চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংকে নিয়ে মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন কিলিয়ান এমবাপে, রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগা। তবে চীনে তাঁদের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে কিংবা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ফ্রান্সের অধিনায়ক এমবাপেকে ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাঁকে সাবেক চীনা নেতা মাও সে তুংকে নিয়ে বিদ্রূপ করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একটি মিম দেখে মজা পাওয়ার কথা বলেছিলেন এমবাপে। ওই মিমে তাঁর মুখের ছবি বসানো হয়েছিল এমন এক ব্যক্তির শরীরে, যাঁকে নিয়ে বলতে গিয়ে এমবাপে মন্তব্য করেন, ‘মনে হয়, কোনো এক চীনা স্বৈরশাসক।’
মাও সে তুং চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের নায়ক ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর শাসনামলে লাখো মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে প্রকাশ্যে তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ করা চীনে নিষিদ্ধের মতোই স্পর্শকাতর বিষয়। এমবাপের মন্তব্যের মধ্য দিয়ে চীনে ক্ষোভের মুখে পড়া বিদেশি ক্রীড়াবিদ বা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হলো তাঁর নাম।
এ ঘটনার পর এমবাপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে চীনের কয়েকটি বড় ব্র্যান্ড। এ ছাড়া স্পেনের শীর্ষ ফুটবল লিগ লা লিগার ম্যাচ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিতে দেখানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা এমবাপের কঠোর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। তবে ঠিক কী মন্তব্য করেছিলেন তিনি, সে বিষয়ে তাঁদের অনেককেই অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত লাভজনক বাজার। তাই বিতর্কের দুই দিনের মধ্যেই ক্ষমা চেয়েছেন এমবাপে। তাঁর ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগাও দুঃখ প্রকাশ করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এমবাপের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি ‘গুরুত্বের সঙ্গে’ নিয়েছে বেইজিং সরকার।
তাহলে কি এখানেই শেষ হচ্ছে বিতর্ক?
এএফপিকে অভিজ্ঞ ক্রীড়া ভাষ্যকার ইয়ান চিয়াং বলেন, ‘শান্ত, বস্তুনিষ্ঠ ও আবেগহীন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি ঘটনা।’ তিনি আরও বলেন, ‘চীনে লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদের ভাবমূর্তির গুরুতর ক্ষতি হয়েছে এতে।’ ইয়ানের মতে, মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের আবেগও তীব্র হয়ে ওঠে।
‘ক্ষমা চাওয়ার অর্থ এই নয় যে ঘটনা এখানেই শেষ। ক্ষমা না চাওয়ার চেয়ে ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই ভালো। কিন্তু এতে যে বিতর্কের অবসান ঘটবে, তা নিশ্চিত নয়।’
এমবাপেকে ঘিরে এই বিতর্ক ও তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া অবশ্য নতুন কিছু নয়। চীনের রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিভিন্ন বিষয়ে মন্তব্য করে এর আগেও বিদেশি ক্রীড়া লিগ ও খেলোয়াড়েরা দেশটির রোষানলে পড়েছেন। ২০১৯ সালে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন তৎকালীন হিউস্টন রকেটসের মহাব্যবস্থাপক ড্যারিল মোরি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বাস্কেটবল লিগ এনবিএর সঙ্গে কার্যত সম্পর্ক ছিন্ন করে চীন।
এনবিএর কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মোরির অধিকার। তবে এমবাপের মন্তব্যের পরপরই তাঁর বক্তব্য থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয় লা লিগা।
চীনে ফুটবলের পাশাপাশি সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি এনবিএ। মোরির মন্তব্যের জেরে এক বছরের বেশি সময় ধরে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিতে এনবিএর খেলা দেখানো বন্ধ ছিল। গত বছরই প্রথমবারের মতো চীনে এনবিএর প্রাক্-মৌসুমের ম্যাচ ফিরে আসে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ডেবি চ্যানের মতে, এনবিএর সেই ঘটনা এবং এবার এমবাপ্পেকে ঘিরে বিতর্ক- দুটিই চীনের ভোক্তা জাতীয়তাবাদের উদাহরণ। এ ক্ষেত্রে অনলাইন প্রতিক্রিয়া ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রচারণা একত্র হয়ে ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এনবিএ কমিশনার অ্যাডাম সিলভার জানিয়েছিলেন, চীনের সঙ্গে বিরোধের কারণে লিগটির ‘কয়েক শ মিলিয়ন ডলার’ ক্ষতি হয়েছিল।
ফেরার পথ কি বন্ধ?
স্পেনের ফুটবলও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। লা লিগার সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্ব থেকে আয়ের বড় অংশ আসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে লা লিগার আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য ছিল ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ইউরো, যা প্রায় ৮৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমান।
রিয়াল মাদ্রিদ-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম মার্কার তথ্য অনুযায়ী, ক্লাবটির জার্সি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে চীনের বাজার থেকে। চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান স্পনসরদের মধ্যে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে হাইসেন্স, ক্রীড়াভিত্তিক বাজি ধরার প্রতিষ্ঠান কাইয়ুন স্পোর্টস এবং লিংলং টায়ার।
বেইজিংভিত্তিক ক্রীড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কি-সলিউশন স্পোর্টস কনসাল্টিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডাম ঝাংয়ের মতে, দ্রুত ও আন্তরিকভাবে অনুশোচনা প্রকাশ করাই এখন প্রথম পদক্ষেপ। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে কি না এবং থাকলে কত দিন থাকবে, তা নির্ধারণে এই পদক্ষেপ প্রভাব ফেলবে।’
তবে চীনে পানীয়ের বোতল থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রচারে নিয়মিত দেখা যাওয়া এমবাপে নিজের ভাবমূর্তি পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ক্রীড়া ভাষ্যকার ইয়ান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপের সময় বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্পনসরশিপ ও বড় বিজ্ঞাপন প্রচারে তাঁর উপস্থিতি দেখলেই বোঝা যায়, চীনে তাঁর প্রভাব কতটা ব্যাপক।’
‘সেই প্রভাব ধরে রাখা না গেলে বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রশ্নও আসে না। এতে লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদ নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।’ এরপর কী ঘটবে, তা অনুমান করা সত্যিই কঠিন বলে মনে করেন ইয়ান।
তিনি আরও বলেন, ‘স্বল্প মেয়াদে আমি মোটেও আশাবাদী নই। চীনে নিজেদের ভাবমূর্তি ও সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে চাইলে ভবিষ্যতে তাদের কর্মকাণ্ড ও আচরণই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’




