ক্রিজের শেষপ্রান্ত থেকে যখন তিনি একজোড়া হিংস্র চোখের দৃষ্টি মেপে লম্বা দৌড় শুরু করতেন, তখন গ্যালারিতে বসে থাকা হাজারো দর্শকের হৃদকম্পন একলাফে বেড়ে যেত কয়েক গুণ। হাত থেকে ছিটকে আসা বলটি যখন ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে উইকেটের দিকে ধেয়ে যেত, তখন ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বমানের ব্যাটারদের চোখের পলক ফেলার আগেই উপড়ে যেত স্ট্যাম্প! ক্রিকেটের ইতিহাসে ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’ নামটা শুধুই একজন বোলারের পরিচয় নয়; এটি ছিল ২২ গজে তৈরি হওয়া এক পরম আতঙ্কের নাম। তবে এই অতিমানবীয় গতির আড়ালেই পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে ছায়ার মতো লেগে ছিল একের পর এক বিতর্কের কালো মেঘ।
১৯৭৫ সালের ১৩ আগস্ট পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে জন্ম নেওয়া এই পেস দানব ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বাঁধা টপকে ক্রিকেট দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে ঝড়ের বেগে বল করার এই ক্ষমতার সঙ্গেই শুরু হয় নতুন ঝামেলা। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বেশ কয়েকবার তাঁর বোলিং অ্যাকশন নিয়ে অনৈতিকতার (চাকিং) অভিযোগ ওঠে। আইসিসির কঠোর নজরদারি ও সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। পরবর্তীতে বায়োমেকানিক্স পরীক্ষার মাধ্যমে বোলিংয়ের বৈধতা পেলেও, অ্যাকশন নিয়ে করা সমালোচনা কখনোই পুরোপুরি পিছু ছাড়েনি তাঁর।
শুধু বোলিং অ্যাকশনেই বিতর্কের ইতি ঘটেনি। ২০০৩ সালে সাউথ আফ্রিকার পোর্ট এলিজাবেথে বলের আকৃতি অনৈতিকভাবে বিকৃত (টেম্পারিং) করার দায়ে শাস্তির মুখে পড়েন শোয়েব। পরবর্তীতে নিজের আত্মজীবনী ‘কন্ট্রোভার্শিয়ালি ইওরস’-এ তিনি বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেন। সেখানে অত্যন্ত খোলামেলাভাবে স্বীকার করেন যে, পাকিস্তানের তৎকালীন পেস বোলিং ইউনিটের অনেকেই বল টেম্পারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ফাঁসবোমা ক্রিকেট প্রশাসনে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করে।
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০০৬ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ঠিক আগে। নিষিদ্ধ স্টেরয়েড গ্রহণের প্রমাণ মেলায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) তাঁকে দুই বছরের জন্য ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করে। আইনি লড়াইয়ে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করিয়ে মাঠে ফিরলেও, ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ঠিক আগে ঘটে আরেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। সাউথ আফ্রিকায় অনুশীলনের সময় ড্রেসিংরুমে সতীর্থ পেসার মোহাম্মদ আসিফকে ব্যাট দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করেন তিনি। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
খেলার শেষ অধ্যায়ে এসে ২০১১ সালে প্রকাশিত নিজের বইয়ে ক্রিকেট ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকারকে ‘ভীতু’ দাবি করে এবং ভারতীয় ব্যাটিং স্তম্ভ রাহুল দ্রাবিড়কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে পুনরায় বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হন তিনি।
তবে এত সব নাটকীয়তা ও অনভিপ্রেত ঘটনা সত্ত্বেও, বল হাতে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কারো মনে সংশয় ছিল না। ৪৬টি টেস্টে ১৭৮টি এবং ১৬৩টি ওয়ানডেতে ২৪৭টি উইকেটের মালিক শোয়েব আখতারের সামনে শচীন, ব্রায়ান লারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে কিংবা ব্রেন্ডন ম্যাককালামের মতো দিগ্গজদেরও বুক কেঁপে উঠত। গতির চরম পরাকাষ্ঠা আর বিতর্কের ঘনঘটার এক অদ্ভুত মিলনে তৈরি শোয়েব আখতার আজীবন থেকে যাবেন বিশ্ব ক্রিকেটের এক অনন্য রোমাঞ্চকর চরিত্র হিসেবে।




