২০২১ সালের আগে এই প্রজন্মের আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা কোনোদিন মেজর কোন ট্রফি জয় করতে দেখেনি তাদের প্রিয় দলকে। আকাশি-সাদা জার্সিধারীদের প্রথম কোন মেজর ট্রফি জয়ের স্বাদ পেতে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৮ বছর। গত বছর কোপা আমেরিকা জয়ের পর বুধবার (১ জুন) রাতে আরও একটি আন্তর্জাতিক ট্রফি নিজেদের করে নিয়েছেন মেসিরা। দুই মহাদেশীয় টুর্নামেন্টের শিরোপাধারীদের লড়াই ‘ফিনালিসিমা’ ম্যাচে ইতালিকে কোন পাত্তাই দেয়নি গতরাতে লিওনেল স্কালোনির শীর্ষরা। ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইতালিকে ৩-০ গোলের ব্যবধানে এক প্রকার উড়িয়ে দিয়ে ফিনালিসিমার আর্তেমিও ফ্রাঞ্চি ট্রফিটা নিজেদের করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা।
গতকালের জয় দিয়ে স্কালোনির কোচিংয়ে টানা ৩২ ম্যাচে অপরাজেয় মেসিরা। সর্বশেষ ২০১৯ সালের জুন মাসে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে হারের স্বাদ পায় আলবিসেলেস্তেরা। এরপর ধীরে ধীরে দল গোছাতে শুরু করেন স্কালোনি। তার দর্শনে বদলে যাওয়া এক আর্জেন্টিনার আবির্ভাব শুরু হয় কয়েক মাস আগে কাতার বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের খেলায়। সহজেই তারা টিকিট কেটে নিয়েছে ২০২২ বিশ্বকাপের, সেইসাথে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকাতে হয়েছে অপ্রতিরোধ্য চ্যাম্পিয়ন।
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ এই জয়যাত্রার পালকে যুক্ত হয়েছে গতরাতের ফিনালিসিমা জয়। বিশ্বকাপের বছরে ইউরো চ্যাম্পিয়নকে হারানোর পর এখন কথা উঠেছে যে স্কালোনির অধীনে এতকিছু, তিনি কি পারবেন দলকে ১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপ এনে দিতে?
লিওনেল মেসির দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই লওতারো মার্টিনেজ, ডি মারিয়া আর পাওলো দিবালার গোলে ইতালিকে আর্জেন্টিনা এমন সময় হারাল, যখন ফুটবল পাড়ায় আলোচনার বিষয় কনমেবল আর ইউরোপিয়ান অঞ্চলের দলগুলোর খেলার ধরন নিয়ে। বিতর্ক আছে কোপা আমেরিকায় খেলা দলগুলোর মান নাকি ইউরো কাপের দলগুলোর থেকে অনেক নিচের দিকে। এসব বিতর্ককে গতকাল যেন মাটিচাপা দিয়েছেন মেসিরা। ইতালির বিপক্ষে ৫৩ শতাংশ সময় বল পায়ে রাখেন মেসিরা, ম্যাচে মোট ১২টি শট নিয়ে ১০টি-ই রাখেন লক্ষ্যে।
এদিকে চলতি বছরের নভেম্বরে মাঠে গড়াতে যাচ্ছে কাতার ফুটবল বিশ্বকাপ। যা মেসির ক্যারিয়ারে একমাত্র অধরা ট্রফি। আর তার জাতীয় দলের জন্য তো সেটা ৩৬ বছরের অপ্রাপ্তি। তবে মেসি-এমিলিয়ানো মার্টিনেজ-ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো-রদ্রিগো ডি পল-লাওতারো আর ডি মারিয়ারা যে অপ্রতিরোধ্যভাবে স্কালোনির অধীনে এগিয়ে যাচ্ছেন তাতে করে মরুর দেশের বিশ্বসেরাদের লড়াইয়ে ট্রফি জয়ের স্বপ্ন হয়তো অনেক আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা ইতোমধ্যে দেখতে শুরু করেছেন।
যার অধীনে আর্জেন্টিনা এত বদলে গেল সেই স্কালোনির যাত্রা পথটা কেমন ছিল জেনে নেওয়া যাকঃ
বিজ্ঞাপন
দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম ফুটবল পরাশক্তির নাম আর্জেন্টিনা। কিন্তু গেল বছরের (২০২১) আগে টানা ২৮ বছর মেজর কোন শিরোপা জয় থেকে দূরে ছিল আলবিসেলেস্তেরা। ১৯৯৩ থেকে ২০২১, মাঝের এই ২৮ বছর আর্ন্তজাতিক শিরোপা জয় করতে না পারাটা আর্জেন্টিনার জন্য ছিল বড় আক্ষেপের । আর সে আক্ষেপের আগুনে ঘিয়ের মতো কাজ করেছে ২০১৪ এর বিশ্বকাপ ফাইনালের পাশাপাশি পরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার।

সবকিছুর পালা শেষ করে ২০২১ এর কোপা আমেরিকায় সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপা–খরা কাটায় আকাশি-সাদারা। যার অধীনে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই জয় তাকে হয়তো মেসির হাতে ট্রফি ওঠার আগে খুব কম লোকই চিনতেন। কারণ নামটি যে তখনও পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বে একেবারেই অপরিচিত। আর্জেন্টিনার স্বপ্ন পূরণের সারথির নাম লিওনেল স্কালোনি।
