গত মে মাসের শেষের দিকে পানামার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলন প্রায় শেষের পথে। ঠিক তখনই ব্রাজিল দলের রিয়াল মাদ্রিদ কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাঁর স্বভাবসুলভ মার্জিত ও সূক্ষ্ম ভঙ্গিতে সেলেসাওদের বর্তমান সবচেয়ে বড় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এলেন।
তিনি স্পষ্ট করেই বললেন, “মানুষ আজকাল বলে ব্রাজিলের দলে এখন কোনো বড় ‘তারকা’ বা সুপারস্টার নেই। হয়তো কথাটা সত্যি। আমাদের এখন কোনো পেলে, রোমারিও কিংবা রোনালদো নাজারিও নেই। কিন্তু আমাদের দলে একটি ‘যৌথ দায়িত্ববোধ’ আছে, যা অনেক সময় একাই ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে।”
বিজ্ঞাপন
তত্ত্বীয়ভাবে এই মুহূর্তে ব্রাজিলের প্রধান নায়ক এবং আক্রমণভাগের মূল কাণ্ডারি হওয়ার কথা ছিল রিয়াল মাদ্রিদের ২৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের। কিন্তু ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেওয়ার পর গত চার বছরেও ভিনিকে নিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের মনের সংশয় কাটেনি। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গত মার্চে ফ্রান্সের কাছে ২-১ ব্যবধানে হারের পর খোদ ব্রাজিলের জনপ্রিয় স্পোর্টস শো ইএসপিএন-এর ‘লিনহা দে পাসে’-তে বিতর্ক শুরু হয়- ভিনিসিয়ুসকে কি একাদশ থেকে বাদ দেওয়া উচিত?
রিয়াল মাদ্রিদে যে কোচের অধীনে ভিনিসিয়ুস তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করেছেন, সেই কার্লো আনচেলত্তি এখন ব্রাজিলের ডাগআউটে। তবুও এই চিরন্তন প্রশ্নটি তাঁর পিছু ছাড়ছে না, “রিয়ালের সেই অতিমানবীয় ভিনিসিয়ুস কেন ব্রাজিলের জার্সিতে নিজের ছায়া হয়ে থাকেন?”
চলতি বিশ্বকাপ সাইকেলে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোলে অবদান ভিনিরই। তবে ২৮ ম্যাচে মাত্র ৭টি গোল এবং ৬টি অ্যাসিস্টের এই পরিসংখ্যান তাঁর নামের পাশে বড্ড বেমানান।
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করা ক্লেবার জেভিয়ার বিবিসি স্পোর্টসকে এর আসল কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “ক্লাবের লেভেলে যেভাবে একজন খেলে, জাতীয় দলে এসে হুট করে সেই একই ছন্দ ধরে রাখা জটিল। ক্লাবে প্রতিদিন একই সতীর্থদের সাথে একই কৌশলে অনুশীলন করা যায়। লিওনেল মেসিকে নিয়েও বছরের পর বছর আর্জেন্টিনায় এই একই প্রশ্ন করা হতো, কিন্তু ২০২২ সালে এসে আর্জেন্টিনা তাঁর চারপাশে একটি নিখুঁত ‘দল’ গড়ে তুলতে পেরেছিল বলেই মেসি সফল হন। কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া আমাদের হারিয়েছিল কারণ তাদের দলটি প্রায় একটি ক্লাবের মতোই গোছানো ছিল, বছরের পর বছর তারা একই খেলোয়াড় নিয়ে খেলছে। ভিনিকেও মাঠে তেমন একটি প্রপার স্ট্রাকচার দিতে হবে।”
বিজ্ঞাপন
সমালোচনার এই তির থেকে কখনো নিজেকে লুকিয়ে রাখেননি ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। সম্প্রতি কাজোঁ টিভি কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে এই তারকা ফরোয়ার্ড বলেন, “ক্লাবে প্রতি তিন দিন পর পরই একটা নতুন ম্যাচ খেলার বা নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ আসে। সেখানে আমি ১০টি ম্যাচের মধ্যে ২টি ম্যাচে খারাপ খেললেও মানুষ তা নিয়ে খুব বেশি মেতে থাকে না।”
“কিন্তু জাতীয় দলে একটা ম্যাচের পর আরেকটা ম্যাচের মাঝে দীর্ঘ বিরতি থাকে। চাপটা এখানে হিমালয় সমান আর মানুষ সবসময়ই আমার কাছ থেকে জাদুকরী পারফরম্যান্স আশা করে। আমি জানি, আমি যদি এই বিশ্বকাপে গিয়ে ৪-৫টি গোল করি আর আমরা যদি চ্যাম্পিয়ন হতে পারি, তবে পুরো গল্পটাই বদলে যাবে। তখন এই মানুষগুলোই বলা শুরু করবে, আমি আসলে বিশ্বকাপের জন্যই নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম, তাই আগের ম্যাচগুলোতে হয়তো ভালো খেলিনি!”
আজ শনিবার রাতে নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আফ্রিকার সিংহ মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে ব্রাজিলের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান। ইনজুরির কারণে নেইমার জুনিয়র দলের বাইরে থাকায় আজ স্পটলাইট পুরোটাই থাকবে ভিনির ওপর। কার্লো আনচেলত্তির যৌথ দায়িত্বের ছকে ভিনিসিয়ুস রিয়াল মাদ্রিদের সেই চেনা রূপ ফিরিয়ে এনে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে পারেন কি না, আজ সেটিই দেখার অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।
আরএ




