মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মিসরের গোল বাতিল, আর্জেন্টিনার কেন নয়; আইন কী বলছে? জানুন ফিফার নিয়ম

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৩:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

মিসরের গোল বাতিল, আর্জেন্টিনার কেন নয়; আইন কী বলছে? জানুন ফিফার নিয়ম

ফুটবলে এখন ম্যাচ শেষ হলেও আলোচনা অনেক সময় শেষ হয় না। আর্জেন্টিনা ও মিসরের সাম্প্রতিক লড়াইও তেমনই একটি ম্যাচ। মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ভিএআরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। একদিকে মিসরের করা একটি গোল বাতিল হয়েছে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোল বহাল থাকায় প্রশ্ন তুলেছে মিসর শিবির। তবে সাবেক আন্তর্জাতিক রেফারি ও ভিএআর কর্মকর্তা অ্যান্ডি ডেভিসের ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে, নিয়মের দৃষ্টিতে কেন দুই ঘটনার রায় আলাদা হয়েছে।

ম্যাচের ৬২ মিনিটে মিসরের মোস্তফা জিকো বল জালে পাঠিয়ে দলকে উচ্ছ্বসিত করেন। শুরুতে গোলটি বৈধ ধরা হলেও পরে ভিএআর পুরো আক্রমণপর্ব পর্যালোচনা করে। রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণ শুরুর সময় মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের জার্সি টেনে ধরেন এবং একই সঙ্গে তাঁর পায়ের ওপর পা রাখেন। রেফারি ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত বদলে গোল বাতিল করেন।

অ্যান্ডি ডেভিসের মতে, 'এটি ছিল নিয়ম অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ ওই ফাউলের কারণে আর্জেন্টিনা বল পুনরুদ্ধারের সুযোগ হারায় এবং সেই একই আক্রমণ থেকেই পরে গোল আসে। ফলে আক্রমণের শুরুতে স্পষ্ট ফাউল থাকায় গোলটি বহাল রাখার সুযোগ ছিল না।'

ম্যাচের যোগ করা সময়ে আবার নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোল। গোল হওয়ার আগে মিসরের খেলোয়াড়রা দুটি ফাউলের অভিযোগ তোলেন। প্রথম ঘটনায় হামদি ফাতির জার্সি টেনে ধরার অভিযোগ ওঠে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় ঘটনায় মোহাম্মদ সালাহর সঙ্গে সংঘর্ষে হুলিয়ান আলভারেস ফাউল করেছেন বলে দাবি করে মিসর। তবে রেফারি কোনো ফাউল দেননি এবং ভিএআরও মাঠের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেনি।

ডেভিসের ব্যাখ্যায়, 'ম্যাক অ্যালিস্টারের জার্সি টানার ঘটনাটি খুব অল্প সময়ের ছিল এবং এতে হামদি ফাতির বল পাওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে নষ্ট হয়নি। তাই এটিকে স্পষ্ট ফাউল হিসেবে ধরা হয়নি। অন্যদিকে সালাহ ও আলভারেসের সংঘর্ষে দুই খেলোয়াড়ের বুটের সংস্পর্শকে স্বাভাবিক দৌড়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাঁর মতে, সেখানে ফাউল হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।' তিনি আরও বলেন, 'দুটি ঘটনার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো প্রথম ঘটনায় প্রতিপক্ষকে স্পষ্টভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে, আর দ্বিতীয় ঘটনায় ছিল স্বাভাবিক শারীরিক সংস্পর্শ। তাই নিয়মের দৃষ্টিতে দুটি সিদ্ধান্ত এক হওয়ার সুযোগ ছিল না।'

তবে এই ব্যাখ্যায় বিতর্ক থামেনি। ম্যাচ পরিচালনাকারী ফরাসি রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটি ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তাদের যোগাযোগবিষয়ক প্রধান মোহাম্মদ মোরাদ।

ফিফার আইন অনুযায়ী যা বলছে মিসরের গোল বাতিল ও আর্জেন্টিনার গোল বহালের ব্যাখ্যা

গোল বাতিলের বিষয়ে ফিফা ও আইএফএবিয়ের আইন 

ফিফা মূলত আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) প্রণীত ফুটবল আইন অনুসরণ করে। সেই আইন অনুযায়ী, কোনো গোল হওয়ার আগে একই আক্রমণের মধ্যে যদি আক্রমণকারী দলের কোনো খেলোয়াড় ফাউল করেন, হাতে বল লাগান কিংবা অন্য কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেন, তবে ভিএআর সেই ঘটনাটি পুনরায় রিভিউ করতে পারে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি যদি সেখানে স্পষ্ট কোনো নিয়মভঙ্গ বা ফাউল খুঁজে পায়, তবে গোলটি বাতিল করা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, আক্রমণটি যদি অবৈধ বা নিয়মবহির্ভূত উপায়ে শুরু হয়, তবে গোলটি যত সুন্দরই হোক না কেন, তা বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না।

