গত প্রায় দুই দশক ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) অঢেল অর্থায়নে মধ্যম সারির ক্লাব থেকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দলে পরিণত হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। তবে সেই সিটিই এখন প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারসহ অভূতপূর্ব শাস্তির মুখোমুখি।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম লঙ্ঘন এবং তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগে ১১৫টি অভিযোগ আনা হয়। মঙ্গলবার প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ ওই প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে জানায়, ক্লাবটি ভুয়া চুক্তি তৈরি করে এবং গোপন তহবিল ব্যবহার করে দীর্ঘ এক দশক ধরে নিয়ম ভেঙেছে এবং এ সংক্রান্ত অভিযোগে তারা দোষী প্রমাণিত হয়েছে।
এই অপরাধের ফলে ক্লাবের বিরুদ্ধে বিশাল অঙ্কের জরিমানা, অতীতের ট্রফি বা শিরোপা ছিনিয়ে নেওয়া এবং এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকে সরাসরি বহিষ্কার বা অবনমনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে সিটি শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাবের চেয়ারম্যান খালদুন আল মোবারক জানিয়েছেন, তিনি এখনও ক্লাবকে নির্দোষ প্রমাণের ব্যাপারে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী।
এদিকে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ম্যানসিটির অবিশ্বাস্য উত্থানের পেছনে আছেন মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েক ধনকুবের। তাদের মধ্যে উল্লকেহযোগ্য-
শেখ মনসুর
শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস-প্রেসিডেন্ট, ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্সিয়াল কোর্টের চেয়ারম্যান। তিনি ‘আবু ধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ’-এর মালিক, যা ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার সিটি কিনে নেয়।
১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণকারী শেখ মনসুর ইউএই-র বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের ছোট ভাই এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। তিনি শত শত কোটি ডলারের রাষ্ট্রীয় তহবিল ‘মুবাদালা’র পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। এই তহবিলের সিইও হলেন খালদুন আল-মোবারক, যিনি একাধারে ম্যানচেস্টার সিটিরও চেয়ারম্যান।
শেখ মনসুরের বিশাল সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা শত শত কোটি ডলার মূল্যের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর বিস্তৃত, যার একটি বড় অংশ যুক্তরাজ্যে ব্যবসা পরিচালনা করে। ফলে সিটির আইনি ঝামেলার পেছনে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের ঝুঁকিও জড়িয়ে রয়েছে।
ফুটবলের বাইরেও তাঁর নানা পদক্ষেপ বিতর্কিত। তিনি ‘রেডবার্ড আইএমআই’ এর সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক, যা যুক্তরাজ্যের শীর্ষ রক্ষণশীল সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফ কেনার চুক্তি করেছিল। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য সরকার আইন পাশ করে বিদেশি রাষ্ট্রকে সংবাদপত্রের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের বেশি মালিকানা দেওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। শেখ মনসুর আবু ধাবি-ভিত্তিক আইএমআই-এর মালিক, যা স্কাই নিউজ অ্যারাবিয়া পরিচালনা করে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্কাই নিউজ তাদের আরবি ভাষার এই চ্যানেলের সব ধরনের কৌশলগত ও পরিচালন মালিকানা ছেড়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে, কারণ সুদান কাভারেজ নিয়ে যুক্তরাজ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ মনসুর সুদানের আধা-সামরিক বাহিনী 'র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস' (আরএসএফ)-কে অস্ত্র সরবরাহে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ইউএই-কে আরএসএফের প্রধান অর্থায়নকারী হিসেবে অভিযুক্ত করলেও আবু ধাবি তা কঠোরভাবে অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে ম্যানচেস্টার শহরে শেখ মনসুরের 'আবু ধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ' শহরের অনগ্রসর পূর্ব অংশের পুনর্উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। তবে ২০২২ সালে শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা ও দ্য সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদন ইঙ্গিত দেয় যে, এসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই গ্রুপটি বিশেষ সুবিধা ও সস্তা চুক্তি পেয়েছিল।
খালদুন আল-মোবারক
ক্লাব চেয়ারম্যান হিসেবে খালদুন আল-মোবারক ম্যানচেস্টার সিটিতে আরব মালিকানার সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ এবং প্রায়ই দলের ম্যাচে তাঁকে স্টেডিয়ামে দেখা যায়। তিনি ‘সিটি ফুটবল গ্রুপ’-এরও প্রধান, যা স্পেনের জিরোনা ও যুক্তরাষ্ট্রের এমএলএস দল নিউ ইয়র্ক সিটিসসহ বিশ্বে ইউএই মালিকানাধীন ডজনখানেক ক্লাব পরিচালনা করে।
তাঁর অধীনেই মাঠের ভেতরে সিটির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, যেখানে শত শত কোটি ডলার খরচ করে একটি বিশ্বজয়ী দল তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠের বাইরেও আমিরাতি মালিকানায় ক্লাবের বাণিজ্যিক আয় অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
৫১ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ফুটবলের বাইরেও এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি ২০০২ সাল থেকে 'মুবাদালা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্রুপ সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ওয়েবসাইট অনুসারে, এই বিশাল সরকারি তহবিলটি ৮০টিরও বেশি দেশে ৩৮৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে।
তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘এডনক’ এর পরিচালনা পর্ষদেরও সদস্য। এছাড়া আবু ধাবি সরকারের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের আসনসহ একাধিক উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করছেন, যা তাঁকে দেশটির রাজপরিবারের বাইরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ম্যানচেস্টার সিটির কাজের সুবাদে তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর মতে, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকার সময় থেকেই যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সাথে মোবারকের চমৎকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তিনি যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সচিব জোনাথন রেনল্ডসের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন।




