ভোরের আলো ফুটতেই আরও একবার উল্লাসে মেতে উঠল বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। চার বছর আগে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইতে যে অবিশ্বাস্য জয়ের গল্প লেখা হয়েছিল, এবার অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে যেন তারই এক রোমাঞ্চকর পুনর্জন্ম ঘটল। র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে ৯ উইকেটের বধানে হারিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে নতুন এক ইতিহাস রচনা করল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
টেস্ট শুরুর আগে ক্রিকেটপাড়ায় জোর আলোচনা ছিল, অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাক্রমশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ কি অন্তত তৃতীয় দিন পর্যন্ত লড়াইটা টেনে নিয়ে যেতে পারবে? আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দল বনাম নয় নম্বর দলের এই লড়াইয়ে ফলাফল যেন অনেকের কাছেই আগে থেকে অনুমেয় ছিল। কিন্তু মাঠের ক্রিকেটে সমস্ত হিসাব-নিকাশ আর সমীকরণকে ভুল প্রমাণ করেছে টাইগাররা। হার না মানা মানসিকতা নিয়ে অজিদের মাটিতে ৯ উইকেট হারিয়ে রুদ্ধশ্বাস এক জয় ছিনিয়ে এনেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
অজিদের ঘরের মাঠে এমন জয়ের দিনে অদ্ভুত এক মেলবন্ধনের ইতিহাস টানে মঙ্গানুই টেস্ট। ২০২২ সালে মমিনুল হকের নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। চার বছর পর শান্তর নেতৃত্বে এলো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক জয়। তবে ভিন্ন দুই মহাদেশ ও ভিন্ন সময়ের এই দুই জয়ের মাঝে লুকিয়ে আছে দারুণ কিছু কাকতালীয় মিল! মঙ্গানুইয়ের মতো ডারউইনেও স্বাগতিকদের দ্রুত গুটিয়ে দিয়ে প্রথম ইনিংসে লিড তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশ।
কিউইদের বিপক্ষে সেবার দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ২১ রান খরচায় ৬ উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন পেসার এবাদত হোসেন। এবার ডারউইনেও দেখা গেল ঠিক একই চিত্র। প্রথম ইনিংসে অজি ব্যাটারদের বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে মাত্র ১৭ রান দিয়ে ৬ উইকেট শিকার করে নিয়েছেন আরেক পেসার হাসান মাহমুদ।
নেতৃত্বের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও দুই অধিনায়কের পারফরম্যান্সে রয়েছে বিস্ময়কর মিল। মঙ্গানুইতে মমিনুল হকের ব্যাট থেকে এসেছিল ৮৮ রানের অনবদ্য এক ইনিংস। এবার ডারউইনে শান্তও খেললেন ৮৪ রানের দারুণ এক অধিনায়কোচিত ইনিংস। মজার ব্যাপার হলো, সেঞ্চুরির কাছে গিয়ে ‘আশির ঘরে’ আটকে পড়া এই দুই অধিনায়কই আউট হয়েছেন প্রতিপক্ষের পেসারদের বলে।
দল সাজানোর ক্ষেত্রেও মঙ্গানুইয়ের সেই সফল কৌশলই কাজে লাগিয়েছে বাংলাদেশ। একাদশে ছিল তিন পেসারের চমক। সেবার তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনের সঙ্গী ছিলেন শরিফুল ইসলাম। আর এবার ডারউইনে তাসকিন-এবাদতের সঙ্গে গতির ঝড় তুলেছেন হাসান মাহমুদ। অর্থাৎ, তাসকিন আর এবাদত দেশের ক্রিকেটের সেরা দুটি মহাকাব্যেরই প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে রইলেন।
বিদেশের মাটিতে প্রতিকূল কন্ডিশনে বুক চিতিয়ে লড়াই করার এই মানসিকতা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মঙ্গানুইয়ের সকালে যেমন ঘুম ভেঙে এক বুক আনন্দ নিয়ে দিন শুরু করেছিল সমর্থকেরা, ডারউইন টেস্টও ঠিক একইভাবে রাঙিয়ে দিল কোটি বাঙালির আরও একটি সোনালি সকাল।




