শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ইতিহাস বলছে, এমন অবস্থা থেকে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে ব্রাজিল

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ জুন ২০২৬, ১২:৩১ এএম

শেয়ার করুন:

ইতিহাস বলছে, এমন অবস্থা থেকে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে ব্রাজিল

বিশ্বকাপের পথে ব্রাজিলের যাত্রা এবার শুরু হয়েছে প্রশ্ন, সংশয় এবং প্রত্যাশার মিশেলে। নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে হেক্সাজয়ের স্বপ্ন দেখছে সেলেসাওরা, কিন্তু সূচনাটা ছিল কিছুটা ম্লান। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে জয় না পাওয়ায় সমালোচনার পাশাপাশিআবারও সামনে এসেছে একটি পুরোনো বিতর্ক। বিশ্বকাপের আগে দুর্বল প্রস্তুতি কি কখনও ব্রাজিলের জন্য সৌভাগ্যের বার্তা হতে পারে? ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে এই প্রশ্নের সহজ উত্তর মেলে না, কারণ ব্রাজিলের সাফল্যের গল্পে যেমন সংকট আছে, তেমনি আছেআধিপত্যের অধ্যায়ও।

তারপরও আশাবাদ হারাচ্ছেন না সেলেসাও সমর্থকরা। কারণ ইতিহাস বলে, ব্রাজিলের সেরা কিছু সাফল্য এসেছে ঠিক তখনই, যখনদলটিকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছিল। তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন বিশ্বকাপের আগে দুর্বল প্রস্তুতি কিসত্যিই ব্রাজিলের জন্য শুভ সংকেত?


বিজ্ঞাপন


কার্লো আনচেলত্তির অধীনে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে ব্রাজিল। তবে প্রথম ম্যাচেই প্রত্যাশিত ফল পায়নি দলটি। শক্তিশালী মরক্কোরবিপক্ষে - গোলের ড্র দিয়ে যাত্রা শুরু হওয়ায় সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতিতে হতাশার মাঝেও আশার জায়গা সবসময় থাকে। কারণ অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, দলটিঅনেক সময় নিখুঁত প্রস্তুতি নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে, আবার অনিশ্চয়তার ভেতর থেকেও বিশ্বসেরার মুকুট জিতেছে।

বিশ্বকাপের আগে গত কয়েক বছরের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চারজন ভিন্ন কোচের অধীনে ৩৭টি ম্যাচ খেলেছেব্রাজিল। এর মধ্যে জয় এসেছে ১৭টিতে, ড্র ১০টি এবং হার ১০টিতে। কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফিও জেতা হয়নি।

সব মিলিয়ে জয়ের হার মাত্র ৫৪. শতাংশ। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ-পূর্ব ইতিহাসে এটি অন্যতম নিম্নতম সাফল্যের হার। অনেক ফুটবলবিশ্লেষকের মতে, বিশ্বকাপের আগে এতটা অনিশ্চয়তা নিয়ে ব্রাজিল খুব কমবারই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে।


বিজ্ঞাপন


ইতিহাসে ফিরে তাকালে আসে ১৯৯৪ সালে সমালোচনার ভেতরে বিশ্বকাপ ঘরে তুলে সেলেসাওরা। আজ থেকে তিন দশকেরও বেশিআগে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো ছিল না।

সেই সময় দলটির নেতৃত্বে ছিলেন পাউলো রবার্তো ফালকাও এবং পরে কার্লোস আলবার্তো পারেইরা। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছিলনা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল মূল পর্ব নিশ্চিত করার জন্য।

দলটির খেলা নিয়ে সমালোচনা ছিল, আত্মবিশ্বাস নিয়েও প্রশ্ন ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নেয়ব্রাজিল। শেষ পর্যন্ত ইতালিকে হারিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নেয় সেলেসাওরা।

২০০২ সালের গল্পটি আরও নাটকীয়। কোপা আমেরিকা জয়ের পরও ব্রাজিলের ভেতরে স্থিতিশীলতা ছিল না। একের পর এক কোচপরিবর্তনের কারণে দলটি যেন নিজের পরিচয়ই হারিয়ে ফেলেছিল। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও তাদের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক।

ঠিক সেই সময় দায়িত্ব পান লুইজ ফেলিপে স্কলারি। বিশ্বকাপের মাত্র এক বছর আগে দায়িত্ব নিয়ে তিনি দলটিকে নতুনভাবে গড়েতোলেন।

রোনালদো, রিভালদো রোনালদিনিওকে কেন্দ্র করে গড়া সেই দলকে শুরুতে খুব বেশি মানুষ শিরোপার দাবিদার মনে করেনি। কিন্তুজাপান দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে ব্রাজিল সব বাধা পেরিয়ে পঞ্চম বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করে।

তবে এটাও সত্য, ব্রাজিলের সব বিশ্বকাপ জয় সংকটের মধ্য থেকে আসেনি। ১৯৫৮, ১৯৬২ কিংবা ১৯৭০ সালের দলগুলো ছিলনিজেদের সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী আত্মবিশ্বাসী দলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের ব্রাজিলকে অনেকেইফুটবল ইতিহাসের সেরা দল হিসেবে বিবেচনা করেন।

বিশ্বকাপ জয়ের আগে বিভিন্ন চক্রে ব্রাজিলের জয়ের হার ছিল১৯৬২৮০.% , ১৯৭০৭৪.%, ১৯৫৮৬৯.%, ২০০২৬৬.%, ১৯৯৪৬০.%, ২০২৬৫৪.%

এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে, দুর্বল প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের নজির থাকলেও শক্তিশালী প্রস্তুতির উদাহরণই বেশি।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটিকে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে ধরা যায় না। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে সাফল্য নির্ভর করে দলীয়সংহতি, কৌশল, মানসিক দৃঢ়তা, ফিটনেস এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিল বেশ কয়েকবার দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। ২০১৮ বিশ্বকাপের আগে তাদের জয়ের হারছিল ৬৬. শতাংশ। ২০২২ বিশ্বকাপের আগে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩. শতাংশে। দুই আসরেই ব্রাজিলকে অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশীদল হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রফি অধরাই থেকে যায়।

বিশেষ করে ২০০৬ সালের দলটিকে অনেকেই ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান স্কোয়াড হিসেবে বিবেচনা করেন।রোনালদিনিও, কাকা, রোনালদো আদ্রিয়ানোর মতো তারকাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও সেই দল কোয়ার্টার ফাইনালেই বিদায় নেয়।

হেক্সা স্বপ্নের সামনে বাস্তবতার পরীক্ষা

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে আশা বাস্তবতা সবসময় পাশাপাশি হেঁটেছে। ১৯৯৪ ২০০২ সালের মতো দুর্বল প্রস্তুতি থেকে বিশ্বজয়েরস্মৃতি যেমন সমর্থকদের অনুপ্রাণিত করে, তেমনি ২০০৬, ২০১৮ কিংবা ২০২২-এর ব্যর্থতা মনে করিয়ে দেয় যে শুধু সম্ভাবনা দিয়ে ট্রফিজেতা যায় না।

তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাফল্য নির্ভর করবে না অতীতের কুসংস্কার, পরিসংখ্যান কিংবা ফেবারিট বিতর্কের ওপর। মাঠে ৯০মিনিটের লড়াই, দলীয় ঐক্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা তুলে ধরার ক্ষমতাই ঠিক করবে সেলেসাওদেরভাগ্য।

হয়তো ইতিহাস আবারও ব্রাজিলের দিকে হাসবে।না  হয়তো নতুন কোনো গল্প লেখা হবে।

এসটি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর