বিশ্বকাপের সবচেয়ে কম গুরুত্বের ম্যাচেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেল ফুটবলপ্রেমীরা। মায়ামিতে ১০ গোলের থ্রিলার দেখল দর্শক। তাতে ইংল্যান্ড তারকা বুকায়ো সাকা করলেন হ্যাটট্রিক। জোড়া গোলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন কিলিয়ান এমবাপ্পে। মেসিকে (২১) টপকে ২২ গোল হলো তার।
মায়ামি গার্ডেন্সে শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হলো গোলের উৎসব। চাপহীন ম্যাচের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ৬-৪ গোলে জিতল ইংল্যান্ড।
প্রথমার্ধে ফ্রান্সকে নিয়ে ছেলেখেলায় মেতে ওঠে ইংল্যান্ড, তাতে তেমন ধারণাই মেলে। তবে, চার গোল হজমের পর, ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই জমিয়ে তুলল ফরাসিরা। দারুণ দুটি রেকর্ডের দেখাও মিলল। যদিও শেষ পর্যন্ত হার এড়াতে পারেনি তারা। বুকায়ো সাকার হ্যাটট্রিকে শেষটা জয়ে রাঙাল টমাস টুখেলের দল।
ফ্রান্সের হয়ে দেম্বেলে ও বারকোলা একটি করে গোল করেন। বেলিংহাম, এজেরি কনসা ও ডেক্লান রাইস একটি করে গোল করেন ইংল্যান্ডের হয়ে।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী এ ম্যাচে দুর্দান্ত জয়ে এবার বিশ্বকাপে তৃতীয় হলো ইংল্যান্ড। গত ৬০ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে এটা তাদের সেরা সাফল্য।
দুই দল মিলে ৩৮টি শট নিয়েছে। পোস্টে ছিল ২০টি শট।
শুরু থেকেই ফ্রান্সকে চেপে ধরে ইংল্যান্ড। ম্যাচের মাত্র তৃতীয় মিনিটেই অধিনায়ক ডেকলান রাইসের অসাধারণ দূরপাল্লার গোলে এগিয়ে যায় থ্রি লায়ন্স। দেজিরে দুয়ের ভুল পাস মাঝমাঠে কেটে নিয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নিচের ডান কোণে নিখুঁত শট পাঠিয়ে গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁকে পরাস্ত করেন রাইস।
এই গোলের পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড। সপ্তম মিনিটে বুকায়ো সাকার ক্রস থেকে সুযোগ তৈরি হলেও গোল হয়নি। ১১ মিনিটে ফ্রান্স প্রথম বড় সুযোগ পায়। রায়ান চেরকির জোরালো শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক ডিন হেন্ডারসন।
১২ মিনিটে সাকা বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। তবে ইংল্যান্ডের চাপ থামেনি। ১৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে টুখেলের দল। ডেকলান রাইসের দারুণ ইন-সুইং কর্নার থেকে এজরি কনসা সবাইকে হারিয়ে হেডে বল জালে পাঠান। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপে কয়েকবার আক্রমণে উঠলেও ইংল্যান্ডের রক্ষণ, বিশেষ করে মার্ক গেহি ও কনসা ছিলেন অনড়। ২৩ মিনিটে এমবাপের দূরপাল্লার বাঁকানো শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, আর ২৮ মিনিটে তিনি গোল করলেও অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়ে যায়।
৩৩ মিনিটে মার্কাস রাশফোর্ডের দুর্দান্ত দূরপাল্লার শট মেনিয়াঁ কষ্ট করে ফিরিয়ে দেন। তবে চার মিনিট পর আর রক্ষা হয়নি। ৩৭ মিনিটে সাকার পাসে এককভাবে গোলের সামনে পৌঁছে যান রাশফোর্ড। প্রথম শট ঠেকিয়ে দেন মেনিয়াঁ। ফিরতি বলেও সাকার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু দুই ইংলিশ ফরোয়ার্ডের দারুণ বোঝাপড়ায় রাশফোর্ড বল বাড়িয়ে দিলে সাকা এবার জোরালো শটে জাল কাঁপিয়ে ব্যবধান ৩-০ করেন।
ফ্রান্স তখন পুরোপুরি ছন্নছাড়া। ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। রাশফোর্ড ও সাকা বারবার ফরাসি ডিফেন্সের পেছনে দৌড়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করেন।
৪২ মিনিটে রাশফোর্ডের নিচু ক্রস থেকে ইভান টোনির সামনে আরেকটি সহজ সুযোগ এলেও তিনি ঠিকভাবে শট নিতে পারেননি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে আসে ইংল্যান্ডের চতুর্থ গোল।
৪৮ মিনিটে মাইকেল অলিসের দুর্দান্ত পাস থেকে গোল করেন কিলিয়ান এমবাপে। ছয় মিনিট পর এমবাপের অ্যাসিস্ট থেকে ব্র্যাডলি বারকোলা ব্যবধান কমিয়ে ৪-২ করেন। এরপর ৬৬ মিনিটে অলিসের আরেকটি নিখুঁত পাস ধরে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে আবারও গোল করেন এমবাপে। স্কোরলাইন তখন ৪-৩।
এই গোলের মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার নতুন রেকর্ড গড়েন ফরাসি অধিনায়ক। একই সঙ্গে এবারের আসরে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়েও নিজেকে আরও এগিয়ে নেন তিনি।
ফ্রান্সের একের পর এক আক্রমণে তখন কাঁপতে থাকে ইংল্যান্ডের রক্ষণ। ওসমান ডেম্বেলে, অলিসে ও এমবাপে বারবার গোলের সুযোগ তৈরি করতে থাকেন। ৬৪ মিনিটে ডেম্বেলের শট ঠেকান ডিন হেন্ডারসন, ৬১ ও ৭৫ মিনিটে অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হন অলিসে।
চাপ সামলাতে ৭৯ মিনিটে জুদ বেলিংহাম ও এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে মাঠে নামান টুখেল। সেই পরিবর্তন কিছুটা ভারসাম্য ফেরায় ইংল্যান্ডের খেলায়।
৮৫ মিনিটে ডিজেড স্পেন্সকে বক্সের ভেতর ফাউল করেন মালো গুস্তো। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালে স্পট কিক থেকে ঠান্ডা মাথায় গোল করে হ্যাটট্রিক পূরণ করেন বুকায়ো সাকা। ইংল্যান্ড তখন আবারও ৫-৩ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
তবে নাটক তখনও শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে দায়ো উপামেকানোর দুর্দান্ত ইন্টারসেপশন থেকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে গোল করেন বদলি ওসমান ডেম্বেলে। ব্যবধান আবারও কমে দাঁড়ায় ৫-৪।
ফ্রান্স যখন সমতার আশায় শেষ আক্রমণে উঠছে, তখনই ম্যাচের শেষ কথা বলে দেন জুদ বেলিংহাম। যোগ করা সময়ের অষ্টম মিনিটে বক্সের ভেতরে তিনজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় গোল করেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার। তার গোলে স্কোরলাইন হয় ৬-৪ এবং নিশ্চিত হয় ইংল্যান্ডের জয়।
এই গোলের মাধ্যমে বেলিংহাম এবারের বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ৭-এ উন্নীত করেন, যা এক আসরে কোনো ইংলিশ ফুটবলারের সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ৬-৪ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড। রুদ্ধশ্বাস এই ম্যাচে এমবাপে ইতিহাস গড়লেও শেষ হাসি হেসেছে থ্রি লায়ন্সরাই।
এআরএম




