ফুটবল বিশ্বে ট্রান্সফার উইন্ডো মানেই গুঞ্জন আর নাটকীয়তার ছড়াছড়ি, বিশেষ করে স্প্যানিশ ফুটবলে। তবে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজকে কেন্দ্র করে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মধ্যে যে নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা সাধারণ দলবদলের আলোচনাকে হার মানিয়েছে। বার্সেলোনা সমর্থকদের একটি বড় অংশের দাবি, রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ আলভারেজের জন্য ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটি ‘ভুয়া বিড’ বা কৃত্রিম অফারের নাটক সাজিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই থিওরি বা তত্ত্ব অনুযায়ী, আলভারেজের বাজারমূল্য আকাশচুম্বী করে তোলার জন্যই এই চাল চালা হয়েছে, যাতে বার্সেলোনার পক্ষে এই ফরোয়ার্ডকে দলে ভেড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। যদিও এই সমঝোতার কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ নেই, তবুও এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি চলতি সামার ট্রান্সফার উইন্ডোর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গত বেশ কয়েক মাস ধরেই হুলিয়ান আলভারেজের বার্সেলোনায় যোগ দেওয়া নিয়ে জোরালো গুঞ্জন চলছিল। কাতালান ক্লাবটি ভবিষ্যতের আক্রমণভাগ শক্তিশালী করতে এই আর্জেন্টাইন বিশ্বকাপ জয়ীকে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বানিয়েছিল। মে মাসের শেষের দিকে বার্সার একটি অফার অ্যাটলেটিকো প্রত্যাখ্যানও করেছিল।
এরই মধ্যে নাটকীয় মোড় নেয় যখন রিয়াল মাদ্রিদ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, তারা আলভারেজের জন্য ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটি রেকর্ড ব্রেকিং মেগা অফার জমা দিয়েছে। সদ্য পুনর্নির্বাচিত রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ নির্বাচনের আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি ১৫০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে এক ‘রহস্যময় গ্যালাকটিকো’কে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে আনবেন; দিনশেষে জানা যায় সেই নাম হুলিয়ান আলভারেজ। তবে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে খেলোয়াড়ের ৫০০ মিলিয়ন ইউরোর রিলিজ ক্লজের দিকে আঙুল তোলে।
এই অবিশ্বাস্য অফারের খবর প্রকাশ হতেই বার্সেলোনা সমর্থকেরা এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র দেখতে শুরু করেন। তাদের প্রধান যুক্তিগুলো হলো, রিয়াল মাদ্রিদের আক্রমণভাগে ইতিমধ্যেই কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো এবং এনড্রিকের মতো বিশ্বসেরা তারকারা রয়েছেন। এমন ঠাসা স্কোয়াডে আরও একজন ফরোয়ার্ডের জন্য রিয়াল কেন ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর মতো রেকর্ড অর্থ খরচ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমর্থকেরা।
সাধারণত ট্রান্সফার বিড ব্যর্থ হলে ক্লাবগুলো তা গোপন রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে রিয়াল মাদ্রিদ বোর্ড মিটিংয়ের পর অফিশিয়াল বিবৃতি দিয়ে অফারের কথা প্রকাশ করে। এমনকি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাসির ইমোজি দিয়ে রিয়ালকে খোঁচা মেরে রি-পোস্ট করে বলে, "তোমরা বার্সেলোনার চেয়েও বেশি হাসাতে পারো।" এই প্রকাশ্য কাদা ছোড়াছুড়িই বার্সা ভক্তদের মনে সন্দেহ জাগিয়েছে যে, পুরো বিষয়টি আসলে আগে থেকেই সাজানো।
বিজ্ঞাপন
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি বেশ সহজ ও সরল। বার্সা সমর্থকদের মতে, এই নাটকে পেরেজ ও অ্যাটলেটিকো উভয়েরই লাভ বা ‘উইন-উইন’ সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে। পেরেজ কোনো টাকা খরচ না করেই ভক্তদের কাছে প্রমাণ করলেন যে তিনি বড় সাইনিংয়ের জন্য কতটা উচ্চাভিলাষী ও সক্রিয়। অন্যদিকে, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ভবিষ্যতে যেকোনো ক্লাবের সাথে আলোচনার টেবিলে এই ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর অফারটিকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে আলভারেজের চড়া দাম হাঁকাতে পারবে।
এর সরাসরি ভুক্তভোগী হবে বার্সেলোনা। বার্সা যদি এখন আলভারেজের দাম কিছুটা কমানোর চেষ্টা করে, তবে অ্যাটলেটিকো সহজেই রিয়ালের ১৫০ মিলিয়নের প্রস্তাবটি দেখিয়ে দর কষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। এই বিতর্কের মাঝে আলভারেজের এজেন্ট ফার্নান্দো হিদালগো রিয়াল মাদ্রিদের আগ্রহের বিষয়টি কিছুটা উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন, রিয়ালের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট আলোচনা বা যোগাযোগ তাদের সাথে করা হয়নি। অন্যদিকে, খেলোয়াড় নিজে বর্তমানে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন।
তবে এই ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর গল্প সত্যি হোক বা ভুয়া- এটি ইতিমধ্যেই দলবদলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে দিয়েছে। এখন বার্সেলোনা আলভারেজকে কিনতে গেলেও অ্যাটলেটিকোকে তাদের দাবি থেকে নামানো প্রায় অসম্ভব হবে। আলভারেজের ভবিষ্যৎ রিয়াল নাকি বার্সার ডেরায় তা সময়ই বলে দেবে, তবে পেরেজের এই এক চালে স্প্যানিশ ফুটবলের দলবদলের বাজার যে পুরোপুরি গরম হয়ে উঠেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।




