একটা সময় ছিল যখন ফুটবলারের ফ্যাশন বলতে বোঝাত তাঁদের চুলের ছাঁট, ট্যাটু কিংবা মাঠের উদ্দাম উল্লাস। তবে আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তনের ঢেউ এখন কেবল অনুশীলন, মাঠ বা ড্রেসিংরুমে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পৌঁছে গেছে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্লাস্টিক সার্জনদের চেম্বার পর্যন্ত।
অভিনেতা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং টিভি সেলিব্রিটিদের মতো আধুনিক ফুটবলাররাও এখন ঝুঁকছেন ‘ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন’ বা মুখের আদল পরিবর্তনের নান্দনিক অস্ত্রোপচারের দিকে। নিজের চেহারাকে কেবল দৈহিক সৌন্দর্য হিসেবে নয়, বরং খেলার ক্যারিয়ার ও পার্সোনাল ব্র্যান্ডের একটি অন্যতম আর্থিক সম্পদ বা 'অ্যাসেট' হিসেবে দেখছেন বর্তমান যুগের অ্যাথলেটরা।
আজকের ফুটবলাররা কেবল মাঠের খেলোয়াড় নন; তারা একই সাথে ইনফ্লুয়েন্সার, ব্যবসায়ী এবং বহুজাতিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ অনুসারী, স্পন্সরশিপ চুক্তি ও বিজ্ঞাপনচিত্রের যুগে সৌন্দর্য ও মাঠের নৈপুণ্য একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।
আগে ফুটবল ভক্তরা কেবল ৯০ মিনিটের খেলাতেই নিজেদের প্রিয় তারকাদের দেখতেন। কিন্তু এখন ভ্লগ, রিলস, ইন্টারভিউ, টিম ডকুমেন্টারি এবং নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ফুটবলাররা ২৪ ঘণ্টাই ক্যামেরার নজরদারিতে থাকেন। ফলে ফেসিয়াল হারমোনাইজেশনের মতো সৌন্দর্য বর্ধনকারী প্রযুক্তিগুলোকে অ্যাথলেটরা তাঁদের 'পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং' কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করছেন।

ব্র্যান্ডিং ও রেপুটেশন বিশেষজ্ঞ জিউলিয়ানা ট্রাঙ্কিলিনির মতে, "আধুনিক যুগে কেবল ভালো খেলাটাই একজন ফুটবলারের দল পাওয়ার একমাত্র পূর্বশর্ত। তবে একজন তারকার আসল ব্র্যান্ড গড়ে ওঠে সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারভিউ ও সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে। আজকের ডিজিটাল বিশ্ব অ্যাথলেটদের একজন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও যোগাযোগকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশের নতুন সুযোগ করে দিয়েছে।"
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ভিভিয়ান সিমোয়েস পিরেজের মতে, ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন মূলত হাইয়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলারের সাহায্যে মুখের নকশা বা থুতনির আদল পরিবর্তন, গালের শেপ তৈরি করা কিংবা বোটক্স এর মাধ্যমে ত্বকের বলিরেখা দূর করার কৌশল। সারাদিন রোদে কঠোর অনুশীলন করা ও শরীরে চর্বির পরিমাণ কম থাকার কারণে অ্যাথলেটদের মুখে দ্রুত বলিরেখা ও ক্লান্তি ফুটে ওঠে, যা দূর করতে ফিলারের ব্যবহার দারুণ কার্যকর।

এই ধরণের চিকিৎসার স্থায়িত্ব সাধারণত ২ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং ১ থেকে ২ ঘণ্টার এই আধুনিক থেরাপিতে কোনো ধরনের শারীরিক ঝুঁকি বা মাঠের খেলায় পারফর্ম্যান্স কমার আশঙ্কা থাকে না। তবে এই প্রক্রিয়ার খরচ বেশ চড়া- সাধারণ একটি সেশনেই ১০ মিলিলিটার ফিলার ব্যবহারে খরচ হতে পারে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭ থেকে ১৪ লাখ টাকার সমপরিমাণ।
ব্রাজিলীয় ও ইউরোপীয় গণমাধ্যমের মতে, রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিউস জুনিয়র, বার্সেলোনার রাফিনহা, ফ্ল্যামেঙ্গোর লেহো পেরেরা এবং করিন্থিয়ানসের পেদ্রো রাউল-এর মতো বেশ কয়েকজন বিশ্বখ্যাত তারকা তাঁদের চেহারায় পরিবর্তন এনেছেন। যদিও ফুটবল জগতের ট্রোল ও গোঁড়ামির ভয়ে বেশিরভাগ ফুটবলারই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না এবং ছুটির দিনে অত্যন্ত গোপনে ক্লিনিকগুলোতে যান।
/i.s3.glbimg.com/v1/AUTH_bc8228b6673f488aa253bbcb03c80ec5/internal_photos/bs/2024/h/Y/XQxxQVTGeX1RtrB1NShw/pedroraul.png)
তবে ব্যতিক্রম সাবেক ব্রাজিলীয় মিডফিল্ডার লুকাস লিমা। একটি সাক্ষাৎকারে নিজের ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন ও কানের প্লাস্টিক সার্জারির কথা স্বীকার করে তিনি হেসে বলেন, "আমি এটি বেশ কয়েক বছর আগেই করিয়েছি। এখন দাড়ি গজিয়েছে, আর পুরুষদের আসল হারমোনাইজেশন তো দাড়িই! মানুষ ওয়াটসঅ্যাপে আমার ছবি নিয়ে মিম বা স্টিকার বানায়, তবে এসব আমি হালকাভাবেই নিই।"
সৌন্দর্য চর্চা বা ব্র্যান্ডিংয়ের মূল উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, বিশেষজ্ঞদের মতে একজন ফুটবলারের আসল পরিচিতি লেখা হয় তাঁর বুটের নিপুণ স্পর্শেই। ট্রাঙ্কিলিনির ভাষায়, "কোনো ফুটবলারের সৌন্দর্য তাঁর মহিমাকে দীর্ঘস্থায়ী করে না; বরং মাঠের পারফর্ম্যান্স, দলের হয়ে জয় এবং খেলার মাধ্যমে মানুষের সাথে আত্মিক বন্ধন তৈরি করার ক্ষমতাটাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় একজন অ্যাথলেটের আসল লেগ্যাসি বা ঐতিহ্য হিসেবে থেকে যায়।"