ফুটবলে ভিএআর প্রযুক্তি ও অনফিল্ড রিভিউ 

আধুনিক ফুটবলে ভিএআর প্রযুক্তির  অন্যতম প্রধান কাজ হলো গোল হওয়ার ঠিক আগে কোনো অফসাইড, ফাউল, হ্যান্ডবল কিংবা অন্য কোনো গুরুতর রেফারিং ভুল হয়েছে কি না তা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা। প্রযুক্তির সহায়তায় কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে ভিএআর কক্ষ থেকে মাঠের মূল রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউের পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর সাইডলাইন মনিটরে ভিডিওর রিপ্লে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন মাঠের রেফারিই। মিসরের ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সঠিক সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।

ফলে মিসর এবং আর্জেন্টিনার ম্যাচে ওঠা বির্তক নিয়ে আইএফএবিয়ের খেলার আইন অনুযায়ী, কোনো গোলের আগে আক্রমণকারী দলের খেলোয়াড় ফাউল করলে এবং সেই আক্রমণ থেকেই গোল হলে, ভিডিও সহায়ক রেফারি (ভিএআর) সেই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে পারে।

মিসরের বাতিল হওয়া গোলের ঘটনায় ভিএআর আক্রমণের শুরুতে একটি ফাউল শনাক্ত করে। রিপ্লেতে দেখা যায়, মিসরের মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের জার্সি টেনে ধরেন এবং তাঁর পায়ের ওপর পা রাখেন। ফুটবলের আইন ১২ (অসদাচরণ) অনুযায়ী, প্রতিপক্ষকে ধরে বাধা দেওয়া বা অসতর্কভাবে পায়ে আঘাত করা ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয়। যেহেতু ওই ঘটনার পর একই আক্রমণ চালিয়ে মিসর গোল করে, তাই ভিএআর অনুযায়ী গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মিসর দুটি ফাউলের দাবি করলেও তা ভিএআরের দৃষ্টিতে গোল বাতিল করার মতো স্পষ্ট ভুল ছিল না। ভিএআরের মূল নীতি হলো, মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত তখনই পরিবর্তন করা যাবে, যখন ভিডিও প্রমাণে পরিষ্কার ও বড় ধরনের ভুল দেখা যায়। 

ম্যাক অ্যালিস্টার ও হামদি ফাতির ঘটনায় জার্সি টানার অভিযোগ থাকলেও ভিএআর মনে করেছে, সংস্পর্শটি খুব অল্প সময়ের ছিল এবং এতে খেলার গতিপথে বড় প্রভাব পড়েনি। অন্যদিকে সালাহ ও আলভারেসের সংঘর্ষকে স্বাভাবিক দৌড়ের সময় হওয়া শারীরিক সংস্পর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি সংস্পর্শ ফাউল নয়; অসতর্ক, বেপরোয়া বা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ হলেই সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধরা হয়।

একই নিয়মে গোল বাতিল হয়েছিল অন্য ম্যাচেও 

চলতি বিশ্বকাপেও ভিএআরের এমন নিখুঁত সিদ্ধান্তের নজির আরও দেখা গেছে। ইরান ও মিশরের ম্যাচেও ইরানের শেষ মুহূর্তের একটি গোল ভিডিও সহকারী রেফারির সহায়তায় বাতিল করা হয়েছিল। সেই ম্যাচের রিপ্লেতে দেখা যায়, গোল হওয়ার আগে আক্রমণকারী খেলোয়াড় অফসাইড পজিশনে ছিলেন। পর্তুগাল-উজবেকিস্তান ম্যাচেও এমন একটা সিদ্ধান্ত আসে রেফারি থেকে। শুধু এই ম্যাচ নয় চলতি বিশ্বকাপে এমন বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাতে ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, বর্তমান বিশ্ব ফুটবলে ভিএআর প্রযুক্তি এবং ক্রিকেটে বহু বছর ধরে স্নিকো প্রযুক্তি সঙ্গে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এ আই) ব্যবহারের মাধ্যমে নিয়মের শতভাগ নির্ভুল প্রয়োগ এবং মাঠে খেলার ন্যায্যতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে ফিফা। 

সবকিছু মিলিয়ে, মাঠে আর্জেন্টিনা জয় পেলেও ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভিএআরের সিদ্ধান্ত। সাবেক রেফারির বিশ্লেষণ কিংবা ফিফার নিয়মের ব্যাখ্যা  দিলেও সমর্থকদের বিতর্ক এখনো থামেনি। ফলে এই ম্যাচ শুধু ফলাফলের জন্য নয়, রেফারিং নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকার মতো একটি ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর