মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ঢাকা

কানাডা ও আমেরিকায় ফুটবলকে কেনো সকার ডাকা হয়?

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

কানাডা ও আমেরিকায় ফুটবলকে কেনো ফুটবলকে সকার ডাকা হয়?

ফুটবল- বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি কেবল একটি খেলা নয়, বরং জীবন। তবে চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশের দুটি- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় গেলেই এই চেনা খেলার নাম বদলে হয়ে যায় ‘সকার’। কিন্তু কেন এই একই খেলাকে দুটি ভিন্ন নামে ডাকা হয়? ‘সকার’ শব্দটির উৎপত্তিই বা কোথায়? আর এই শব্দ শুনলে কি আসলেই খাঁটি ফুটবলপ্রেমী দেশগুলোর গায়ে জ্বর আসে?

অনেকেরই ধারণা, ‘সকার’ শব্দটি বুঝি আমেরিকানদের আবিষ্কার। কিন্তু ক্রীড়া ইতিহাস এবং ভাষাবিদদের গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। ‘সকার’ কোনো আমেরিকান শব্দ নয়, এটি শতভাগ একটি ব্রিটিশ বা ইংলিশ শব্দ!


বিজ্ঞাপন


যুক্তরাজ্যের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক স্টিফান সিমানস্কি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, উনিশ শতকের শুরুর দিকে ফুটবল ছিল মূলত ব্রিটেনের উচ্চবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণীর খেলা। ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে যখন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়, এর উদ্যোক্তারা ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট এবং নামী পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থী।

সে সময় ব্রিটেনে আরেকটি খেলা খুব জনপ্রিয় ছিল, যার নাম ‘রাগবি ফুটবল’ । রাগবি থেকে আলাদা করতে অ্যাসোসিয়েশনের নিয়মে খেলা এই ফুটবলকে ডাকা হতো ‘অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল’।

১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সালের দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ধনী শিক্ষার্থীদের মধ্যে শব্দ ছোট করে শেষে ‘-er’ (আর) যুক্ত করে এক ধরণের স্ল্যাং বা কোড ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহারের চল ছিল। যেমন: তারা ‘ব্রেকফাস্ট’ কে বলত ‘ব্রেকার’, আর ‘রুগবি’ কে বলত ‘রাগার’।

এই নিয়মেই শিক্ষার্থীরা ‘অ্যাসোসিয়েশন’ শব্দের মাঝখান থেকে ‘soc’ অংশটুকু নেয় এবং শেষে ‘-er’ যুক্ত করে দেয়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘সকার’ বা শুরুর দিকে ‘সকার’ শব্দটি। ক্রীড়া ঐতিহাসিক অ্যান্ডি মিচেলের মতে, ১৮৮৫ সালের শেষের দিকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্কুলের ম্যাগাজিনে প্রথম এই শব্দের লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়।


বিজ্ঞাপন


ব্রিটিশদের হাত ধরেই খেলাটির সাথে সাথে ‘সকার’ শব্দটিও বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রে এই শব্দটির ব্যবহার স্থায়ী রূপ নেয়।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যখন এই খেলাটি পৌঁছায়, ততদিনে সেখানে রুগবি ও সকারের নিয়ম মিলিয়ে আরেকটি খেলা বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, যা আজ ‘আমেরিকান ফুটবল’ নামে পরিচিত। যেহেতু আমেরিকানরা ততদিনে নিজেদের খেলাটিকে ‘ফুটবল’ নামে ডেকে আসছিল, তাই বিভ্রান্তি এড়াতে তারা অ্যাসোসিয়েশন ফুটবলকে ব্রিটিশদের দেওয়া নাম ‘সকার’ হিসেবেই গ্রহণ করে।

অধ্যাপক সিমানস্কির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত খোদ ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলোতেই ‘ফুটবল’ শব্দের পাশাপাশি ‘সকার’ শব্দটি হরহামেশাই ব্যবহার করা হতো। ১৯৬০ বা ৭০-এর দশকে ইংল্যান্ডে এই শব্দ নিয়ে কোনো বিতর্কই ছিল না।

কিন্তু এর পর থেকে যখন খেলাটি আমেরিকায় ব্যাপক বাণিজ্যিক রূপ পেতে শুরু করে, তখন ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় ফুটবল ভক্তদের মধ্যে এক ধরণের ‘আমেরিকান-বিরোধী’ মানসিকতা তৈরি হয়। তারা মনে করতে শুরু করে, আমেরিকানরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতেই ‘সকার’ শব্দ ব্যবহার করছে। ফলে ধীরে ধীরে ব্রিটেন ও ইউরোপে শব্দটির ব্যবহার কমে যায় এবং ‘ফুটবল’ শব্দটিই আধিপত্য বিস্তার করে।

বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোনো আমেরিকান যদি কোনো ব্রিটিশের সামনে ‘সকার’ বলেন, তবে তারা বেশ বিরক্ত হন। অধ্যাপক সিমানস্কি জানান, তাঁর আমেরিকান শিক্ষার্থীরাও এখন কথা প্রসঙ্গে ‘সকার’ বললে লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চায়।

তবে ইতিহাস যা-ই বলুক, ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপটি যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় হচ্ছে, তাই আগামী এক মাস বিশ্বজুড়ে ‘ফুটবল’ ও ‘সকার’- দুই নামেই মুখরিত থাকবে ফুটবলবিশ্ব।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর