মনে করুন আপনি এমন এক নৈশভোজে যোগ দিতে গেছেন, যেখানে আপনার পৌঁছানোর ঠিক আগেই স্বাগতিক স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে তীব্র ঝগড়ায় মেতে উঠেছেন! উত্তর আমেরিকার মাটিতে প্রথমবারের মতো তিন দেশের যৌথ আয়োজনে বসা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ উপভোগ করতে আসা লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমীর অবস্থাও এখন ঠিক তেমন। ১৬টি আয়োজক শহর এবং ৩টি দেশ জুড়ে বিস্তৃত এই মেগা টুর্নামেন্টটি এমন এক সময়ে মাঠে গড়াচ্ছে, যখন এর তিন আয়োজক- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক চরম বৈরিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসিতে যখন তিন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সাথে হাসিমুখে সেলফি তুলেছিলেন, তখন মাঠের বাইরের এই উত্তেজনাকে কিছুটা আড়াল করা গিয়েছিল। কিন্তু পুরো ৩৯ দিনের এই দীর্ঘ টুর্নামেন্টে তিন দেশের মেলবন্ধন বজায় রাখা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ, তা এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
বিজ্ঞাপন
ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই মহাদেশে আমেরিকাই শেষ কথা। ফলে বাণিজ্য, ইমিগ্রেশন ও মাদক চোরাচালানের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে তিন দেশের দীর্ঘদিনের শীতল যুদ্ধ এখন আবারও প্রকাশ্য রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দুই বাণিজ্যিক অংশীদার মেক্সিকো ও কানাডা নিশ্চিতভাবেই ভুলে যায়নি যে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর তাঁদের ওপরেই প্রথম শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার দেওয়া মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছিল। ফলস্বরূপ কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ তাদের দোকান থেকে মার্কিন অ্যালকোহল বা মদ সরিয়ে নেয় এবং কানাডিয়ানরা যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়, যা মার্কিন প্রশাসনকে বেশ বিরক্ত করেছিল।
অন্যদিকে, কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বাণিজ্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে মেক্সিকোর সাথে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছেন। কারণ ট্রাম্পের আসার আগে মেক্সিকোকে ‘চীনের বিনিয়োগের পেছনের দরজা’ হিসেবে ব্যবহার করার যে অভিযোগ তুলেছিল কানাডা ও মার্কিন কর্মকর্তারা, তাকে মেক্সিকো অত্যন্ত ‘অপমানজনক’ হিসেবে দেখেছিল।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি দেশ যৌথভাবে টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে। মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত এই আয়োজনে যুক্ত রয়েছে বিপুল সংখ্যক আলাদা আলাদা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞাপন
হাজার হাজার ফুটবল সমর্থক ম্যাচ দেখার জন্য যখন এই তিন দেশের সীমানা পারাপার করবেন, তখন মার্কিন ইমিগ্রেশনের কঠোর নজরদারি ও কড়াকড়ি ভক্তদের জন্য বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হতে পারে। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ‘ইরান যুদ্ধ’-এর কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে, যা সীমান্ত পারাপারে নতুন প্রশাসনিক জটিলতা ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে। সামান্য কোনো ভুল বোঝাবুঝি থেকেও বড় ধরনের কূটনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গবেষকদের মতে, ২০২৩ সালের নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সফল নারী বিশ্বকাপ ইতিবাচক হলেও, ২০০২ সালের জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ পুরুষ বিশ্বকাপ দুই দেশের দীর্ঘদিনের তিক্ত ইতিহাসের কারণে খুব একটা মধুর ছিল না। তবে ফিফা এখনো আশাবাদী, তারা একে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐক্যবদ্ধ বিশ্বকাপ’ হিসেবেই দেখতে চায়।
আয়োজক দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা এই টুর্নামেন্টকে কেবল প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক দেখানোর হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছেন না, বরং দেশের ভেতরের সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার সুযোগ হিসেবেও দেখছেন। এটি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য মেক্সিকোর ক্ষেত্রে।
বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে মেক্সিকো সিটির প্রধান বিমানবন্দরের অপূর্ণতা, গণপরিবহন ব্যবস্থার বেহাল দশা এবং সংস্কারকৃত ‘এস্তাদিও আসতেকা’ স্টেডিয়ামের প্রস্তুতি নিয়ে খোদ দেশের ভেতরেই ব্যাপক সমালোচনা চলছে। কয়েক মাস আগে মেক্সিকোর রাস্তায় কার্টেল বা মাদক চক্রের সদস্যদের প্রকাশ্য সহিংসতাও বিশ্বজুড়ে ভীতি তৈরি করেছিল।
বর্তমানে মেক্সিকোর মূল শিক্ষক ইউনিয়ন পেনশন ও কর্মপরিবেশের দাবিতে দেশব্যাপী ধর্মঘট এবং বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে, যা স্টেডিয়ামে যাওয়ার মূল সড়কগুলো অবরুদ্ধ করার হুমকি দিচ্ছে। তাদের স্লোগানই হচ্ছে- "সমাধান না হলে, কিক-অফ (খেলা শুরু) হতে দেওয়া হবে না।"
এতসব সংকটের মাঝেও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাম অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে বলেছেন, “এটি বিশ্বের সেরা ফুটবল উপভোগ করার সময়। আমরা বিশ্বকে দেখাব আমরা কেবল বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশই নই, আমরা এক ক্ষমতাবান জাতি।” রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই এক মাসের ফুটবল কূটনীতি আগামী দিনে তিন দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে বা ম্যাচে উপস্থিত থেকে পুরো লাইমলাইট একা কেড়ে নিতে মরিয়া, যা মেক্সিকো ও কানাডার মনে ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে; ঠিক তেমনি টুর্নামেন্টের সফলতার স্বার্থে ট্রাম্প নিজেও চাইবেন না এমন কোনো বড় কূটনৈতিক কেলেঙ্কারি ঘটুক যা আমেরিকার সুনামে দাগ ফেলে।
ফুটবল যেমন তার অনিশ্চয়তার জন্য বিখ্যাত, তেমনি তিন দেশের যৌথ আয়োজনের এই জটিল রাজনৈতিক এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষাও কোন দিকে মোড় নেয় তা দেখার জন্য পুরো বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।




