বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের রাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন লিওনেল মেসি। দুর্দান্ত একহ্যাটট্রিকে দলকে জয় এনে দেওয়ার পাশাপাশি তিনি গড়েছেন একাধিক রেকর্ডও। তবে ম্যাচের ফলাফল কিংবা হ্যাটট্রিকের উচ্ছ্বাসেরআড়ালে আরেকটি ঘটনা ফুটবল বিশ্বে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ম্যাচের ৩২তম মিনিটে আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার আইসা মান্দিরওপর মেসির করা একটি ট্যাকল অনেকের চোখে সরাসরি লাল কার্ডের মতো মনে হয়েছে।
কখন সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়?
বিজ্ঞাপন
ফুটবলের আইনপ্রণেতা সংস্থা আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি)-এর আইন অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড়তখনই সরাসরি লাল কার্ড পাবেন যখন তার ট্যাকল বা চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষের নিরাপত্তাকে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয় অথবা সেখানেঅতিরিক্ত শক্তি ও বিপজ্জনক আচরণের উপস্থিতি থাকে।
নিয়মে বলা হয়েছে, বল দখলের লড়াইয়ে একজন খেলোয়াড় যদি সামনে, পাশ থেকে কিংবা পেছন থেকে এমনভাবে ট্যাকল করেনযেখানে অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করা হয় বা প্রতিপক্ষের শারীরিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে সেটিকে ‘সিরিয়াস ফাউল প্লে’ বা মারাত্মক ফাউল হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এমন অপরাধের শাস্তি সরাসরি লাল কার্ড।
এছাড়া ‘ভায়োলেন্ট কন্ডাক্ট’ বা সহিংস আচরণের ক্ষেত্রেও খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এটি সাধারণত তখন ঘটে যখনবলের জন্য লড়াইয়ের বাইরে কোনো খেলোয়াড় ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিপক্ষের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেন বা আক্রমণাত্মক আচরণপ্রদর্শন করেন।
রেফারির সিদ্ধান্ত নির্ভর করে ঘটনাটির প্রকৃতির ওপর। আইএফএবি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে ব্যাখ্যা করেছে।
বিজ্ঞাপন
অসাবধানতা : যখন কোনো খেলোয়াড় ট্যাকলের সময় যথেষ্ট সতর্কতা বা বিবেচনা প্রদর্শন করেন না।
বেপরোয়া আচরণ: যখন একজন ফুটবলার প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা বা সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষা করে আগ্রাসী চ্যালেঞ্জ করেন।
অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ: যখন একজন খেলোয়াড় পরিস্থিতির প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি ব্যবহার করেন এবং প্রতিপক্ষকেআঘাতের ঝুঁকিতে ফেলেন।
এই তিনটি স্তরের মধ্যে পার্থক্যই নির্ধারণ করে কোনো ফাউল সাধারণ অপরাধ, হলুদ কার্ড নাকি সরাসরি লাল কার্ডের যোগ্য।
কেন কার্ড বের করলেন না রেফারি মার্চিনিয়াক?
ম্যাচের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পোলিশ রেফারি সাইমন মার্চিনিয়া মেসিকে কার্ড না দেখিয়ে মৌখিকভাবে সতর্ক করেছিলেন।তার মূল্যায়ন ছিল, মেসি মূলত বল খেলতে গিয়েছিলেন এবং পাস দেওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
রেফারির দৃষ্টিতে ঘটনাটিতে ইচ্ছাকৃত আক্রমণাত্মক আচরণ বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের উপাদান ছিল না। আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার সেসময়ে বলের অবস্থান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় মেসির পা তার গায়ে লাগে, তবে সেটি এমন মাত্রার ছিল না যা প্রতিপক্ষের নিরাপত্তাকেমারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে বলে গণ্য করা যায়। ফলে ঘটনাটি ‘সিরিয়াস ফাউল প্লে’ হিসেবে বিবেচিত হয়নি।
ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরির ব্যাখ্যা
রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক চললেও সবাই যে লাল কার্ডের পক্ষে ছিলেন, তা নয়। সাবেক ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি প্রকাশ্যে এইসিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন।
তার মতে, কোনো ফাউলের বিচার করতে গেলে শুধু সংঘর্ষের দৃশ্য নয়, খেলোয়াড়ের উদ্দেশ্যও বিবেচনায় নিতে হয়। তিনি বলেন, রিপ্লেদেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় মেসির মনোযোগ পুরোপুরি বলের দিকে ছিল এবং তিনি স্বাভাবিক ফুটবলীয় একটি মুভ সম্পন্ন করার চেষ্টাকরছিলেন। প্রতিপক্ষকে আঘাত করার কোনো ইচ্ছা সেখানে ছিল না।
অঁরির ভাষায়, ফুটবলে প্রতিটি সংঘর্ষকে একই মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। কিছু সংঘর্ষ দেখতে কঠোর মনে হলেও সেগুলো সব সময়লাল কার্ডের পর্যায়ে পড়ে না। তাই মেসির ঘটনাটিকে তিনি দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষ হিসেবেই দেখেছেন।




