বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ সংস্থা ফিফার নেতৃত্ব নিয়ে যখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছে, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়ালেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইনফান্তিনোকে পদ থেকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটিকে ‘বড় ভুল’ হবে বলে সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। তাঁর এই মন্তব্য ফিফার অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইনফান্তিনোর প্রশংসা করে বলেন, ফিফা সভাপতি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ আয়োজন করেছেন। তাঁর দাবি, ইনফান্তিনোকে সরিয়ে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ আগের মতো সফল ও লাভজনক হবে না।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ফিফা সভাপতির নেতৃত্ব নিয়ে ফুটবল বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কনফেডারেশনের মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। আগামী মার্চে ফিফা সভাপতির নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগের সূত্রপাত ফিফার একটি নতুন উদ্যোগকে ঘিরে। ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামের ওই পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বেসরকারি বিনিয়োগ আনার কথা ভাবা হয়েছিল।
পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসার পরই উয়েফা, কনকাকাফ ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এএফসি এর তীব্র আপত্তি জানায়। তাদের অভিযোগ, ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ থেকে সম্ভাব্য আয়ের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়ার চিন্তা ফুটবলের প্রচলিত শাসনব্যবস্থা ও সদস্য সংস্থাগুলোর স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তীব্র সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করে ফিফা। একই সঙ্গে ইনফান্তিনো ও ফিফার মহাসচিব ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রম পুরো প্রক্রিয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং স্বীকার করেন যে এতে ভুল হয়েছিল।
ফিফা জানিয়েছে, পুরো ঘটনাটি পর্যালোচনা করা হবে। সেই পর্যালোচনার ফলাফল পরবর্তী ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা বাতিল হলেও ক্ষোভ পুরোপুরি কমেনি। উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি এখনো ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সোমবার ফুটবল বিশ্বের উদ্দেশে দেওয়া এক যৌথ খোলা চিঠিতে তিন কনফেডারেশন জানায়, এই বিরোধ শুধু অর্থ বা বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ বণ্টন নিয়ে নয়। তাদের মতে, মূল প্রশ্ন হচ্ছে ফিফার নেতৃত্ব ও পরিচালনা ব্যবস্থার ওপর আস্থা।
তিন সংস্থার বক্তব্য, ফিফা পুরো ঘটনাকে যোগাযোগের ঘাটতি বা প্রক্রিয়াগত ভুল হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু তাদের চোখে বিষয়টি আরও গুরুতর। তারা এটিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভুল এবং সদস্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে আস্থার সংকট হিসেবে দেখছে।
তাদের দাবি, ফিফার অর্থ সদস্য সংস্থাগুলোর ফুটবল উন্নয়নে যথাযথভাবে বিনিয়োগ করা উচিত। একই সঙ্গে তারা ফিফার অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার পরিবর্তে একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে ফিফা ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরির অভিযোগ তুলেছে। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা বোর্ডও সম্প্রতি ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মরক্কোতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর ইনফান্তিনো বিশ্বকাপ-সংক্রান্ত বিতর্কিত প্রস্তাবের প্রক্রিয়া নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে তাঁর এই ক্ষমা চাওয়ার পরও উয়েফা জানিয়েছে, তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এর মধ্যেই ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন ইনফান্তিনোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পর ট্রাম্পের এমন মন্তব্য ফিফার নেতৃত্ব নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
ফলে একদিকে ট্রাম্প ও ফিফার অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের সমর্থন, অন্যদিকে প্রভাবশালী কয়েকটি কনফেডারেশনের অনাস্থা; এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যেই সামনে এগোতে হচ্ছে ইনফান্তিনোকে। আগামী মার্চের নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, এই টানাপোড়েন আরও কতটা বাড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।