প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি সময়ে এসে ২০২১ এর কোপা জয়ের পরও যে স্কালোনি বিশ্ব ফুটবলে বিখ্যাত বা নামকরা কোচের তকমা পেয়ে গেছেন তেমনটিও নয়। কিন্তু তিনি যে ভাঙাচোরা এক দলকে ঢেলে সাজিয়েছেন এবং দলের ভেতর এক আমূল পরিবর্তন এনেছেন সেটি নিয়ে আলোচনা হতেই পারে।
আর্জেন্টিনা দলে যেভাবে আসলেন স্কালোনিঃ
স্কালোনির কোচিং ক্যারিয়ার শুরু হয় স্পেনের সেভিয়াতে হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী কোচ হিসেবে। যখন সাম্পাওলি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পান তখন তিনি সহকারী কোচ হিসেবে লিওনেল স্কালোনিকে নিয়ে আসেন। তখন কে জানত যে সাম্পাওলির এই সহকারী কোচই হবেন পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার ট্রফি জয়ের গুরু।
এরপরে আসে ২০১৮ এর বিশ্বকাপ, যেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের কাছে হেরে ব্যর্থ হয় আর্জেন্টিনা। পরে বরখাস্ত করা হয় সাম্পাওলিকে এবং আর্জেন্টিনা বোর্ডে চলে অর্থস্বল্পতা । এই অর্থস্বল্পতার দরুণ কপাল খুলে যায় স্কালোনির । কম বেতনে তিনি নিয়োগ পান আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ হিসেবে। এক কথায় অখ্যাত স্কালোনি অপ্রত্যাশিতভাবেই দায়িত্ব পেয়ে যান আর্জেন্টিনার কোচের ।
যেভাবে দলকে সাজান স্কালোনিঃ
প্রথম দিকে স্কালোনির পথচলা সুখকর ছিল না। দলের পারফরম্যান্স ছিল সেই আগের মতোই , বিশেষ করে আর্জেন্টিনার চিরায়াত গোলবার আর রক্ষণভাগের ব্যর্থতায় তখনও পরিবর্তন আসেনি আর্জেন্টিনা দলে। এরপর ২০১৯ এর কোপায় বাদ পড়ে আরও অস্বস্তি এনে দেয় তাদের শিবিরে। টুর্নামেন্ট থেকে আর্জেন্টিনা বাদ পরে ব্রাজিলের সাথে হেরে, কিন্তু সেবারের পারফরম্যান্স সবাইকে মুগ্ধ করে। আর এটিই এখন পর্যন্ত স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা দলের সর্বশেষ পরাজয়!
২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা থেকে বাদ পরে দলকে ঢেলে সাজাতে শুরু করেন স্কালোনি । ইউরোপের বড় থেকে শুরু করে সব লিগে ভালো পারফরম্যান্স করা আর্জেন্টাইনদের জাতীয় দলে সুযোগ দিয়ে পরখ করতে থাকেন তিনি। সেখান থেকে বাছাই করে বের করেন তাঁর পছন্দের তরুণ তুর্কীদের। এভাবে তরুণদের সঙ্গে দলের বর্ষীয়ান খেলোয়াড়দের মিশেলে গড়ে তুলেন মানসম্মত এক দল।

লিওনেল স্কালোনি যে দলকে আগের থেকে শাক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পেরেছেন, আগের থেকে আর্জেন্টিনা খেলার ধরন বেশ উপভোগ্য সেটা স্পষ্ট ফুটে ওঠে আলবিসেলেস্তেদের ২০২১ এর কোপা আমেরিকার পারফরম্যান্সে। বস্তুত ধরাবাধা কোন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে একাদশ না সাজিয়ে প্রতিপক্ষ বুঝে দলের একাদশ গঠন ও খেলোয়াড় পরিবর্তন যে সাফল্য এনে দিতে পারে সেটার প্রমাণ গেল কোপায় দিয়েছেন স্কালোনি।
২০২১ এর কোপায় চিলির সাথে ৪-৩-৩ ছকে নামা আর্জেন্টিনাকে কখনওবা দেখা গেছে প্যারাগুয়ের সাথে ৪-২-৩-১ ছকে। মূলত অতিরিক্ত রক্ষাত্মক দলের বিপক্ষে মিডফিল্ডার থেকে প্লেমেকারের উপর বেশি জোর দেন স্কালোনি। তাই পাপু গোমেজ এবং মেসিকে কোপা আমেরিকায় দেখা যায় প্লেমেকারের রোলে। সাফল্যও পেয়েছেন হাতেনাতে। সেইসাথে দল বুঝে ৪-৪-২ ছকেও মাঠে নেমে থাকেন মেসিরা।
স্কালোনির অধীনে যে আর্জেন্টিনা আগের সময়ের চেয়ে শক্তিশালী রক্ষণভাগ গড়তে পেরেছে তার প্রমাণ ওটামেন্ডির সাথে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর জুটি। রোমেরো একাই যেন বদলে দিয়েছেন চিরচেনা দুর্বল আকাশি-সাদাদের রক্ষণদুর্গ। আর গোলবারের নিচে স্কালোনি পেয়েছেন রোমেরো পরবর্তী উপযুক্ত আস্থাভাজন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজেকে। এদিকে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের রদ্রিগো ডি পলই মাঝমাঠে সবচেয়ে বড় আস্থা যাকে ঘিরে লো সেলসো, প্যারেদেস, গিদোরা হয়ে উঠেছেন নির্ভার।
সব মিলিয়ে স্কালোনির অধীনে বর্তমানে অন্তত গত এক দশকের মধ্যে সেরা অবস্থানে আছে আর্জেন্টিনা। তাই মেসির হাতে বিশ্বকাপের শিরোপা দেখতে পাবার আশা শুরু করার সঞ্চার যেন স্কালোনির দর্শনেই খুঁজে নিচ্ছেন ৭ বারের ব্যালন ডি অর জয়ীর সমর্থকেরা।
এসও




