লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়েস্টউড এলাকা। জাফরান আইসক্রিমের দোকান, কাবাবের সুবাস আর ফারসি ভাষার বইয়ের দোকানগুলো দেখলেই বোঝা যায় এটি প্রবাসী ইরানিদের প্রাণকেন্দ্র, যা বিশ্বজুড়ে ‘তেহরানজেলেস’ নামে পরিচিত। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আজ সোমবার (১৫ জুন) নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে এই তেহরানজেলেসের অলিতে-গলিতে বইছে চরম উত্তেজনার হাওয়া। মাঠের বাইরে মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও, গ্যালারিতে আজ মুখোমুখি হতে যাচ্ছে খোদ ইরানিরাই!
‘টিম মেল্লি’ বা ইরান জাতীয় ফুটবল দল কি আসলেই দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, নাকি তারা তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রতিচ্ছবি? এই এক প্রশ্নে লস অ্যাঞ্জেলেসের বিশাল ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায় আজ স্পষ্ট দুই ভাগে বিভক্ত। আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের চিত্র।
বিজ্ঞাপন
ওয়েস্টউডের প্রবীণ বিরোধী কর্মী ও ব্যবসায়ী রুজবেহ ফারাহানিপুর সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আজ নিজের দেশকে সমর্থন করছেন না। তাঁর মতে, ‘এই দল যখন আন্তর্জাতিক কোনো মঞ্চে খেলতে নামে, তখন তারা বর্তমান শাসন ব্যবস্থারই প্রতিনিধিত্ব করে। যে ব্যবস্থা আমার অসংখ্য বন্ধু ও পরিবারকে হত্যা করেছে, আমি তাদের সমর্থন করতে পারি না।’
একই সুর বইয়ের দোকানদার স্যাম বেইকজাদেহর কণ্ঠেও। চলতি বছরের শুরুতে (জানুয়ারিতে) ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর দাবি অনুযায়ী প্রায় ৪৫ হাজার (যদিও সরকারি হিসাব ৩,১১৭ জন) মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই দল সরকারের, সাধারণ ইরানিদের নয়।’ স্টেডিয়ামের বাইরে ও ভেতরে আজ বড় ধরণের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে এই গোষ্ঠীটি।
তবে ভিন্ন এক চমৎকার যুক্তি তুলে ধরেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের ইরানি-আমেরিকান কমিউনিটি সংগঠক সুদি ফারোখনিয়া। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে আমেরিকার জার্সি পরার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ট্রাম্পের চরম বিরোধী, কিন্তু গত শুক্রবার যখন ইউএসএ দল খেলছিল, আমি আমেরিকার জার্সি ও মাথায় ফ্ল্যাগ বেঁধে গ্যালারিতে ছিলাম। খেলোয়াড়দের রাজনৈতিক মতাদর্শ কী, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। তারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, এটাই আসল। ইরানের ফুটবলারদের ওপর এই ঘৃণা ছড়ানো একেবারেই অনুচিত।’
ভার্জিনিয়ার ইরানি-আমেরিকান মানবাধিকার আইনজীবী ইয়াসমিন তায়েবও এই প্রতিবাদের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘খেলাধুলা সব মতাদর্শের মানুষকে এক ছাতার নিচে আনে। টিম মেল্লির অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত।’
বিজ্ঞাপন
মাঠের বাইরের এই ভূরাজনীতির বড় খেসারত দিতে হয়েছে ইরান দলকে। ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ক্যাম্প করার অনুমতি পায়নি ইরান। গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলেসে এবং একটি সিয়াটলে হলেও, তাদের বেস ক্যাম্প করতে হয়েছে সীমান্তের ওপারে মেক্সিকোতে!
আজকের ম্যাচের সবচেয়ে বড় স্পার্কিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে গ্যালারির ‘পতাকা’। প্রবাসীরা ১৯৭৯ সালের আগের সিংহ ও সূর্য খচিত ঐতিহাসিক পতাকা নিয়ে গ্যালারিতে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে ফিফা রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে এই পুরনো পতাকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
এ নিয়ে ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দুনিয়ামালি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘স্টেডিয়ামে যদি কোনো অনফিশিয়াল পতাকা আনা হয় বা জাতীয় দলের বিরুদ্ধে কোনো স্লোগান দেওয়া হয়, তবে ইরান দল মাঝমাঠেই খেলা বন্ধ করে দেবে।’
বিক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় মার্কিন প্রশাসন আজ ইরানের টিম বাসের নিরাপত্তায় নজিরবিহীন ব্যবস্থা নিয়েছে। স্টেডিয়ামের চারপাশে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ। মাঠের বাইরে ভিসা জটিলতা, ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়ি আর গ্যালারিতে ঘরের মানুষদেরই একাংশের তীব্র ঘৃণার মুখে দাঁড়িয়ে আজ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নামছে ইরান। কোচ আমির ঘালিনোই গতকালই স্পষ্ট করেছেন, “আমরা রাজনৈতিক মানুষ নই।” এখন দেখার বিষয়, সব চাপ সামলে লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্যালারির এই আগুন মাঠের ফুটবলে কতটা প্রভাব ফেলে।




