ফুটবল বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার ও শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির জন্য ফিফার বিতর্কিত প্রস্তাবের মুখে জরুরী বৈঠকে বসতে যাচ্ছে উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশ। চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ভার্চুয়ালি এই জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পরবর্তী করণীয় ও কর্ম পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।
ফিফা তাদের মূল ইভেন্টগুলো পরিচালনার জন্য একটি নতুন বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' গঠন করে তাতে বাইরে থেকে ৪.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনার যে পরিকল্পনা করেছে, তা নিয়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ফিফা দাবি করেছে এই অর্থ বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্নয়নে বণ্টন করা হবে, তবে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা মনে করছে এর ফলে ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে বেসরকারি প্রাইভেট ফান্ডগুলোর হাতে।
ফিফার এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই গণমাধ্যমে আসা খবরের ভিত্তিতে মঙ্গলবার কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় উয়েফা। তাদের মতে, ফিফা এমন একটি "সীমা অতিক্রম করেছে" যা মোটেও উচিত হয়নি। উয়েফার শক্তিশালী মনোভাব এবং ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী—তাদের সাথে কোনো পরামর্শ না করেই ফিফা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই বৈঠকে বিশ্বকাপ বয়কটের মতো প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়াটা মোটেও অমূলক নয়।
যদিও ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে উয়েফার সদস্য সংখ্যা মাত্র চারভাগের একভাগ (৫৫টি), তবুও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল দলগুলো ইউরোপেই অবস্থান করছে।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষ আটের ৬টি দলই ছিল ইউরোপের এবং বিজয়ী দল স্পেনও উয়েফার অন্তর্ভুক্ত। এর আগে ২০২২ ও ২০১৮ বিশ্বকাপেও শেষ আটের যথাক্রমে ৫টি ও ৬টি দল ছিল ইউরোপিয়ান।
উয়েফা খুব ভালোভাবেই জানে যে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে বাদ দিয়ে ফিফা যদি কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করে, তবে বিশ্ববাজারে সেই প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক মূল্য এক ধাক্কায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
ইংলিশ ফুটবলের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিবিসি স্পোর্টসকে জানিয়েছেন, ফিফার এই পরিকল্পনা আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে বড় হুমকি। ২০২১ সালে ফুটবল বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেওয়া এবং মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভেস্তে যাওয়া বিতর্কিত ‘ইউরোপীয় সুপার লিগ’ সংকটের সাথেই এই পরিস্থিতির তুলনা করছেন তারা।
তবে ফিফা যেভাবে বিশ্বজুড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিল গড়ে তোলা এবং প্রতিটি সদস্য দেশকে ২০ মিলিয়ন ডলার করে এককালীন ক্যাপিটাল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে ফিফা সহজে এই অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসবে বলে মনে হয় না।
এই নতুন বিতর্ক ফিফা ও উয়েফার মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তপ্ত সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলল। এর আগে ২০২১ সালে আরসেন ভেঙ্গার ২ বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিলে উয়েফা তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
চলতি মাসের ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিনের অনুপস্থিতিও এই তিক্ততার প্রমাণ দেয়। বিশেষ করে টুর্নামেন্ট চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং ফিফার নমনীয় নীতি উয়েফাকে ক্ষুব্ধ করেছিল।
এখন জরুরি বৈঠক শেষে ইউরোপের দলগুলো ফিফার বিরুদ্ধে সম্মিলিত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।




