় প্রতিযোগিতা তৈরি করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

ন্যায্য বাজার ব্যবস্থার পক্ষে আহ্বান

এমআইওবি বলেছে, এখন সময় এসেছে গ্রে মার্কেট নয়, বরং ন্যায্য ও বৈধ বাজার ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ানোর। সংগঠনটি সরকারের NEIR উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মোবাইল শিল্পে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

এজেড

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর