মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘পাকিস্তানি সংস্কৃতি সবসময়ই স্বৈরাচারী’

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ এএম

শেয়ার করুন:

‘পাকিস্তানি সংস্কৃতি সবসময়ই স্বৈরাচারী’

মাঝপথে দল পাল্টে ফেলা, সিরিজ চলাকালেই কোচকে টিকিট ধরিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে এমন দৃশ্য যেন কল্পনারও বাইরে। অথচ ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে ঠিক এমনই এক চরম বিশৃঙ্খলার নজির গড়েছে পাকিস্তান। দল হারছে, আর মাঠের বাইরের অপেশাদার সিদ্ধান্তগুলো পরিস্থিতিকে করে তুলেছে আরও ঘোলাটে। এমন টালমাটাল অবস্থায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছেন সাবেক ক্রিকেটার আতীক-উজ-জামান। তাঁর মতে, গোটা বোর্ড এখন চলছে কেবল একজন মানুষের খেয়ালখুশিতে, আর তিন দশক আগের বিশ্বকাপজয়ী তারকারাই নাকি দেশের ক্রিকেটকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। 

ইংল্যান্ডের মাটিতে লর্ডস টেস্টে ১৯৪ রানের বিশাল হারের পর সিরিজের মাঝপথেই মোহাম্মদ রিজওয়ান, ইমাম-উল-হকসহ একাধিক নিয়মিত খেলোয়াড়কে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এমনকি লাল বলের প্রধান কোচ ও বোলিং কোচকেও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে আতীক-উজ-জামান বলেন,‘আমি যদি এই কথার সঙ্গে দ্বিমত করি, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে পক্ষপাতদুষ্ট মানুষ হব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই, যারা শুধু ক্রিকেট খেলে বা দেখে, তারাও এখন যা ঘটছে, তার সঙ্গে একমত। সবাই পিসিবির নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে।’

তিনি বোর্ডের অপেশাদারিত্ব নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘পারফরম্যান্স ভালো নয়, এটা আমরা বুঝতে পারি। পাকিস্তানের পারফরম্যান্স সত্যিই খুব খারাপ। কিন্তু আমার পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা দেখিনি, সিরিজ চলাকালে দল বদলে দেওয়া হচ্ছে এবং একজন কোচকে শুধু এই কারণে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে তিনি কারও পরামর্শ শোনেননি।’

আতীকের ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তু পিসিবির প্রধান নির্বাচক আকিব জাভেদ। বোর্ডকে একনায়কতন্ত্রের আখড়া উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমার মনে হয়, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এখন এক ব্যক্তির শো। এখন বিষয়টা আকিব জাভেদ বনাম পুরো পাকিস্তান। সে একাই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আজ একটা স্বপ্ন দেখছে, পরদিন সেটাই বাস্তবায়ন করতে চাইছে।’

বোর্ডে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার বিষয়ে তিনি আরও যোগ করেন,‘আপনি যদি একটি প্রক্রিয়া তৈরি করেন, তাহলে ক্ষমতা ভাগ করে দিতে হবে। আর আপনি ক্ষমতা হারাতে চান না। অন্য কাউকে কর্তৃত্ব দিতে চান না, অন্যদের বেড়ে উঠতেও দিতে চান না। আপনি চান সবাই আপনার নির্দেশে চলুক। এই সংস্কৃতিটাই তিনি নিয়ে এসেছেন।’

দলে প্রতিভাবান পেসার না থাকার যে অজুহাত দেওয়া হয়, সেটিও উড়িয়ে দিয়েছেন আতীক। তাঁর মতে, এখানেও কাজ করছে তোষামোদের রাজনীতি। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানে দ্রুতগতির বোলার নেই, এটা সত্য নয়। আমাদের ৯০ মাইল গতিতে বল করতে পারে এমন বোলার আছে। কিন্তু কিছু মানুষের কারণে তারা নির্বাচিত হয় না। যারা তাদের সামনে গিয়ে শুধু বলে, স্যার, কেমন আছেন? তারাই সুযোগ পায়।’

এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে অধিনায়ক বাবর আজমেরও কড়া সমালোচনা করেছেন তিনি। আত্মসম্মানবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘অধিনায়কত্ব নেওয়া তার নিজের সিদ্ধান্ত। বাবরের যদি নিজের প্রতি সম্মান থাকে, তাহলে তার অধিনায়ক হওয়া উচিত ছিল না। তাকে একবার বাদ দেওয়া হয়েছিল, পরে ফিরেছে, আবার বাদ পড়েছে। এখন আবার এমন একটি দল নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যারা টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রস্তুত নয়।’

কোচদের বরখাস্ত করার সময় বাবরের নীরবতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে আতীক বলেন, ‘‘যদি সে অধিনায়কত্ব নিয়েই থাকে, তাহলে তার বলা উচিত ছিল, ‘আপনি যদি আমার কোচকে সরিয়ে দেন, আমার খেলোয়াড়কে দেশে পাঠান, তাহলে আমিও অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়াব।’ কিন্তু সে তা করেনি। পাকিস্তানে সবাই ক্ষমতা পছন্দ করে।’’

সবচেয়ে বিস্ফোরক মন্তব্যটি এসেছে ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের নিয়ে। আতীকের স্পষ্ট দাবি, ওই একটিমাত্র সাফল্যের অহংকারেই তারা বর্তমান ক্রিকেটকে ধ্বংস করছেন।

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি সংস্কৃতি সবসময়ই এমন। এটা সবসময়ই এক ধরনের স্বৈরাচারী সংস্কৃতি। আমাদের ১৯৯২ সালের তথাকথিত নায়করা বিশ্বকাপ জেতার পর কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। আর তারাই পাকিস্তান ক্রিকেটকে ধ্বংস করছেন।’

সাবেক এই ক্রিকেটার আরও বলেন, ‘সব ১৯৯২ খেলোয়াড়ই স্বৈরাচারী। কারণ তাদের অনেকের আধুনিক কোচিংয়ের যোগ্যতা বা ক্রীড়া বিষয়ে বিস্তৃত শিক্ষা নেই। তারা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্বের ওপর ভর করে আছেন এবং এরই মধ্যে আমাদের ক্রিকেটকে ধ্বংস করছেন।’

রাজনীতি আর ব্যক্তিস্বার্থের এই বেড়াজাল থেকে পাকিস্তান ক্রিকেট কবে বের হতে পারবে, সে বিষয়ে কোনো আশার আলো দেখছেন না আতীক। একরাশ হতাশা নিয়ে তিনি উপসংহার টানেন, ‘আমি মনে করি না, অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তান ক্রিকেট ঘুরে দাঁড়াবে। ক্ষতি অনেক বড়।’

সূত্র-এনডিটিভি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর