বিশ্বকাপ মানেই শুধু শিরোপার লড়াই নয়, গল্পেরও জন্মভূমি। কোথাও পরাশক্তির শক্তিমত্তার প্রদর্শন, কোথাও কিংবদন্তির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়, আবার কোথাও স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার সাহস নিয়ে উঠে আসা এক ছোট দেশের অবিশ্বাস্য যাত্রা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মাত্র ২৪টি ম্যাচ শেষ হলেও ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে এমন অনেক গল্প, যা টুর্নামেন্টটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। জার্মানির দাপুটে শুরু, মেসির অনন্ত বিস্ময় আর কেপ ভার্দের রূপকথার মতো অভিযানে তাই বিশ্বকাপের প্রথম অধ্যায়ই হয়ে উঠেছে স্মরণীয়।
গ্রুপ পর্বের প্রথম ২৪ ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বড় বার্তা দিয়েছে জার্মানি। নিজেদের প্রথম ম্যাচেই কুরাসাওকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় জয় তুলে নিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। জার্মানদের আক্রমণভাগের গতি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং দলীয় সমন্বয় ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে তাদের পুরোনো পরিচয়। ২০১৮ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় এবং ২০২২ সালেও একই হতাশার পর এবার নতুন প্রজন্মের জার্মানি আবারও বিশ্ব শিরোপার দাবিদার হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, সময় যেন এখনও হার মানাতে পারেনি লিওনেল মেসিকে। ৩৯ বছর বয়সে এসে বিশ্বকাপের মঞ্চে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে হ্যাটট্রিক করে নতুন ইতিহাস গড়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করা মেসি দুই দশক পরও একই মঞ্চে সমান উজ্জ্বল। এই ম্যাচের মাধ্যমে তিনি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে খেলার বিরল কীর্তি গড়েছেন এবং বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৬-তে উন্নীত করেছেন। বয়সের সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে এখনও যে তিনি বড় মঞ্চের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাম, সেই বার্তাই আবারও দিয়েছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর।
তবে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আবেগঘন গল্পগুলোর একটি লিখছে কেপ ভার্দে। জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ছয় লাখের আফ্রিকান দ্বীপরাষ্ট্রটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েই থেমে থাকেনি। নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই তারা রুখে দিয়েছে ইউরোপিয়ান পরাশক্তি স্পেনকে। ম্যাচজুড়ে স্পেনের ৭৪ শতাংশ বল দখল এবং ২৭টি শট সামলেও গোলশূন্য ড্র তুলে নেয় কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই প্রথম পয়েন্ট অর্জন করে তারা।
শুধু কেপ ভার্দেই নয়, এবারের বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ছোট দলগুলোর সাহসী পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে। সৌদি আরব উরুগুয়ের মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ড্র করেছে, ইরানও শক্তিশালী বেলজিয়ামের সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেছে। এসব ফলাফল আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বকাপে নাম কিংবা ইতিহাস নয়। নির্দিষ্ট ৯০ মিনিটের লড়াইটাই শেষ কথা।
অন্যদিকে, কিছু বড় দল নিজেদের প্রত্যাশা অনুযায়ী শুরু করতে পারেনি। স্পেন কেপ ভার্দের বিপক্ষে অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেও গোলের দেখা পায়নি। পর্তুগালও ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্র করে সমালোচনার মুখে পড়েছে। রোনালদোর ভূমিকা থেকে শুরু করে স্পেনের ফিনিশিং, বিভিন্ন প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিজ্ঞাপন
২৪ ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপ যেন তার চিরচেনা রূপই তুলে ধরেছে। এখানে যেমন জার্মানির মতো দল গোলের বন্যা বইয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেয়, তেমনি মেসির মতো কিংবদন্তি বয়সকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস লেখেন। আবার কেপ ভার্দের মতো ছোট দেশও দেখিয়ে দেয় স্বপ্নের কোনো জনসংখ্যা হয় না।
এখনও বাকি ৮০টি ম্যাচ। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, সবচেয়ে বড় অঘটন, সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত এবং সবচেয়ে স্মরণীয় গল্পগুলো অনেক সময় শুরুতেই নয়, জন্ম নেয় শেষের দিকে। তাই ২৪ ম্যাচে পাওয়া এই ঝলক হয়তো কেবল আরও বড় এক বিশ্বকাপ-গল্পের সূচনা।




